ড. মশিউর রহমান
ভোর পাঁচটার আজান পেরোতেই গ্রামের পুকুরপাড়ে দাঁড়ানো এক কিশোরের চোখ জ্বালা করছে। পাশের ইটভাটার ধোঁয়া রাতভর নেমে এসেছে ফসলের ওপর, পানির ওপর, ফুসফুসের ওপর। কিশোরটির হাতে স্মার্টফোন আছে, ইউটিউবে সে মঙ্গলের ছবি দেখে। কিন্তু তার মা আজ সকালে রান্না করতে গিয়ে কাশিতে ভেঙে পড়েছেন, কারণ রান্নার ধোঁয়া আর ইটভাটার ধোঁয়া—দুটো মিলে আজকের বাতাসটা বিষাক্ত। তুমি হয়তো ঢাকার হলে বসে রাত জেগে কোড লিখছ, কিংবা কেমিস্ট্রির ল্যাবে টাইট্রেশন করছ। কিন্তু ভোরের ওই কাশির শব্দটা কি তোমার গবেষণায় ঢুকেছে?
আমরা স্বপ্ন দেখি আন্তর্জাতিক জার্নালের, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের, বিদেশের কনফারেন্সের। এগুলো দোষের নয়। দোষ তখনই, যখন নিজের মাটির প্রশ্নগুলো আমাদের গবেষণায় ঢোকে না। পৃথিবীর ৮০ শতাংশ গবেষণা হয় উন্নত দেশের সমস্যা ঘিরে, অথচ রোগের ভারের ৯০ শতাংশ বহন করে উন্নয়নশীল দেশগুলো—এই বৈষম্য কোনো গ্রাফে শুধু সংখ্যা নয়; এটা প্রতিদিনের কাশি, প্রতিদিনের ডায়রিয়া, প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে প্রতিবছর বায়ুদূষণে প্রায় এক লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে—এই তথ্য শুধু খবর না, এটা তোমার প্রতিবেশীর নিঃশ্বাস।
স্থানীয় সমস্যা নিয়ে গবেষণা মানে কেবল দেশপ্রেমী হওয়া নয়; মানে বাস্তববাদী হওয়া। যেখানে ডেটা হাতে, যেখানে ফলাফল কানে, যেখানে সমাধান চোখের সামনে—সেখানেই বিজ্ঞান সবচেয়ে শক্তিশালী। তুমি যদি নড়াইলের পানির আর্সেনিক নিয়ে কাজ করো, তোমার ফলাফল কালই কারো জীবন বদলাতে পারে। তুমি যদি চরের মাড়াই-যন্ত্রের দক্ষতা বাড়াতে পারো, আগামী মৌসুমেই কারো স্কুলের ফি জোগাড় হবে। এই তাত্ক্ষণিক প্রভাবই গবেষণাকে মানুষে পরিণত করে।
অথচ আমরা প্রায়ই বলি, “স্থানীয় কাজ কি আন্তর্জাতিক জার্নাল নেবে?” এই প্রশ্নের ভেতর লুকানো থাকে বেদনা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বৈশ্বিক মহামারির সময় দেখা গেছে, স্থানীয় ডেটা ছাড়া কোনো মডেল টেকে না। বিশ্বব্যাপী কোভিড গবেষণার ৬০ শতাংশের বেশি নির্ভর করেছে স্থানীয় হাসপাতালের রেকর্ড আর কমিউনিটি সার্ভের উপর। বৈশ্বিক বিজ্ঞান এখন স্থানীয় কণ্ঠ খুঁজছে, কারণ এক জায়গার সমাধান অন্য জায়গার উত্তর নয়। নদীর চর আর নগরের বস্তি এক ভাষায় কথা বলে না; বিজ্ঞানকেও তাই বহুভাষী হতে হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশে স্থানীয় সমস্যা মানে গবেষণার স্বর্ণখনি। নোনা পানিতে ধান, বস্তিতে টিবি, পাহাড়ে ভূমিধস, শহরে শব্দদূষণ, হাওরে মাছের প্রজনন—এগুলো শুধু সমস্যা নয়, এগুলো আন্তর্জাতিক আগ্রহের বিষয়। কারণ জলবায়ু বদলাচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে, শহর ফুলে উঠছে—বাংলাদেশ এই ভবিষ্যতের ছোট্ট মানচিত্র। এখানে যা ঘটে, কাল পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটতে পারে। তাই তোমার গ্রাম আসলে বিশ্বের ল্যাব।
আরেকটা কথা আমাদের বলতে হয়, চেপে থাকা গলায়—ফান্ডিং। স্থানীয় সমস্যাকে অবহেলা করি বলে আমরা ভাবি, অর্থ আসবে না। অথচ গত দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু ও স্বাস্থ্যখাতে আন্তর্জাতিক অনুদান তিনগুণ হয়েছে। দাতারা এখন খুঁজছেন “ফিল্ড-ইম্প্যাক্ট”, শুধু “পেপার-ইম্প্যাক্ট” নয়। যে গবেষণা মাঠে দাঁড়িয়ে নীতিমালা বদলায়, সেটিই দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পায়। স্থানীয় প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী টাকা আসছে—শুধু দরজায় কড়া নাড়ার মতো সাহস দরকার।
স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করলে তোমার পরিচয়ও বদলায়। তুমি আর শুধু ছাত্র নও, তুমি সাক্ষী। তুমি সেই চোখ, যে দেখে; সেই কণ্ঠ, যে বলে; সেই হাত, যে বদলায়। মানুষ তোমার দিকে তাকায়, আর বলে—“এই ছেলেটা আমাদের কথা লেখে।” এই স্বীকৃতির দাম কোনো সার্টিফিকেটে লেখা নেই, কিন্তু এই দামেই দাঁড়িয়ে থাকে বিজ্ঞানীর নৈতিকতা।
তুমি হয়তো ভয় পাও, “আমি কি ছোট হয়ে যাচ্ছি?” না—তুমি গভীরে যাচ্ছো। গভীরতা কখনো ছোট হয় না। গভীরতাই সাগর বানায়। তুমি কি ভালো ছাত্র, না নির্মমভাবে কৌতূহলী চিন্তাবিদ—এই তফাতটা এখানেই। ভালো ছাত্র প্রশ্ন মুখস্থ করে, কৌতূহলী চিন্তাবিদ প্রশ্ন খোঁজে। আর প্রশ্ন খুঁজতে গেলে নিজের উঠোনেই মানচিত্র আঁকতে হয়।
আমরা যদি স্থানীয় সমস্যাকে অবহেলা করি, আমরা বিজ্ঞানকে কলোনি বানাই। অন্যের প্রশ্নে আমাদের ল্যাব, অন্যের এজেন্ডায় আমাদের ক্যালকুলাস। কিন্তু নিজের প্রশ্নে নামলে—ভাষা বদলায়, সাহস বদলায়, বিজ্ঞান বদলায়। তুমি তখন আর কারো নোটিশবোর্ডের ঘোষণাপত্র নও; তুমি তোমার সময়ের দলিল।
তোমার শহরের কোন সমস্যা তোমার ঘুম কাড়ে? কোন অসুখ তোমার বাসার নিচের ফার্মেসিতে বেশি বিক্রি হয়? কোন নদী শুকোচ্ছে, কোন শিশু স্কুল ছাড়ছে, কোন বুড়ি হাঁপাচ্ছে—এইগুলো কেবল খবর নয়, এগুলো তোমার গবেষণার সূচি। তোমার নোটবুকে নতুন অধ্যায় খুলুক—শিরোনাম হোক, “আমার জায়গা, আমার প্রশ্ন।”
একদিন তুমি যখন কাগজে নাম দেখবে, সেটা আনন্দ। কিন্তু যেদিন গ্রামে কেউ বলবে, “ওর কাজেই আমাদের পানিটা পরিষ্কার,” সেদিন তুমি বুঝবে—জার্নাল নয়, পৃথিবী তোমাকে ছাপছে। দায়িত্ব এখানেই। তুমি কি শুধু দেখবে, না বদলাবে? স্থানীয় সমস্যার দিকে তাকানো মানেই আঙুল তুলতে শেখা—কিন্তু আঙুল তোলার শেষে হাত বাড়ানো।
আজ রাতেও হয়তো বাইরে ধোঁয়া, ভেতরে আলো। আলোটা বড় করো প্রশ্নে, প্রশ্নটা বড় করো সাহসে। তোমার গবেষণার ঠিকানা বদলাও—লন্ডন বা টোকিও নয়, আজকের জন্য লিখো তোমার পাড়ার নাম। ভবিষ্যৎ সেখানে ছাপা হচ্ছে।

Leave a comment