সম্পাদকীয়

প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ মানবিকতার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে

Share
Share

বাংলাদেশসহ বিশ্বের গবেষণা-কমিউনিটি আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন প্রযুক্তি শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি নয়, বরং সামাজিক ন্যায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। মানুষের হাতে প্রযুক্তির যে শক্তি এসেছে, তার সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন প্রত্যেক গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তার যৌথ দায়িত্ব। আমি ড. মশিউর রহমান, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দেশের বায়োমেডিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টেশন, ডিজিটাল হেলথ, ফিনটেক, গবেষণা ল্যাব এবং স্টার্টআপে কাজ করতে গিয়ে এক বিষয় বারবার শিখেছি—প্রযুক্তি যদি মানুষের জন্য তৈরি হয়, তবে প্রযুক্তির ভেতরও মানুষের বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

গবেষণা বলছে, বৈচিত্র্যময় দল উদ্ভাবনকে অন্য যেকোনো দল থেকে বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। কারণ বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, সামাজিক পটভূমি, সংস্কৃতি, লিঙ্গ এবং মানসিক রূপরেখা একসাথে কাজ করলে সমস্যা সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গিও বহুমাত্রিক হয়। প্রযুক্তির ইতিহাসে বড় সাফল্যগুলোর পেছনে এই বৈচিত্র্য প্রায়শই কাজ করেছে নীরব কাঠামো হিসেবে। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি—স্বাস্থ্যসেবার একটি প্রকল্পে তরুণ নারী গবেষকের এক প্রশ্ন এমন একটি অদৃশ্য ঝুঁকি সামনে এনেছে, যা আগে আমাদের কেউ চিন্তাই করিনি। আবার দূরবর্তী অঞ্চলে বেড়ে ওঠা একজন ইঞ্জিনিয়ারের অভিজ্ঞতা কোনো পণ্যের নকশাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা গ্রামীণ ব্যবহারকারীদের জন্য আরও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। প্রযুক্তি আজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়া মানে এই নয় যে আমরা ব্যক্তিকে শুধু ডেটা হিসেবে দেখব; বরং এই ব্যক্তিকে তার প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তির নকশায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

স্টার্টআপ জগতে সমস্যা আরেকটু ভিন্ন। প্রতিদিন প্রতিযোগিতা, গতি এবং বিনিয়োগের চাপে তারা ভাবার সুযোগ কম পায়—একটি বৈচিত্র্যময় দল ছাড়া উদ্ভাবন কখনও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। একই ধরনের অভিজ্ঞতার মানুষের তৈরি অ্যালগরিদম খুব সহজেই পক্ষপাত জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য তৈরি প্রযুক্তিকে মানুষের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন অ্যালগরিদম বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে রোগ পূর্বাভাস—সব ক্ষেত্রেই বৈষম্যের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই প্রযুক্তি-ভিত্তিক যেকোনো সংস্থার জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে পক্ষপাতমুক্ত করা এখন একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবনে আমি দেখেছি—যেখানে এই সচেতনতা বেশি, সেখানে উদ্ভাবন দ্রুত জন্ম নেয়, এবং গবেষকেরা নিজেদের কাজের ভেতরেই বৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটান।

তবে বৈচিত্র্য মানেই সংখ্যাগত উপস্থিতি নয়; এটি মূলত সাংগঠনিক সংস্কৃতির প্রশ্ন। অনেক প্রতিষ্ঠান বাহ্যিকভাবে বৈচিত্র্য নিয়ে গর্ব করলেও অভ্যন্তরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে না, যেখানে কর্মীরা নিজের পরিচয় প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। গবেষণা দেখাচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি ছাড়া বৈচিত্র্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ভিন্ন মতামতকে স্বীকৃতি দেওয়া, দলগত সিদ্ধান্তে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় প্রকৃত বৈচিত্র্যবান্ধব পরিবেশ। আমি দেখেছি—যখন দল এমন জায়গা তৈরি করতে পারে, তখনই গবেষকেরা নিজের সৃজনশীলতার সর্বোচ্চটুকু উন্মোচন করতে পারেন।

নমনীয়তা বৈচিত্র্যের একটি প্রধান উপাদান। ই-লার্নিং ও ডিজিটাল হেলথে কাজ করার অভিজ্ঞতায় বুঝেছি—কর্মঘণ্টা, কাজ করার ধরন এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের প্রতি সম্মান দেখানো একটি সংগঠনকে আরও মানবিক করে তোলে। কেউ সন্তান লালন-পালন করছেন, কেউ অসুস্থ পরিবারের সদস্য দেখভাল করছেন, কেউ আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন অফিসে যেতে পারেন না—এদের প্রতি সহানুভূতিশীল সংগঠন শুধু মানবিকই নয়, বরং উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও অনেক এগিয়ে থাকে। গবেষণা দেখায়, এই নমনীয়তা গবেষকের মানসিক নিরাপত্তা বাড়ায় এবং দলগত উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করে।

বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগাযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কর্মীরা যখন জানেন যে তাঁদের কথা শোনা হয়, নেতৃত্ব স্বচ্ছ, এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়—তখন দল এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা অনুভব করে। এর ফলে তারা শুধু কাজই করেন না, বরং প্রতিষ্ঠানকে নিজের একটি মিশন হিসেবে গ্রহণ করেন। আমরা যারা গবেষণা বা উদ্ভাবনে কাজ করি, তাদের জন্য এই সামাজিক নিরাপত্তা অপরিহার্য, কারণ গবেষণার মূলেই রয়েছে অনিশ্চয়তা, ভুল, সংশোধন ও পুনরাবিষ্কার।

স্টার্টআপে নতুন কর্মীদের জন্য মেন্টরশিপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা থাকে, তারা অধিকাংশ সময়ই পথ খোঁজে—কোথা থেকে শুরু করবে, কোন দক্ষতা উন্নত করবে। একজন অভিজ্ঞ সহকর্মীর হাত ধরা তাদের বিভ্রান্তি কমায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং বৈচিত্র্যময় দলকে আরো সুসংহত করে।

সবশেষে, প্রযুক্তিকে যতই উন্নত মনে হোক, এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। আমাদের গবেষণা-কমিউনিটির জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণ—উদ্ভাবন তখনই সফল, যখন তা মানুষের জন্য কাজ করে। একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তিকে সংকীর্ণ করে, আর বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা প্রযুক্তিকে মানবিক করে। প্রযুক্তি যদি মানুষের জীবন উন্নত করতে চায়, তবে প্রযুক্তির ভেতরেও মানুষের বহুবর্ণ অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হওয়া আবশ্যক।

সেই কারণেই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ফর গুড-এর যাত্রা কেবল প্রযুক্তির নয়, মানুষের ভবিষ্যতের জন্য।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org