চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

“ডিহাইড্রেশন চোখে দেখা যায়, কিন্তু বিজ্ঞান দিয়ে মাপলেই জীবন বাঁচে” – ড. আবু খালেদ

Share
Share

বাংলাদেশে বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশন বা শরীরের প্রয়োজনীয় পানি কমে যাওয়া একটি সাধারণ অথচ মৃত্যুর মতোও কঠিন সমস্যা। কলেরা, ডায়রিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণের কারণে শরীরের পানি দ্রুত কমে যায় এবং যদি তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা হয়, তাহলে চিকিৎসা ভুল পথে চলে। সাধারণ চিকিৎসকরা প্রায়শই চোখ, ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া, চোখে সাদা কাপো দেখা বা রোগীর গতিবিধি দেখে আন্দাজ করে থাকেন—কিন্তু তা সব সময় নিখুঁত হয় না। এই বাস্তব সমস্যা থেকেই ড. আবু খালেদ বুঝতে পারেন, উপসর্গ দেখে শুধু অনুমান নয়, শরীরের ভেতরের হিসাব বৈজ্ঞানিকভাবে জানাই জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ড. খালেদ বলেছেন, “ডিহাইড্রেশন চোখে দেখা যায়, কিন্তু বিজ্ঞান দিয়ে মাপলেই জীবন বাঁচে।” এই কথার পিছনে তার গবেষণার পুরো দর্শন লুকিয়ে রয়েছে—বিশেষ করে যখন তিনি বলেছেন, কারেন্ট দিয়ে শরীরের ভেতরের পানি ও চর্বির হিসাব নির্ণয়ের পদ্ধতি তৈরি করে ব্যতিক্রমী ফল পাওয়া যায়।

১৯৮৮ সালের দিকে, তিনি ‘Bioelectrical Impedance Analysis’ বা BIA পদ্ধতি প্রথম বাংলাদেশে পরিচয় করান। BIA একটি আধুনিক কিন্তু সরল ধারণার যন্ত্র। শরীরের ভেতর খুব কম বৈদ্যুতিক কারেন্ট পাস করালে—পানি ও ইলেকট্রোলাইটস সেই কারেন্টকে সহজে বয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু চর্বির টিস্যু বাধা সৃষ্টি করে। এই বাধা বা রেজিস্ট্যান্সকে পরিমাপ করে শরীরের পানি ও ফ্যাটের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। এটি কোনো ছুরি চামড়া ছাড়াই (non-invasive) করা যায়—মানেই রোগীর কাছে এটি নিরাপদ ও দ্রুত।

ড. খালেদ বলেন, “আইসিডিডিআরবি-তে আমরা প্রথমে দেখিয়েছি যে কলেরা বা ডায়রিয়ার কারণে যে ডিহাইড্রেশন হয়, ফ্লুইড দেওয়ার পর সেটা শরীরে কীভাবে কাজ করে।” তিনি বর্ণনা করেন, আগে চিকিৎসকরা শুধু চোখে দেখে ডিহাইড্রেশনের ডিগ্রি (মৃদু, মধ্যম, গুরুতর) আন্দাজ করতেন। কিন্তু BIA যন্ত্র দিয়ে তা খুব দ্রুত ও নিখুঁতভাবে ধরা যায়। এতে খারাপ হিসাবের কারণে ডিহাইড্রেশনকে কম অথবা বেশি ধরা—সবাই রক্ষা পায়। কারণ বেশি ফ্লুইড দিলে আবার রোগীর ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে—অর্থাৎ ওভার-হাইড্রেশনও একটি বড় সমস্যা।

BIA পদ্ধতি শুধু চলমান রোগীকে বুঝতেই নয়, বরং ভবিষ্যতের ক্ষতির পথও সম্পর্কে ধারণা দেয়। শিশুরা ঠিকভাবে কোন খাবার খেলে কীভাবে তাদের শরীর বেড়ে ওঠে—ফ্যাট বাড়ছে নাকি প্রোটিন—তাও নির্ণয় সম্ভব। ড. খালেদ এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুর শরীরে বৃদ্ধির ধরন সম্পর্কে গভীর তথ্য পেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রিম্যাচিউর বাচ্চির বাঁচার সম্ভাবনা আগেই আন্দাজ করা পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে।

এমনকি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যচিকিৎসার পরিপ्रेक्ष্যে BIA পদ্ধতির ব্যবহার শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুওড়ে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিও এটি একটি সঠিক মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করছে। ড. খালেদ নিজেও এ মন্তব্য করেছেন যে, “যদি আমরা এই পদ্ধতিটি আরও সস্তা করে পোর্টেবল ও সোলার–পাওয়ারড জিনিস হিসেবে আনতে পারি, তাহলে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে বিদ্যুৎ থাকে না, সেখানে এই যন্ত্রটি কম খরচে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।”

ড. খালেদের গবেষণায় একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, তিনি শুধুই প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা গবেষণা করে সামান্য জনগোষ্ঠীর কাছে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি চাইছেন, বিজ্ঞান যেন সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে যাক। বিশেষত যেখানে শিশুর মৃত্যু, ডিহাইড্রেশন, প্রিম্যাচিউর জন্ম, পুষ্টির অভাব—এই সমস্যা গুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো হয় প্রতিদিন।

জানিয়ে রাখা দরকার, BIA একটি মাত্র উদাহরণ। ড. খালেদ তাঁর গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে দেখিয়েছেন, কিভাবে ডেটা–ভিত্তিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধুই চোখে দেখে চিকিৎসার বাইরে গিয়ে আরও নির্ভুল পদ্ধতির দিকে মানুষকে নিয়ে যাওয়া যায়। তিনি শিখিয়েছেন—অন্তত আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে চিকিত্সা সুবিধা সীমিত, সঠিক মাপজোখই রোগীদের প্রকৃত জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশে কিংবা বিশ্বের যে কোনো স্কেলে, স্বাস্থ্য গবেষণার উদ্দেশ্য যদি শুধু কি পরিমাণ রোগ নির্ণয় করা যায়—এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে রোগীর জীবনকে ভালোভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কিন্তু যখন আমরা শরীরের ভেতরের বিশ্লেষণ বুঝতে পারব—তখনই চিকিৎসা হবে দ্রুত, নিখুঁত এবং ফলপ্রসূ। আর এই পথে বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণকে একসাথে নিয়ে যাওয়ার একাধারে লক্ষ্য—ড. খালেদ সেই লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তার গবেষণা ও কথায়।

ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ