শিল্প বিপ্লবের প্রতিটি ধাপই মানবসমাজকে নতুন করে গড়ে তুলেছে। একসময় যন্ত্রশক্তি কারখানাকে বদলে দিয়েছিল, পরে বিদ্যুৎ ও কম্পিউটার এসে শিল্পকে দিয়েছে নতুন গতি। আজকের দিনটিতে শিল্প ৪.০–এর কেন্দ্রে উঠে এসেছে “ডিজিটাল টুইন”—একটি প্রযুক্তি, যা বাস্তব জগতকে তার ডিজিটাল প্রতিবিম্বে রূপান্তর করে তুলছে।
ডিজিটাল টুইনের ধারণা একসময় সীমিত পরিসরের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন এটি হয়ে উঠছে বৈশ্বিক শিল্পের কৌশলগত অস্ত্র। ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল টুইনের বাজার ছিল মাত্র ৪১৮ মিলিয়ন ডলার। আইওটি অ্যানালিটিক্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে সেটি বেড়ে দাঁড়াবে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে। বার্ষিক ২৯ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধির হার প্রযুক্তিটির বিস্ফোরণধর্মী গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে। উৎপাদন খাত থেকে শুরু করে লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা থেকে স্মার্ট সিটি—সবখানেই ডিজিটাল টুইন এখন নতুন পথ দেখাচ্ছে।
কিন্তু “ডিজিটাল টুইন” বলতে আসলে কী বোঝানো হয়, তা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকে মনে করেন এটি কেবল একটি ত্রিমাত্রিক নকশা বা আলাদা কোনো সফটওয়্যার। বাস্তবে এর আসল শক্তি আকারে নয়, কার্যকারিতায়। ডিজিটাল টুইন হলো একটি জীবন্ত ডিজিটাল প্রতিরূপ, যা বাস্তব জগত থেকে ক্রমাগত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে নিজেকে আপডেট রাখে। কোনো কারখানার মেশিন, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কিংবা শহরের যানবাহন প্রবাহ—যা-ই হোক না কেন, তার সঠিক ডিজিটাল প্রতিবিম্ব তৈরি করাই ডিজিটাল টুইনের কাজ।
একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল টুইনের তিনটি মূল স্তম্ভ রয়েছে। প্রথমত, ডিজিটাল ডেফিনিশন বা ভার্চুয়াল মডেল, যা কোনো সম্পদ বা প্রক্রিয়ার নকশা দেয়। এটি CAD বা PLM সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি হয়, কিন্তু এটি একা কখনোই “টুইন” নয়, বরং একটি স্থির নকশা মাত্র। দ্বিতীয়ত, রিয়েল-টাইম ও ঐতিহাসিক তথ্যের সংযোগ, যা আইওটি সেন্সর, টেলিমেট্রি বা পুরোনো রেকর্ড থেকে আসে। এই তথ্য ছাড়া কোনো ডিজিটাল টুইন জীবন্ত হতে পারে না। তৃতীয়ত, বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সিমুলেশন স্তর, যা তথ্য বিশ্লেষণ করে, ভবিষ্যদ্বাণী করে এবং প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয় সমাধান দেয়। এ জায়গাতেই টুইন হয়ে ওঠে শিল্পের চালক শক্তি।
সব ডিজিটাল টুইন সমান শক্তিশালী নয়। এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। ডিজিটাল মডেল হলো সবচেয়ে প্রাথমিক ধাপ, যেখানে শুধু একটি নকশা থাকে, কিন্তু কোনো বাস্তব তথ্য যুক্ত হয় না। তার পরের ধাপ হলো ডিজিটাল শ্যাডো, যেখানে বাস্তব তথ্য একমুখীভাবে ডিজিটাল মডেলে প্রবাহিত হয়। এটি পর্যবেক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকর, কিন্তু এর কোনো প্রতিক্রিয়া বাস্তব জগতে ফেরত পাঠানো যায় না। আর শেষ ধাপেই আসে প্রকৃত ডিজিটাল টুইন—যেখানে তথ্যপ্রবাহ দুইমুখী। অর্থাৎ, বাস্তব সম্পদের পরিবর্তন ডিজিটাল টুইনে প্রতিফলিত হয়, আবার টুইনের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তব জগতেও কার্যকর হয়। টেসলার প্রতিটি গাড়ির রিয়েল-টাইম নজরদারি ও সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে পারফরম্যান্স উন্নত করার ক্ষমতাই এর চমৎকার উদাহরণ।
এই প্রযুক্তিকে বুঝতে হলে উৎপাদন শিল্পের ম্যানুফ্যাকচারিং এক্সিকিউশন সিস্টেম বা MES–এর দিকে তাকানো প্রয়োজন। MES মূলত কারখানার প্রতিটি ধাপকে ট্র্যাক করে, মান নিয়ন্ত্রণ করে, উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এবং সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত রাখে। অনেকেই আলাদা সফটওয়্যার কিনে “ডিজিটাল টুইন” তৈরি করতে চান। অথচ সত্য হলো, একটি ভালোভাবে গড়ে তোলা MES–ই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারখানার ডিজিটাল টুইন তৈরি করে। প্রতিটি মেশিন থেকে আসা তাপমাত্রা, গতি বা আউটপুট ডেটা যদি রিয়েল-টাইমে সংযুক্ত হয়, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিশ্লেষণ ও ত্রুটি নির্ণয় করা হয়, আর যদি স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়—তাহলেই সেটিই কার্যকর ডিজিটাল টুইন।
এখানে একটি বড় ভ্রান্তি ভাঙা জরুরি। ডিজিটাল টুইনের জন্য ঝকঝকে ৩ডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন জরুরি নয়। এটি মূলত ডেটা ও সংযোগের উপর দাঁড়িয়ে। কেউ চাইলে প্রশিক্ষণ বা জটিল স্থাপনার সিমুলেশনের জন্য ত্রিমাত্রিক মডেল ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু টুইনের আসল শক্তি থাকে তথ্যপ্রবাহ ও রিয়েল-টাইম প্রতিক্রিয়ায়। একটি ভালো MES যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা সিঙ্ক্রোনাইজ করে, প্রক্রিয়ার মানচিত্র বদলায়, পূর্বনির্ধারিত নিয়ম বা এআই–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়, ঠিক তেমনই এটি বাস্তব জগতের সঙ্গে দ্বিমুখী সংযোগ তৈরি করে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য কী? আমাদের শিল্পকারখানাগুলো এখনো অনেকাংশে শ্রমনির্ভর। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর অনিবার্য। গার্মেন্টস, ওষুধশিল্প, এমনকি কৃষি–প্রক্রিয়াজাত শিল্প—সবখানেই ডিজিটাল টুইনের ব্যবহার বিপ্লব আনতে পারে। একটি গার্মেন্টস কারখানায় মেশিনের স্বাস্থ্য ও কর্মপ্রবাহ যদি রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা যায়, তবে ত্রুটি ঘটার আগেই তা সমাধান করা সম্ভব হবে। এতে যেমন উৎপাদনশীলতা বাড়বে, তেমনি মান বজায় রাখা সহজ হবে।
ডিজিটাল টুইন শুধু শিল্পের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে রোগীর অবস্থা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ, শহর পরিকল্পনায় যানজট কমাতে স্মার্ট সিটি মডেল, কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও এর ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় যদি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, ওষুধের সরবরাহ ও রোগীর তথ্যকে একত্রে একটি ডিজিটাল টুইনে রূপান্তর করা যায়, তবে চিকিৎসার মান উন্নত হবে এবং সম্পদের অপচয় কমবে।
অতএব, ডিজিটাল টুইনকে আর ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন মনে করার সুযোগ নেই। এটি আজকের বাস্তবতা, যা শিল্প, স্বাস্থ্য ও শহুরে জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করছে। বাংলাদেশ যদি শিল্প ৪.০–এর যাত্রায় পিছিয়ে না থাকতে চায়, তবে এখনই এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার প্রস্তুতি নিতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতা আর শ্রমঘন উৎপাদন দিয়ে সম্ভব নয়; দরকার তথ্যনির্ভর, বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার। আর তারই কেন্দ্রে রয়েছে এই নতুন প্রযুক্তি—ডিজিটাল টুইন।

Leave a comment