মেলাদিন পর আমার প্রাণের এমসি কলেজ হোস্টেলে গেলাম।
সেই এডমিশনের পর অবশ্য অনেকবারই যাওয়া হয়েছে।
কিন্তু এবারেরটা একটু ভিন্ন।
আমার রুমমেট শ্রদ্ধেয় জনি ভাইয়ের সাথে দেখা।
দেখা তো আগেও হত।
কিন্তু এটা খুব একটা স্থায়ী হত না।
এবারেরটাতে টানা তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা বসে আড্ডা দেয়া হলো।
আড্ডার মধ্যে অনেক আধ্যাত্মিক বিষয় ছিল। উনার সাথে কথা বলাটা অনেকটা যেন একটা আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করে ডুবে থাকার মতো অনুভূতি।
তো, তিনি আমাকে কোন এক ক্ষণে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসলেন,
“মানুষ কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয় বা বস্তুকে দেখার পর, পরে কি এমন কোনোভাবে, ধরা যাক কোনো হরমোন ইনজেক্ট করার মাধ্যমে সেই জিনিসটাকে আবার না দেখেও স্মৃতিতে খুব স্পষ্টভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?”
প্রশ্নটা শুনে আমি একটু থামলাম। কারণ প্রশ্নটা আসলে শুধু সাধারণ কৌতূহল নয় এটা সরাসরি মানব মস্তিষ্ক, স্মৃতি এবং হরমোনের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে।
আমি বললাম,
মানুষের স্মৃতি আসলে কোনো একক জায়গায় জমা থাকে না; বরং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে তৈরি হয়। বিশেষ করে Hippocampus নতুন স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর আবেগজনিত স্মৃতিতে Amygdala কাজ করে।
যখন আমরা কোনো কিছু দেখি, তখন সেই দৃশ্য শুধু চোখে ধরা পড়ে না, মস্তিষ্ক সেটাকে নিউরনের সংযোগ বা synaptic pattern হিসেবে সংরক্ষণ করে। পরে যখন আমরা সেই স্মৃতিটা মনে করি, তখন আসলে মস্তিষ্ক সেই একই নিউরাল প্যাটার্নকে আবার আংশিকভাবে সক্রিয় করে।
এখানে হরমোনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যেমন-
Dopamine কোনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বা আনন্দদায়ক মনে হলে স্মৃতিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
Adrenaline উত্তেজনা বা ভয়ংকর ঘটনার স্মৃতিকে অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে।
Cortisol কখনো স্মৃতি শক্তিশালী করে, আবার অতিরিক্ত হলে স্মৃতি দুর্বলও করতে পারে।
তবে শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট হরমোন ইনজেক্ট করলেই যে নির্দিষ্ট কোনো দৃশ্য বা বস্তু মস্তিষ্কে আবার স্পষ্টভাবে চলে আসবে এমনটা সরাসরি সম্ভব নয়।
কারণ স্মৃতি কোনো “একটা বোতাম” নয়। এটা অনেকগুলো নিউরনের জটিল নেটওয়ার্কের ফল।
তবে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে দেখেছেন যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরন বা memory engram কৃত্রিমভাবে সক্রিয় করলে স্মৃতি জাগিয়ে তোলা যায়। বিশেষ করে Neuroscience এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ইঁদুরের মস্তিষ্কে লেজার বা বৈদ্যুতিক উত্তেজনা দিয়ে নির্দিষ্ট স্মৃতি আবার সক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে হয়তো প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে তোলা সম্ভব হবে।
কিন্তু শুধুমাত্র একটি হরমোন ইনজেকশন দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো স্মৃতি “ডাকলে চলে আসবে” মানব মস্তিষ্ক এখনো ততটা সরলভাবে কাজ করে না।
আমি শেষে তাকে বললাম,
মানুষের মস্তিষ্ক আসলে একটা লাইব্রেরির মতো।
হরমোনগুলো সেই লাইব্রেরির আলো জ্বালাতে বা ম্লান করতে পারে,
কিন্তু কোন বইটা খুলবেন সেটা ঠিক করে নিউরনের সংযোগ আর আপনার অভিজ্ঞতার গল্প।
আর হয়তো এই কারণেই-
মানুষের স্মৃতি শুধু বিজ্ঞান নয়,
একটু রহস্যও।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment