কৃষি

“আমাদের বীজের মাত্র ২০ শতাংশ আমরা নিজেরা জোগান দিতে পারি”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার কথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ধানখেত, কৃষকের মুখে হাসি, কিংবা বন্যার পর মাঠে নেমে পড়া সংগ্রামের দৃশ্য। কিন্তু এই পুরো কৃষি ব্যবস্থার ভেতরে সবচেয়ে মৌলিক উপাদানটি—‘বীজ’—নিয়েই রয়েছে এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকট। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর ভাষায়, “আমাদের দেশে বীজের যে ডিমান্ড, তার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ আমরা নিজেরা জোগান দিতে পারি।” এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে বাংলাদেশের কৃষির দুর্বলতার গভীরতা।

বীজ: কৃষির সবচেয়ে উপেক্ষিত ভিত্তি

বীজ ছাড়া কৃষি কল্পনাই করা যায় না। একটি ভালো বীজ মানেই একটি সুস্থ গাছ, ভালো ফলন এবং শেষ পর্যন্ত কৃষকের মুখে হাসি। কিন্তু বাস্তবতায় বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক এখনও আগের বছরের ফসল থেকে সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এতে ফলনের মান কমে যায়, রোগবালাই ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে এবং উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে না। ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সরকারি পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে মোট বীজের চাহিদার মাত্র এক-পঞ্চমাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদিত ও বিতরণ করা সম্ভব হয়। আলুর বীজের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট—প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ মানসম্মত বীজ সরবরাহ করা হয়। ডালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যশস্যের বীজ উৎপাদন আরও ভয়াবহভাবে কম, যা ১ শতাংশের কাছাকাছি। তেলবীজের ক্ষেত্রেও সরবরাহ চাহিদার তুলনায় নগণ্য। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যা নয়; এগুলো দেশের কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

কেন এত বড় ঘাটতি?

বীজ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। একদিকে উন্নতমানের বীজ উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই, অন্যদিকে কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগেই মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি দেখা যায়। অনেক কৃষক এখনও জানেন না কোন বীজ বেশি ফলন দেয়, কোনটি রোগ প্রতিরোধী। ফলে তাঁরা বাধ্য হয়ে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করেন। এতে কৃষি উৎপাদন একটি চক্রে আটকে থাকে—কম ফলন, কম আয়, আবারও কম বিনিয়োগ।

ড. আবেদ চৌধুরী এই সংকটকে শুধু কৃষিবিদ্যার সমস্যা হিসেবে দেখেন না; তিনি এটিকে একটি সামাজিক ও নীতিগত ব্যর্থতার ফল বলে মনে করেন। তাঁর মতে, শহরের নীতিনির্ধারক ও শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের সঙ্গে গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের বাস্তব জীবনের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় কৃষির মৌলিক সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকে গেছে। বীজের মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে যতটা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা দরকার ছিল, তা করা হয়নি।

বীজ উৎপাদন: বিজ্ঞান ও ব্যবসার সমন্বয়

বীজ উৎপাদনকে অনেকেই কেবল ‘ব্যবসা’ হিসেবে দেখতে চান না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টেকসই ব্যবসায়িক কাঠামো ছাড়া উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও বিতরণ দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, উন্নত দেশগুলোতে বীজ কোম্পানিগুলো গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাত উদ্ভাবন করে, মানসম্মত পরিবেশে বীজ উৎপাদন করে এবং কৃষকের কাছে সরবরাহ করে। এতে কৃষক উন্নত ফলন পান, আর কোম্পানি তাদের বিনিয়োগের সঠিক মূল্য পায়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো একচেটিয়া ব্যবসা কৃষকের বিকল্প সীমিত করে দেয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে কৃষক ন্যায্য মূল্যে ভালো বীজ পাবেন এবং কোনো কোম্পানি বা মধ্যস্বত্বভোগী কৃষককে শোষণ করতে পারবে না। ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, বীজ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোক্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

খাদ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, জমির পরিমাণ বাড়ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যাও ক্রমেই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হলে সবচেয়ে কার্যকর ও তুলনামূলকভাবে সহজ উপায় হলো উন্নতমানের বীজের ব্যবহার। একটি উন্নত জাতের বীজ একই জমিতে ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ফলন দিতে পারে—যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, বীজ সংকট সমাধান না করতে পারলে ভবিষ্যতে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, কৃষকের আয় কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের ওপর নয়, শহরের ভোক্তাদের ওপরও পড়বে—খাদ্যের দাম বাড়বে, পুষ্টি সংকট তৈরি হবে।

করণীয় কী?

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং গবেষণাভিত্তিক বীজ উন্নয়ন কর্মসূচির সমন্বয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত বীজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, স্থানীয় পর্যায়ে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত উন্নত জাত দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে।

ড. আবেদ চৌধুরীর মতো বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা যদি নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশের বীজ সংকট সমাধান অসম্ভব নয়। বীজের ভেতরেই যেমন একটি গাছের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে, তেমনি বীজের উন্নয়নেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।


ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org