মানুষের পেশাগত জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবেশ এখন ভবিষ্যতের কোনো কল্পনা নয়—বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে শিল্প উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই এটি এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট কাজের প্রায় ৪০ শতাংশে কোনো না কোনোভাবে এআই–সহায়তা যুক্ত হবে, আর প্রায় ৩০ কোটি চাকরি আংশিক বা পুরোপুরি অটোমেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে (Goldman Sachs, ২০২৪)। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত একটি বাক্য আজ প্রায়ই শোনা যায়—“এআই আপনাকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং যে মানুষ এআই ব্যবহার করতে শেখে, সে-ই আপনাকে প্রতিস্থাপন করবে।” এই বাক্যটি শুনতে যত ভয়ঙ্কর মনে হোক, গবেষক ও স্কলারদের জন্য এটি আসলে নতুন ক্ষমতা অর্জনের এক আমন্ত্রণ।
বাংলাদেশের গবেষণা-পরিবেশও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ, ল্যাব নোট বিশ্লেষণ বা সাহিত্য পর্যালোচনায় মানবশ্রমই প্রধান ছিল, এখন জেনারেটিভ এআই মডেলের সাহায্যে সাহিত্য পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ এবং হাইপোথেসিস তৈরির সময় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে— এমনটাই জানিয়েছে Nature (২০২৪)–এর একটি রিপোর্ট। কিন্তু এখানে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার: এআইয়ের সাহায্যে কাজ দ্রুত হয় ঠিকই, কিন্তু গবেষণার প্রকৃতি, প্রশ্ন করার ক্ষমতা, নৈতিকতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাটি মানুষের হাতেই থাকে।
আমরা জানি, কোনো যন্ত্রই মানুষের স্বাভাবিক সৃজনশীলতা, কল্পনা বা বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টির জায়গা দখল করতে পারে না। তবু পরিবর্তনের ঢেউটা বাস্তব। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ—যেমন তথ্য কোডিং, ডেটা ক্লিনিং, বড় ডেটাসেটে ট্রেন্ড খোঁজা বা প্রাথমিক খসড়া তৈরি—এসব জায়গায় এআই এখন মানুষের তুলনায় কয়েকগুণ দ্রুত। ম্যাককিনজি (২০২৩) দেখিয়েছে, গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) সময় বাঁচানোর পিছনে এআই অটোমেশনের অবদান বাড়ছে বছরে ১৫–২০ শতাংশ হারে।
ফলে প্রশ্ন আসে—এর মানে কি গবেষকরা কাজ হারাবেন? বাস্তবতা ঠিক উল্টো। কারণ যেখানে যন্ত্র একঘেয়ে কাজ করছে, মানুষ সেখানে আরও জটিল, উচ্চমানের সৃজনশীল সিদ্ধান্তনির্ভর কাজে এগোচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ড্রাগ ডিসকভারি। এআই যেখানে কয়েক মিলিয়ন যৌগ বিশ্লেষণ করে কয়েক ঘণ্টায় সম্ভাব্য প্রার্থী দেখাতে পারে, সেখানে মানুষের কাজ হলো সেসব ফলাফল যাচাই করা, পরীক্ষা ডিজাইন করা, নৈতিক দিকগুলো মূল্যায়ন করা। তাই যন্ত্র মানুষের সহযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
বাংলাদেশের গবেষণা সমাজের জন্য এটি একটি বিশেষ সুযোগ। দেশে বর্তমানে প্রতি দশ লাখ জনসংখ্যায় গবেষকের সংখ্যা মাত্র ২৫২ জন, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই সংখ্যা ৭১৪৩ জন (UNESCO, ২০২৩)। এর মানে হলো—বাংলাদেশে প্রতিটি গবেষকের ওপরে কাজের চাপ বেশি, সম্পদ সীমিত, আর সময় আরও মূল্যবান। এখানে এআই–সহায়তা গবেষকদের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ বা তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন, বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণে যেখানে আগে কয়েক সপ্তাহ লাগত, এখন সে কাজ কয়েক ঘণ্টায় শেষ করা সম্ভব।
শিক্ষকতা, স্বাস্থ্যসেবা বা নীতি-নির্ধারণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে মানবিক অনুভূতি, সহানুভূতি, নৈতিক বিচারের জায়গাটি অপরিবর্তনীয়। একজন চিকিৎসকের চোখে রোগীর প্রতি আস্থা, একজন শিক্ষকের শিক্ষার্থীর বিভ্রান্তি ধরে ফেলার ক্ষমতা—এগুলো কোনো অ্যালগরিদমের নাগালের বাইরে। তাই মানবসেবামূলক পেশায় মানুষের স্থান কখনোই সংকুচিত হবে না। গবেষণাতেও মানবিক অন্তর্দৃষ্টি, সৃজনশীলতা, তাত্ত্বিক বোঝাপড়া—এসব জায়গা যন্ত্রের পক্ষে প্রতিলিপি করা অসম্ভব।
এআইয়ের প্রসারে নতুন নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এআই–চালিত গবেষণার সাথে যুক্ত নতুন চাকরির সংখ্যা প্রতি বছর প্রায় ২২ শতাংশ করে বাড়ছে (LinkedIn Future of Jobs Report, ২০২৫)। ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই–সহায়ক গবেষক, বৈজ্ঞানিক কম্পিউটিং বিশেষজ্ঞ—এ ধরনের ভূমিকা খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ যেখানে কিছু কাজ কমে যাচ্ছে, সেখানে নতুন দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হচ্ছে দ্রুতগতিতে।
তবু অনেক তরুণ গবেষক ও পিএইচডি শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করেন—এত অটোমেশন ও এআই–এর ভিড়ে গবেষক হিসেবে আমার ভবিষ্যৎ কোথায়? উত্তরটা খুব সরল—আপনি যদি এআইকে ব্যবহার করতে শেখেন, এআই আপনাকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং আপনার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আর যদি পিছিয়ে থাকেন, তখনই এআই–সমর্থিত মানুষ আপনাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে।
গোল্ডম্যান স্যাক্স ও OECD–এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভবিষ্যতের গবেষকরা তিন ধরনের দক্ষতায় অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবেন: কৌতূহল, শেখার ক্ষমতা এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা। এআই কোড লিখতে পারে, আপনার লিটারেচার সাজিয়ে দিতে পারে, এমনকি গ্রান্ট প্রপোজালের একটি খসড়াও তৈরি করতে পারে; কিন্তু কোন গবেষণা প্রশ্নটি সত্যিই মূল্যবান—সেই বোধ তৈরি করতে পারে কেবল মানুষই।
আজকের গবেষণা-পরিবেশে চ্যাটজিপিটি, গুগল কো-পাইলট বা জেনারেটিভ এআই জানা মানে নতুন যুগের সাক্ষরতা। এগুলোকে ভয় না করে বরং নিজের কাজের দক্ষতা বাড়ানোর সরঞ্জাম হিসেবে দেখতে হবে। ঠিক যেমন একসময় কম্পিউটার ব্যবহার করা ছিল একটি বিশেষ দক্ষতা, পরে তা হয়ে যায় মৌলিক মানব–অভ্যাস—এআইও তেমনই এক নতুন মানদণ্ড।
সবশেষে, গবেষক হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রযুক্তি কখনো মানুষের জায়গা দখল করতে আসে না; প্রযুক্তি আসে মানুষের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে। বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস বলে, মানুষ যখনই নতুন সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে, তখনই নতুন জ্ঞানের দরজা খুলেছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করার এই সময়টাই ভবিষ্যতের গবেষণা-অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে থাকবে।
আগামী দিনের ল্যাবরেটরি হবে মানুষ ও এআই–এর যৌথ কর্মস্থল—যেখানে যন্ত্রের গণনাশক্তি আর মানুষের সৃজনশীলতা মিলেই তৈরি হবে নতুন জ্ঞান, নতুন উদ্ভাবন। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন সেই গবেষক, যিনি এআইকে নিজের সক্ষমতার অংশ করতে শিখেছেন।

Leave a comment