চিকিৎসা বিদ্যাবিজ্ঞান বিষয়ক খবর

আঁধারঘরে আলোর খেলা : চিকিৎসায় নোবেল ও স্নায়ুবিজ্ঞানের বিপ্লব

Share
Share

লেখক:
তোফাজ্জল ইসলাম
ডিন, গ্রাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মানুষের মস্তিষ্ক এক অপার বিস্ময় ও রহস্যের আধার, যেখানে শতকোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরন প্রতিনিয়ত সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান করে আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও দৈহিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। বহু দশক ধরে স্নায়ুবিজ্ঞানীদের একটাই আক্ষেপ ও সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—যদি মস্তিষ্কের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট নিউরনকে ইচ্ছামতো চালু (On) বা বন্ধ (Off) করার কোনো নিবিড় ও সূক্ষ্ম উপায় খুঁজে পাওয়া যেত! প্রথাগত বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে মস্তিষ্কের কোনো অংশকে সক্রিয় করতে গেলে কাঙ্ক্ষিত নিউরনের পাশাপাশি চারপাশের শত শত পার্শ্ববর্তী নিউরনও অপ্রয়োজনে উত্তেজিত হয়ে পড়ত। এটি ছিল পিয়ানোর কেবল একটি সুনির্দিষ্ট সুর বাজাতে গিয়ে পুরো কিবোর্ডে একসাথে থাবা বসানোর মতো সীমাবদ্ধতা।

স্নায়ুবিজ্ঞানের সেই দীর্ঘদিনের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এক চিলতে নিখুঁত আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছে ২০২৬ সালের চিকিৎসা ও শারীরতত্ত্বে নোবেল বিজয়ী গবেষণাটি।

সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি এ বছর চিকিৎসায় যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার প্রদান করেছে তিন অসামান্য বিজ্ঞানীকে—যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার ও সাইকিয়াট্রিস্ট অধ্যাপক কার্ল ডাইসেরোথ (Karl Deisseroth), জার্মানির বার্লিন হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত বায়োফিজিসিস্ট অধ্যাপক পিটার হেগেম্যান (Peter Hegemann) এবং জার্মানির ভ্যুরৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রোফিজিওলজিস্ট অধ্যাপক গেয়র্গ নাগেল (Georg Nagel)।

নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, আলোক-সংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল (Light-gated Ion Channels) আবিষ্কার এবং আলোর সাহায্যে স্নায়ুকোষের ক্রিয়াকলাপ সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণের বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘অপটোজেনেটিক্স’ (Optogenetics) উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

এই যুগান্তকারী সাফল্যের পেছনে রয়েছে তিন ভিন্নধর্মী বৈজ্ঞানিক প্রতিভার এক অসাধারণ মেলবন্ধন। ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া জার্মান বায়োফিজিসিস্ট পিটার হেগেম্যান এককোষী শৈবালের আলো চেনার ক্ষমতা নিয়ে মৌলিক গবেষণা চালিয়ে অপটোজেনেটিক্সের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি উন্মোচন করেন, যাকে এই প্রযুক্তির অন্যতম জনক বলা হয়। ১৯৫৩ সালে জন্ম নেওয়া তাঁর সহকর্মী জার্মান বিজ্ঞানী গেয়র্গ নাগেল কোষপর্দার প্রোটিন ও আয়ন চ্যানেলের জটিল তড়িৎ-শারীরবৃত্তীয় (Electrophysiological) বৈশিষ্ট্য প্রমাণে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। আর ১৯৭১ সালে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরোথ সেই আবিষ্কৃত জিনকে জীবন্ত প্রাণীর নিউরনে স্থানান্তরিত করে লেজার আলোর সাহায্যে চালনা করার বিস্ময়কর কৌশল উদ্ভাবন করেন।

আলো ও জিনের এই বৈপ্লবিক যুগলবন্দী স্নায়ুবিজ্ঞানীদের এমন এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছে, যার মাধ্যমে এখন কেবল এক ঝলক আলো ফেলেই মস্তিষ্কের গভীরে থাকা নির্দিষ্ট স্নায়ুপথকে নিখুঁতভাবে চালনা করা যাচ্ছে। এর ফলে পারকিনসন্স, তীব্র বিষণ্নতা, অন্ধত্ব ও পিটিএসডি-র মতো জটিল স্নায়বিক রোগের নিরাময়ে উন্মোচিত হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন স্বর্ণযুগ।

পুকুরের সবুজ শৈবাল থেকে স্নায়ুবিজ্ঞানের মহাবিপ্লব

যে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি আজ পারকিনসন্স, তীব্র বিষণ্নতা কিংবা অন্ধত্ব নিরাময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তার সূচনার গল্পটি কিন্তু কোনো আধুনিক হাসপাতাল বা উচ্চপ্রযুক্তির নিউরোলজি ল্যাবরেটরিতে রচিত হয়নি। বরং এর গোড়াপত্তন হয়েছিল শান্ত মিষ্টি পানির পুকুরে ভেসে বেড়ানো অতি সাধারণ এক অণুবীক্ষণিক এককোষী সবুজ শৈবাল—ক্ল্যামাইডোমোনাস রেইনহার্ডটি (Chlamydomonas reinhardtii)-র দেহে!

এই অণুবীক্ষণিক শৈবালগুলোর বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো সূর্যালোক, কারণ আলো ছাড়া তারা খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া বা সালোকসংশ্লেষণ সম্পাদন করতে পারে না। কিন্তু চোখে না দেখা এই অতি ক্ষুদ্র শৈবালটি কীভাবে ঠিক টের পায় আলো কোথায় আছে, আর কীভাবে আলোর দিকেই সাঁতরে ধাবিত হয়?

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল শৈবালটির কোষপর্দায় থাকা এক বিস্ময়কর প্রোটিনের মধ্যে।

এই প্রোটিনটি মূলত একটি আলোক-সংবেদনশীল দরজার (Light-gated Channel) মতো কাজ করে। যেই মুহূর্তেই এর ওপর আলো এসে পড়ে, অমনিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজাটি খুলে যায় এবং কোষের ভেতর বিদ্যুৎবাহী আয়ন প্রবেশ করতে শুরু করে। আয়নের এই প্রবাহ শৈবালের দেহে ক্ষুদ্র এক তড়িৎ-তরঙ্গ তৈরি করে, যা তাকে আলোর অভিমুখে সাঁতার কাটার নির্দেশনা দেয়। প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম এক সৃষ্টির এই অসাধারণ আলোক-সংবেদনশীলতা যে একদিন মানব মস্তিষ্কের রহস্য উদ্ঘাটনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে—তা তখন কল্পনাও করা যায়নি।

চ্যানেলরোডোপসিন: রহস্যের জট উন্মোচন

১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে জার্মান বায়োফিজিসিস্ট পিটার হেগেম্যান শৈবালের এই চমৎকার আলো-সংবেদনশীলতার পেছনের রাসায়নিক মেকানিজম নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালান। তিনি নিশ্চিত হন যে, শৈবালের দেহে এমন এক বিশেষ প্রোটিন রয়েছে যা সরাসরি আলো শোষণ করে কোষে সংকেত পাঠায়। তবে এটি কীভাবে কাজ করে—তা অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন ছিল বায়োফিজিক্স ও ইলেকট্রোফিজিওলজির সূক্ষ্ম দক্ষতা। এ সময় তিনি হাত মেলান বিজ্ঞানী গেয়র্গ নাগেল-এর সাথে, যিনি আয়ন চ্যানেল এবং কোষের তড়িৎ-শারীরবিদ্যায় (Electrophysiology) অনন্য দক্ষতার অধিকারী ছিলেন।

দুই বিজ্ঞানীর এই যৌথ প্রচেষ্টা ২০০২ ও ২০০৩ সালে এক ঐতিহাসিক সাফল্যের মুখ দেখে। তাঁরা শৈবালের কোষ থেকে সফলভাবে একটি জিন পৃথক করে নতুন এক প্রোটিন আবিষ্কার করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘চ্যানেলরোডোপসিন’ (Channelrhodopsin)। সাধারণত জীবদেহে আলো গ্রহণ করা এবং কোষে আয়ন প্রবেশ করানো—এ দুটি কাজ আলাদা আলাদা প্রোটিন দ্বারা সম্পন্ন হয়। কিন্তু চ্যানেলরোডোপসিনের অনন্য রূপটি ছিল বিস্ময়কর; এটি একই সাথে আলো গ্রহণকারী ‘রিসেপ্টর’ এবং আয়ন চলাচলের ‘গেট’ হিসেবে কাজ করে।

এই প্রোটিনের কার্যপ্রণালী ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য। এর ওপর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো (বিশেষ করে নীল আলো) পড়ামাত্রই এটি এক গেটের মতো খুলে যায় এবং কোষের বাইরে থাকা ধনাত্মক আয়নকে (যেমন: সোডিয়াম আয়ন) দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। অর্থাৎ, কোনো জটিল রাসায়নিক সংকেত ছাড়াই আলো নিজেই ছিল এই আয়ন-দরজার নিখুঁত এক চাবি! এর মাধ্যমে বিজ্ঞানজগতে প্রথমবারের মতো উন্মোচিত হলো—শুধুমাত্র আলো ব্যবহার করেই কোষের ভেতরে তড়িৎ-প্রবাহ সৃষ্টি করা সম্ভব।

কার্ল ডাইসেরোথ ও অপটোজেনেটিক্সের জন্ম

হেগেম্যান ও নাগেলের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার যখন বিজ্ঞানজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডাইসেরোথ (Karl Deisseroth) মানব মস্তিষ্কের রহস্য উদ্ঘাটনে এর বিপুল সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর মনে এক অতি সাহসী ধারণার জন্ম নেয়: শৈবালের এই আলো-সংবেদনশীল প্রোটিনের জিন যদি কোনোভাবে স্তন্যপায়ী প্রাণী বা মানুষের নিউরনে স্থানান্তর করা যায়, তবে কি কেবল আলো ফেলেই স্নায়ুকোষের কর্মকাণ্ড চালনা করা সম্ভব হবে?

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে ডাইসেরোথ এবং তাঁর গবেষণাদল—যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দুই প্রতিভাবান তরুণ গবেষক এড বয়ডেন (Ed Boyden) ও ফং ঝাং (Feng Zhang)—এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেন। তাঁরা একটি নিরাপদ ও নিষ্ক্রিয় ভাইরাসের বাহক (Viral Vector) ব্যবহার করে চ্যানেলরোডোপসিনের জিনটি ইঁদুরের নিউরনের ডিএনএ-তে সফলভাবে পৌঁছে দেন। বিস্ময়করভাবে, ইঁদুরের নিউরনটি নিজস্ব প্রোটিন তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সেই আলোক-সংবেদনশীল চ্যানেল তৈরি করে নিজের কোষপর্দায় (Cell Membrane) বসিয়ে নেয়। এরপর ডাইসেরোথ যখন অপটিক্যাল ফাইবারের সূক্ষ্ম তার দিয়ে এক ঝলক নীল আলো ফেললেন, ঠিক সেই মিলিসেকেন্ডেই নিউরনটি উদ্দীপিত হয়ে বিদ্যুৎ সংকেত পাঠাতে শুরু করল, আর আলো নেভানোমাত্রই নিমিষে শান্ত হয়ে গেল। এভাবেই জন্ম নিল আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিপ্লব—‘অপটোজেনেটিক্স’ (Optogenetics), যেখানে অপটিক্স বা আলোকবিজ্ঞান এবং জেনেটিক্স বা জিনপ্রযুক্তির মেলবন্ধনে নির্দিষ্ট কোষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়।

অপটোজেনেটিক্স প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর বিপ্লবের পেছনে রয়েছে অত্যন্ত নিখুঁত ও সুবিন্যস্ত একটি বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতি। এই পদ্ধতির প্রথম ধাপে সবুজ শৈবাল থেকে আলো-সংবেদনশীল ‘চ্যানেলরোডোপসিন’ প্রোটিন তৈরির জিনটি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ও পৃথক করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে, একটি বিশেষ নিরাপদ ভাইরাল ভেক্টরের সাহায্যে সেই জিনটি মস্তিষ্কের লক্ষ্যভিত্তিক নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে স্থানান্তর করা হয়। জিন স্থানান্তরের পর নিউরনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রোটিন প্রকাশ ঘটিয়ে নিজের কোষপর্দায় আলো-সংবেদনশীল গেট বা চ্যানেল স্থাপন করে। সর্বশেষ ধাপে, ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লেজার আলো ফেলে মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের নিখুঁত সময়মাত্রায় কাঙ্ক্ষিত নিউরনটিকে ইচ্ছামতো চালু (On) বা বন্ধ (Off) করে স্নায়ুবিক সার্কিট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নিউরোসাইন্সে বৈপ্লবিক প্রভাব

অপটোজেনেটিক্স কেবল গবেষণাগারের একটি চমৎকার কৌশল হয়ে থাকেনি, বরং গত দুই দশকে এটি স্নায়ুবিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামগ্রিক পরিমণ্ডল বদলে দিয়েছে। এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট কোনো স্নায়ু সার্কিট বা পথ কী ভূমিকা পালন করে, তা রিয়েল-টাইমে সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারছেন।

স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপের এই সুসূক্ষ্ম উন্মোচন চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহু জটিল ও দীর্ঘদিনের নিরাময়হীন রোগের কারণ অনুসন্ধান ও নতুন চিকিৎসার পথ তৈরি করেছে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে অপটোজেনেটিক্সের প্রয়োগ অত্যন্ত বিস্তৃত ও সম্ভাবনাময়। পারকিনসন্স রোগের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের মোটর নিউরন সার্কিটের ঠিক কোন অংশটি অকেজো হয়ে রোগীর শরীরে কাঁপুনি সৃষ্টি করে, তা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে; যা ভবিষ্যতের প্রথাগত ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশনের অপ্রয়োজনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়িয়ে নিখুঁত থেরাপি উদ্ভাবনে সহায়তা করছে। একইভাবে, অন্ধত্ব নিরাময়েও অপটোজেনেটিক্স অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার মতো রোগে রেটিনার ক্ষতিগ্রস্ত আলোকগ্রাহী কোষের বিকল্প হিসেবে গ্যাংলিয়ন কোষে চ্যানেলরোডোপসিন স্থাপন করে রোগীদের আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।

মনোরোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও অপটোজেনেটিক্স এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তীব্র বিষণ্নতা ও অ্যানহেডোনিয়া বা আনন্দ অনুভূতির অক্ষমতা চিকিৎসায় মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সার্কিটে ডোপামিন নিঃসরণকারী নিউরনগুলোকে আলোর সাহায্যে সক্রিয় করে মনের স্বাভাবিক আনন্দবোধ পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে লক্ষ্যভিত্তিক সাইকিয়াট্রিক থেরাপি ও বিষণ্নতার নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া, দুর্ঘটনা-পরবর্তী মানসিক আঘাত বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (PTSD) চিকিৎসায় ভীতি ও ট্রমার নির্দিষ্ট স্মৃতি সংরক্ষণকারী নিউরনগুলোকে (Engram Cells) আলাদা করে আলোর সাহায্যে নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ভয়াবহ স্মৃতিজনিত মানসিক কষ্ট লাঘবে এক যুগান্তকারী দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

ক্ল্যাসিকাল স্নায়ুবিজ্ঞান বনাম অপটোজেনেটিক্স

ক্ল্যাসিকাল বা প্রথাগত স্নায়ুবিজ্ঞানে নিউরন উদ্দীপিত করার একমাত্র ভরসা ছিল সূক্ষ্ম ইলেকট্রোডের ব্যবহার। কিন্তু এর প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল সুনির্দিষ্টতার অভাব—মস্তিষ্কের কোনো অংশে ইলেকট্রোড প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত নিউরনের পাশাপাশি চারপাশের সমস্ত স্নায়ুকোষই একসাথে উত্তেজিত হয়ে উঠত। ফলে হাজারও স্নায়ুসংকেতের কোলাহলে নির্দিষ্ট একটি কোষের নিজস্ব ভূমিকা উদ্ঘাটন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। অপটোজেনেটিক্সের সবচেয়ে বড় জয়যাত্রা ঠিক এখানেই—এর অসাধারণ ‘সেল-টাইপ স্পেসিফিসিটি’ (Cell-type specificity) বা কোষভিত্তিক সুনির্দিষ্টতায়। মস্তিষ্কের কোনো অঞ্চলে দশ প্রকারের নিউরন থাকলেও গবেষকরা আলো ব্যবহার করে বেছে বেছে কেবল আলো-সংবেদনশীল প্রোটিনযুক্ত নির্দিষ্ট এক প্রকার নিউরনকেই কার্যকর করতে পারেন, যা বাকিগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রভাবিত রাখে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মিলিসেকেন্ডের নিখুঁত সময়গত নিয়ন্ত্রণ (Temporal control)—আলো ফেলতেই নিউরন উদ্দীপিত হয়, আর আলো বন্ধ করতেই শান্ত হয়ে যায়।

স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণের এই সুসূক্ষ্ম ছন্দপ্রবাহ মানুষের মস্তিষ্কের প্রাকৃতি স্বাভাবিক কাজের গতির সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পুকুরের মিষ্টি পানিতে ভেসে থাকা অণুবীক্ষণিক একফোঁটা সবুজ শৈবাল যে একদিন মানুষের তীব্র বিষণ্নতা কাটানো, স্মৃতি মেপে দেখা কিংবা পারকিনসন্সের কাঁপুনির রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হয়ে উঠবে—তা কিছুদিন আগেও ছিল কল্পনার অতীত। কিন্তু কার্ল ডাইসেরোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেয়র্গ নাগেলের হাত ধরে প্রকৃতির সেই গোপন বিদ্যা আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন সীমান্ত রচনা করেছে।

উপসংহার

২০২৬ সালের এই নোবেল বিজয়ী গবেষণা আমাদের নতুন করে শিখিয়েছে যে, বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল ও কঠিনতম প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির একদম ক্ষুদ্রতম সৃষ্টির ভেতরেই। অপটোজেনেটিক্স কেবল তিনটি নামের স্বীকৃতি নয়, বরং এটি আলো ও জিনের সেই বিস্ময়কর যুগলবন্দীর সম্মাননা, যা আমাদের মানব মস্তিষ্কের নিবিড় আঁধার সরিয়ে জটিল স্নায়ুসংকেতের সুনির্দিষ্ট সুর শোনার অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছে—উন্মোচন করেছে এক নতুন আশার ভোর।

লেখক : ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ; প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর। ফেলো: ফুলব্রাইট (যুক্তরাষ্ট্র) ও দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS)।
[email protected]

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ