লেখক:
মো. ইফতেখার হোসেন
সম্পাদকীয় পর্যালোচনায়:
মো. মঞ্জুরুল ইসলাম
তথ্য যাচাই:
মো. ইফতেখার হোসেন
প্রকাশ:
০৫ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ হালনাগাদ:
০৫ অক্টোবর ২০২৬
পুকুরের স্থির জলে ভেসে থাকা এক কোষের সবুজ শৈবাল, যার নাম ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas), কোনোদিন কল্পনাও করেনি যে তার শরীরের একটি প্রোটিন একদিন মানুষের মস্তিষ্কের রহস্যের দরজা খুলে দেবে। সে শুধু জানত, বেঁচে থাকতে হলে আলোর দিকে সাঁতরে যেতে হয়। তার ক্ষুদ্র দেহে আছে একটি আলোসংবেদী “চোখের বিন্দু”, আর সেই বিন্দুর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এমন এক প্রোটিন, যা আলো পড়লেই কোষের পর্দায় একটি দরজা খুলে দেয়। সেই প্রোটিনের নাম চ্যানেলরোডপসিন (Channelrhodopsin)। ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার এসেছে ওই দরজাটিরই গল্পে।
স্টকহোমের নোবেল অ্যাসেম্বলি এ বছর পুরস্কারটি দিয়েছে তিনজনকে: কার্ল ডাইসেরোথ (Karl Deisseroth), পিটার হেগেমান (Peter Hegemann) ও গেওর্গ নাগেল (Georg Nagel), “আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিক্স (Optogenetics) বিষয়ক আবিষ্কারের জন্য”। এই তিনজনের কাজের ভাগটি ভারি সুন্দর। হেগেমান ও নাগেল শৈবালের ভেতরের সেই অদ্ভুত প্রোটিনটিকে চিনলেন, বুঝলেন আলো কীভাবে জীবন্ত কোষের পর্দায় বিদ্যুৎপ্রবাহের পথ খুলে দেয়। তাঁদের আবিষ্কার ছিল যেন একটি তালার সন্ধান পাওয়া। আর ডাইসেরোথ সেই তালার চাবিটি বানালেন। তিনি প্রোটিনটিকে স্নায়ুকোষের ভেতরে বসিয়ে দিলেন, আর শৈবালের একটি সামান্য প্রয়োজন হয়ে উঠল জীবন্ত মস্তিষ্কের ভেতরে একটি আলোর সুইচ।

ছবি: নোবেল পুরস্কার ঘোষণার অনুষ্ঠানে কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেলের ছবি।
এই সুইচের মূল্য বুঝতে হলে একবার সেই অন্ধকার ঘরটির কথা ভাবতে হয়, যেখানে এতদিন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা কাজ করছিলেন। মানুষের মস্তিষ্কে আছে প্রায় একশো বিলিয়ন স্নায়ুকোষ, যেন একটি অতিকায় শহর, যেখানে কোটি কোটি সুইচ, অথচ কোনটি কোন বাতির, তা কেউ জানে না। কোন কোষ স্মৃতি জাগায়, কোনটি ভয়, কোনটি ক্ষুধা, কোনটি আনন্দ, তা আলাদা করে ধরার উপায় ছিল না। বৈদ্যুতিক শলাকা ঢোকালে আশপাশের শত শত কোষ একসঙ্গে সাড়া দিত, যেন একটি বাতি জ্বালাতে গিয়ে পুরো পাড়ার বিদ্যুৎ টেনে দেওয়া হলো। ওষুধ দিলে সারা মস্তিষ্কেই তার প্রভাব ছড়াত। বিজ্ঞানীরা জানতেন, তাঁদের দরকার একটি সূক্ষ্ম আঙুল, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সুইচেই চাপ দেবে। কথিত আছে, ফ্রান্সিস ক্রিক (Francis Crick)-এর মতো মনীষীও বহু আগে বলেছিলেন, মস্তিষ্ক বুঝতে হলে এমন কোনো উপায় চাই যা কেবল একধরনের কোষকে নিয়ন্ত্রণ করবে, আর আলো হতে পারে সেই আদর্শ বাহন। সেই স্বপ্নটি বাস্তব হলো অনেক বছর পর, এক শৈবালের হাত ধরে।
পদ্ধতিটি শুনতে যতটা জটিল, ধারণায় ততটাই সরল। গবেষক প্রথমে নির্দিষ্ট একধরনের স্নায়ুকোষে ওই আলোসংবেদী প্রোটিনের জিন পৌঁছে দেন। তারপর একটি চুলের মতো সরু আলোকতন্তু (Optical Fiber) দিয়ে মস্তিষ্কের ভেতরে আলো ফেলেন। যে কোষগুলোর ভেতরে প্রোটিনটি আছে, কেবল সেগুলোই জ্বলে ওঠে, বা প্রোটিনের ধরন বদলালে নিভে যায়। এই সাড়া আসে মিলিসেকেন্ডের হিসাবে, অর্থাৎ মস্তিষ্ক নিজে যে গতিতে কথা বলে, সেই গতিতেই। প্রাণীটি তখন জেগে আছে, চলছে, খাচ্ছে, ভয় পাচ্ছে, আর আমরা দেখছি, ঠিক কোন কোষগুলোর জাগরণে কোন আচরণের জন্ম হচ্ছে। এতদিন আমরা মস্তিষ্কের পাশে দাঁড়িয়ে তার কথা আড়ি পেতে শুনতাম। এখন আমরা তার সঙ্গে কথোপকথনে নামতে পারি।
এই কথোপকথনেই বেরিয়ে এসেছে বিস্ময়কর সব সত্য। ইঁদুরের মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট স্মৃতির ছাপ বহনকারী কোষগুলোকে আলো দিয়ে ডেকে আনা গেছে। ভয়, আগ্রাসন, ক্ষুধা আর আনন্দের বৈদ্যুতিক ঠিকানা চেনা গেছে। বিষণ্নতা (Depression), সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia), মৃগীরোগ (Epilepsy), পারকিনসন্স (Parkinson’s Disease), আসক্তি (Addiction), এসব রোগের পেছনে মস্তিষ্কের কোন বৃত্তাকার পথ ভুল সুরে বাজছে, সেই পাঠ আজ আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট। অথচ এই রোগগুলোই একদিন আমাদের সমাজে কত ভুল নামে চেনা হতো, কখনো অভিশাপ, কখনো দুর্বলতা, কখনো অলৌকিক আছর। অপটোজেনেটিক্স (Optogenetics) আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মনের অসুখের পেছনেও থাকে স্নায়ুকোষের প্রকৃত এক জীবন্ত বিন্যাস, যাকে দেখা যায়, বোঝা যায় এবং একদিন হয়তো সারানোও যায়। নোবেল কমিটির ভাষায়, এই পদ্ধতি স্নায়ুবিজ্ঞানে নতুন এক যুগের ভিত্তি গেঁথেছে।
আর চিকিৎসার জগতে সবচেয়ে কৌতূহলজাগানিয়া প্রয়াসটি দৃষ্টিশক্তি ফেরানো নিয়ে। রেটিনার আলোগ্রাহী কোষ নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ অন্ধ হয়ে যান, কিন্তু চোখের ভেতরের আরও বহু স্নায়ুকোষ তখনও বেঁচে থাকে, শুধু আলোর খবর পায় না। গবেষকরা সেই বেঁচে থাকা কোষগুলোকেই আলোসংবেদী করে তোলার চেষ্টা করছেন। যে শৈবাল আলোর দিকে সাঁতরাত, তার প্রোটিন হয়তো একদিন অন্ধকারে আটকে থাকা মানুষকেও আলোর দিকে ফিরিয়ে দেবে। এ যেন প্রকৃতির নিঃশব্দ এক পরিহাস: পৃথিবীর সবচেয়ে সরল জীবের কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে জটিল অঙ্গের ভাষা।
এই গল্পের একটি শিক্ষা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বিশেষভাবে গভীর। যাঁরা শৈবালের এই প্রোটিন নিয়ে কাজ করছিলেন, তাঁরা মস্তিষ্কের কথা ভেবে শুরু করেননি। তাঁদের তাড়না ছিল নিছক কৌতূহল, একটি এককোষী জীব আলো চেনে কীভাবে। এমন প্রশ্নকে প্রথম দেখায় বিলাসিতা মনে হয়, “কী কাজে লাগবে” জিজ্ঞেস করলে উত্তর মেলে না। অথচ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় বাঁকগুলো এসেছে এমন প্রশ্ন থেকেই, যার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে একদিন অপ্রত্যাশিত দরজা খুলে গেছে। যে সমাজ কেবল তাৎক্ষণিক উপযোগিতার হিসাবে গবেষণার মূল্য মাপে, সে হয়তো কখনোই পুকুরের সবুজ জলের দিকে তাকানোর ধৈর্য দেখায় না। অথচ সেখানেই, এক কোষের এক চোখের বিন্দুতে, লুকিয়ে ছিল আমাদের ভাবনা, ভয়, স্মৃতি আর ভালোবাসার সুইচবোর্ডের চাবি।
আজ নোবেলের মঞ্চে আলো পড়েছে তিনজন মানুষের ওপর। কিন্তু সেই আলোর আসল উৎস একটি নাম-না-জানা শৈবাল, যে কোটি কোটি বছর ধরে শুধু আলোর দিকে সাঁতরে এসেছে, মানুষের মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনের ভার তার কাঁধে চাপবে জেনে নয়।
তথ্যসূত্র:
১. The Nobel Assembly at Karolinska Institutet. Press release: The Nobel Prize in Physiology or Medicine 2026 (Karl Deisseroth, Peter Hegemann, Georg Nagel). NobelPrize.org. ৫ অক্টোবর ২০২৬।
২. American Academy of Arts and Sciences-এর Rumford Prize সংক্রান্ত প্রেস রিলিজ।
সর্বশেষ হালনাগাদ:
০৫ অক্টোবর ২০২৬

Leave a comment