“এই পথের একটি ধাপও যদি আটকে যায়—যেমন বীজ বিতরণে বাধা বা কৃষকের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব—তাহলে যুগান্তকারী গবেষণাও কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।”
কৃষি গবেষণার সাফল্যের খবর শুনলে আমাদের চোখে সাধারণত নতুন ফসলের ছবি ভাসে: খরা সহ্য করবে, লবণাক্ত জমিতে টিকবে কিংবা বেশি ফলন দেবে। কিন্তু পরীক্ষাগারে সম্ভাবনাময় একটি গাছ তৈরি হওয়া আর কৃষকের জমিতে সেই গাছের ফলন পাওয়া এক ঘটনা নয়। মাঝখানে বহু মানুষের কাজ, বহু পরীক্ষা ও কয়েকটি জরুরি সিদ্ধান্ত রয়েছে। ড. শিরিন আক্তারের এই সতর্কবাণী সেই দীর্ঘ পথটির কথা মনে করিয়ে দেয়।
চীনের লানচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এই বাংলাদেশি গবেষক বিজ্ঞানী ডট অর্গের সাক্ষাৎকারে নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছেন। শুরুতে বিজ্ঞানীরা কোনো প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য খোঁজেন। ধরুন, কিছু গাছ অন্যদের তুলনায় লবণাক্ত মাটিতে ভালো টিকে থাকে। কেন এমন হচ্ছে, তা বুঝতে তাদের জিন ও বেড়ে ওঠার ধরন পরীক্ষা করা হয়। এরপর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দেখা হয়, বৈশিষ্ট্যটি বারবার একইভাবে কাজ করছে কি না। একবার ভালো ফল পেলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
পরের কাজটি আরও কঠিন। সহনশীল গাছটির অন্য প্রয়োজনীয় গুণও থাকতে হবে—যেমন উপযুক্ত ফলন ও চাষের সময়। গবেষকেরা তাই কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যটি চাষের উপযোগী জাতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। প্রচলিত সংকরায়নের পাশাপাশি জিনের পরিচিত চিহ্ন দেখে চারা বাছাই বা অন্য আধুনিক পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে। তবে যে পদ্ধতিই ব্যবহার করা হোক, শেষ পর্যন্ত নতুন জাতটির সামগ্রিক কার্যকারিতা যাচাই করতে হয়।
এরপর আসে মাঠপরীক্ষা। একটি এলাকার লবণাক্ত জমিতে ভালো ফল করা জাত অন্য এলাকার দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় ব্যর্থ হতে পারে। তাই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এবং একাধিক পরিস্থিতিতে পরীক্ষা প্রয়োজন। শুধু গাছটি বেঁচে আছে কি না, তা দেখলেই হবে না; কৃষক কতটা শস্য পেলেন, কখন ফসল তুলতে পারলেন এবং চাষপদ্ধতি তাঁদের পক্ষে অনুসরণ করা সম্ভব হলো কি না, সেসবও দেখতে হবে। এই ধাপে কৃষকের পর্যবেক্ষণ গবেষণার ফল বুঝতে সাহায্য করে।
ধরা যাক, সব পরীক্ষায় একটি জাত আশাব্যঞ্জক ফল দিল। এখানেও পথ শেষ নয়। পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্মত বীজ উৎপাদন করতে হবে। তারপর সেই বীজ প্রয়োজনের সময়ে সঠিক এলাকার কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। বীজ দেরিতে এলে চাষের মৌসুম চলে যেতে পারে। আবার কীভাবে বপন, সেচ ও জমির পরিচর্যা করতে হবে, তা কৃষক না জানলে জাতটির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে নাও লাগতে পারে। এই কারণেই মাঠপর্যায়ের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ গবেষণার ধারাবাহিক অংশ।
ড. শিরিনের বর্ণনায় পথটি হলো: বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, নতুন জাতে বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা, বিভিন্ন স্থানে মাঠপরীক্ষা, বীজ উৎপাদন এবং কৃষকের কাছে বীজ ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া। ধাপগুলো শুনতে সরল হলেও প্রতিটির জন্য গবেষক, বীজ উৎপাদনকারী, কৃষি-সহায়তাকারী এবং কৃষকের মধ্যে সমন্বয় দরকার। একটি ধাপে তথ্য আটকে গেলে পরের ধাপের মানুষ হয়তো বুঝতেই পারবেন না কী করতে হবে।
এটি কেবল গবেষণাগারের দক্ষতার প্রশ্নও নয়। কোন এলাকার কৃষকের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাঁদের কাছে বীজ পৌঁছানোর ব্যবস্থা আছে কি না এবং মাঠে সমস্যা দেখা দিলে কার কাছে সাহায্য চাইবেন—এসব প্রশ্ন আগেই ভাবতে হয়। যেমন, লবণাক্ত এলাকায় প্রয়োজনের সময় বীজ না পাওয়া গেলে সহনশীল জাতের বৈজ্ঞানিক গুণ কৃষকের কোনো কাজে আসে না। উদ্ভাবনের মূল্য নির্ধারিত হয় সেই গুণটি ব্যবহার করার বাস্তব সুযোগ দিয়েও।
নতুন পদ্ধতিতে জাত উদ্ভাবনের সময় কমার কথাও বলেছেন শিরিন। তাঁর দেওয়া তুলনায় প্রচলিত দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সাত থেকে আট বছর লাগতে পারত, আর দ্রুত পদ্ধতিতে কিছু ক্ষেত্রে দুই থেকে চার বছরে কাজ এগোতে পারে। এটি সব ফসলের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়। দ্রুত আবিষ্কার হলেও মাঠপরীক্ষা, বীজ উৎপাদন বা বিতরণের কাজ বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং গতি বাড়লে প্রতিটি ধাপের দায়িত্ব স্পষ্ট রাখা আরও জরুরি।
একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করা তাই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, শেষ গন্তব্য নয়। কৃষকের হাতে বীজ পৌঁছানো এবং তাঁর জমিতে তা সত্যিই কাজে লাগা—সেখানেই গবেষণার সামাজিক মূল্য বোঝা যায়। ড. শিরিন আক্তার জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল, কৃষকের অভিজ্ঞতা ও এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপ নিয়ে আরও আলোচনা করেছেন বিজ্ঞানী ডট অর্গের পূর্ণ সাক্ষাৎকারে।

Leave a comment