গবেষণার প্রথম পদক্ষেপগবেষণায় হাতে খড়ি

“প্র্যাকটিক্যাল শেখাই গবেষণার আসল দরজা খুলে দেয়” – ড. মো. হাফিজুর রহমান

Share
Share

“গবেষক হতে চাইলে শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, হাতে-কলমে শেখার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে; কারণ নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হলে বাস্তবে কাজ করতে জানতে হয়।”

বিজ্ঞান শেখার শুরু হয় বই থেকে, কিন্তু বিজ্ঞানকে সত্যিকার অর্থে বোঝা যায় হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে। একটি সূত্র মুখস্থ করা যায়, কিন্তু সেই সূত্রের বাস্তব অর্থ বোঝা যায় পরীক্ষাগারে। একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া বইয়ে পড়া যায়, কিন্তু সেই বিক্রিয়ার রং, গন্ধ, সময়, তাপ, ব্যর্থতা ও ফলাফল বোঝা যায় প্র্যাকটিক্যাল কাজের মধ্যে দিয়ে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান শিক্ষার্থীদের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো দিয়েছেন, তার মধ্যে হাতে-কলমে শেখার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, গবেষণা করতে হলে প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা দরকার। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে যে প্র্যাকটিক্যাল করানো হয়, সেগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে বুঝে রাখা উচিত। কারণ গবেষণা শেষ পর্যন্ত নতুন কিছু করার চেষ্টা, আর সেই নতুন কিছু তৈরি হয় পরীক্ষাগার, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

আমাদের অনেক শিক্ষার্থী প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসকে শুধুই পরীক্ষার অংশ হিসেবে দেখে। খাতায় লিখতে হবে, ভাইভা দিতে হবে, নম্বর পেতে হবে—এই পর্যন্তই। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালের আসল উদ্দেশ্য নম্বর পাওয়া নয়; বরং বিজ্ঞানকে চোখের সামনে দেখা। বইয়ে লেখা “অম্ল”, “ক্ষার”, “বিক্রিয়া”, “দ্রবণ”, “তাপমাত্রা”, “ঘনত্ব”—এসব শব্দ যখন বাস্তবে পরীক্ষাগারে দেখা যায়, তখন বিজ্ঞান আর শুধু মুখস্থ বিষয় থাকে না; সেটি অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

ড. হাফিজুর রহমানের নিজের জীবনেও এই হাতে-কলমে শেখার গুরুত্ব বারবার দেখা যায়। জাপানের গবেষণাগারে গিয়ে তিনি অনেক নতুন যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতির মুখোমুখি হন। তিনি তখন কোনো অহংকার করেননি। চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও মেশিন চালানো শিখেছেন। কারণ গবেষণার জগতে যে কাজ জানে, সেই শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে। পদবির চেয়ে দক্ষতা বড়, বয়সের চেয়ে অভিজ্ঞতা বড়।

এই শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমরা অনেক সময় তত্ত্বকে প্র্যাকটিক্যালের ওপর বসাই, কিন্তু ভালো বিজ্ঞানী হতে হলে দুটোই দরকার। তত্ত্ব বলে দেয় কী ঘটতে পারে; প্র্যাকটিক্যাল দেখায় বাস্তবে কী ঘটে। অনেক সময় বইয়ের প্রত্যাশিত ফল আর বাস্তব পরীক্ষার ফল এক হয় না। তখনই গবেষকের কাজ শুরু হয়—কেন মিলল না, কোথায় সমস্যা, কোন শর্ত বদলেছে, কীভাবে উন্নতি করা যায়।

এই প্রশ্নগুলোই গবেষণার প্রাণ।

একজন শিক্ষার্থী যদি প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে শুধু কপি করে খাতা পূরণ করে, তবে সে নম্বর পেতে পারে; কিন্তু গবেষণার মানসিকতা তৈরি হবে না। আর যদি সে নিজে পর্যবেক্ষণ করে, শিক্ষককে প্রশ্ন করে, ফলাফল মিলছে কি না দেখে, ভুল হলে কারণ খোঁজে—তাহলে তার মধ্যে ধীরে ধীরে গবেষকসুলভ চিন্তা তৈরি হয়।

বিজ্ঞান শেখার ক্ষেত্রে হাতে-কলমে কাজের কয়েকটি বড় উপকার আছে।

প্রথমত, এতে ভয় কমে। অনেক শিক্ষার্থী রসায়ন বা পদার্থবিজ্ঞানকে কঠিন মনে করে, কারণ তারা বিষয়গুলোকে শুধু বইয়ের ভাষায় দেখে। কিন্তু পরীক্ষাগারে কাজ করলে বোঝা যায়, বিজ্ঞান বাস্তব জিনিস নিয়ে কাজ করে—পানি, তাপ, আলো, ধাতু, রং, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জীবন্ত কোষ, মাটি, উদ্ভিদ, পরিবেশ। তখন বিষয়টি জীবন্ত হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, এতে ভুল থেকে শেখা যায়। কোনো পরীক্ষা প্রথমবারেই ঠিক হবে—এমন নয়। দ্রবণ ঠিকমতো তৈরি নাও হতে পারে, মাপ ভুল হতে পারে, যন্ত্র ঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। কিন্তু এই ভুলগুলোই শেখার সুযোগ। গবেষণাগারে ব্যর্থতা মানে শেষ নয়; বরং নতুন প্রশ্নের শুরু।

তৃতীয়ত, এতে দক্ষতা তৈরি হয়। পিপেট ধরা, ব্যালান্সে মাপা, মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার, ডাটা নেওয়া, গ্রাফ আঁকা, সফটওয়্যার ব্যবহার—এসব ছোট ছোট দক্ষতা একসময় বড় গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে। ড. হাফিজুর রহমানও শিক্ষার্থীদের বলেছেন, শুধু “করে দিন” বলা যাবে না; শিখতে হবে কীভাবে নিজে করা যায়।

চতুর্থত, হাতে-কলমে শেখা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজে একটি পরীক্ষা করতে পারে, নিজে ডাটা বিশ্লেষণ করতে পারে, নিজে একটি গ্রাফ বানাতে পারে, তখন তার ভেতরে বিশ্বাস জন্মায়—“আমি পারি।” এই আত্মবিশ্বাস বিদেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রেজেন্টেশন এবং পেশাগত জীবনে বড় ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ল্যাব সুবিধা অনেক জায়গায় সীমিত—এ কথা সত্য। সব স্কুলে ভালো ল্যাব নেই, সব কলেজে আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ফান্ড নেই। কিন্তু সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্র্যাকটিক্যাল শেখার আগ্রহ হারানো যাবে না। ছোট পরীক্ষা, সাধারণ পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞান মেলা, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, অনলাইন সিমুলেশন, ওপেন-সোর্স ডেটা বিশ্লেষণ—এসব দিয়েও শুরু করা যায়।

প্র্যাকটিক্যাল শেখার অর্থ শুধু রাসায়নিক পরীক্ষা নয়।
কেউ জীববিজ্ঞান ভালোবাসলে গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
কেউ পরিবেশবিজ্ঞান ভালোবাসলে স্থানীয় পানির গুণমান নিয়ে ছোট গবেষণা করতে পারে।
কেউ পদার্থবিজ্ঞান ভালোবাসলে আলো, তাপ, শব্দ বা বিদ্যুৎ নিয়ে ছোট পরীক্ষা করতে পারে।
কেউ ডাটা সায়েন্সে আগ্রহী হলে বাস্তব ডেটা নিয়ে গ্রাফ, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা শিখতে পারে।

গবেষণার শুরু সবসময় বড় ল্যাব থেকে হয় না; অনেক সময় শুরু হয় ছোট প্রশ্ন থেকে। “আমাদের এলাকার পানির রং কেন বদলায়?”, “স্কুলের পাশে মাটির গুণমান কেমন?”, “কোন গাছ বেশি দ্রুত বাড়ে?”, “কোন কাপড় বেশি পানি শোষণ করে?”, “কোন উপাদান তাপ বেশি ধরে রাখে?”—এমন প্রশ্নও একজন শিক্ষার্থীকে গবেষণার পথে নিয়ে যেতে পারে।

ড. হাফিজুর রহমানের জীবন আমাদের দেখায়, গবেষণার পথে শেখা চলতেই থাকে। গ্রাম থেকে শহর, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাপানের ল্যাব, আবার বাংলাদেশে ফিরে সীমিত সুবিধার মধ্যে গবেষণা—প্রতিটি ধাপে তাঁকে নতুন করে শিখতে হয়েছে। তিনি কখনো শেখাকে ছোট করেননি। জুনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও শিখেছেন, নতুন যন্ত্রের সামনে নিজেকে শিক্ষার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

এটাই একজন সত্যিকারের গবেষকের পরিচয়।

তাই শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—

প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসকে অবহেলা করো না।
শুধু খাতা পূরণের জন্য পরীক্ষা করো না।
নিজে হাতে করো, নিজে দেখো, নিজে প্রশ্ন করো।
ভুল হলে কারণ খুঁজো।
যন্ত্র ব্যবহার শেখো।
ডাটা বুঝতে শেখো।
বিজ্ঞানকে বই থেকে বাস্তব জীবনে নিয়ে আসো।

কারণ গবেষণা মুখস্থ উত্তর দিয়ে এগোয় না; এগোয় পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, ভুল, সংশোধন ও হাতে-কলমে দক্ষতার মাধ্যমে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন ও পরামর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বড় বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হলে ছোট প্র্যাকটিক্যাল কাজকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আজ যে শিক্ষার্থী একটি সাধারণ পরীক্ষাও মন দিয়ে করছে, সে-ই হয়তো আগামী দিনে বাংলাদেশের পানি, মাটি, পরিবেশ বা স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে নতুন গবেষণার পথ খুলবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর মূল্যবান পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকারভিত্তিক ফিচার—
“পরিবেশবান্ধব উপকরণ গবেষণায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানীর পথচলা”

তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles