উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগগবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

“ব্যর্থতাকে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখতে হবে” – ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানা

Share
Share
ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়: গবেষণার পথে ধৈর্যই সবচেয়ে বড় শক্তি

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি শুধু উচ্চশিক্ষায় যেতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং যে কোনো তরুণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন। কারণ আমরা অনেক সময় ব্যর্থতাকে পথের শেষ বলে ধরে নিই। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল, একটি স্কলারশিপ না পাওয়া, কোনো অধ্যাপকের ইমেইলের উত্তর না আসা, বা কোনো গবেষণা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়া—এসবকে অনেকেই নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ মনে করে। অথচ গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং বড় স্বপ্নের পথে ব্যর্থতা প্রায় অবধারিত একটি অভিজ্ঞতা।

ড. রানার নিজের জীবনেই এই সত্য স্পষ্ট। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। অনেক অধ্যাপককে তিনি ইমেইল করেছিলেন। কেউ উত্তর দিয়েছেন, কেউ দেননি; কেউ আগ্রহ দেখিয়েছেন, কিন্তু অর্থায়ন দিতে পারেননি; আবার কোথাও সরাসরি ইতিবাচক সুযোগও তৈরি হয়নি।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থী ভেঙে পড়ে। মনে হয়, হয়তো বিদেশে উচ্চশিক্ষা তার জন্য নয়, হয়তো গবেষণার পথ তার জন্য নয়। কিন্তু ড. রানা থেমে যাননি। তিনি ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার কুন্সান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির সুযোগ পান। পরে তিনি KENTECH-এ পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। আজ তিনি হাইড্রোজেন এনার্জি, ফুয়েল সেল এবং সাশ্রয়ী ক্যাটালিস্ট নিয়ে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির গবেষণায় যুক্ত।

এই গল্প আমাদের শেখায়, ব্যর্থতা অনেক সময় আসলে দরজা বন্ধ করে না; বরং আমাদের প্রস্তুতিকে আরও গভীর করে। প্রতিটি প্রত্যাখ্যান শিক্ষার্থীকে ভাবতে শেখায়—আমার সিভি কি আরও ভালো করা দরকার? আমার গবেষণার আগ্রহ কি পরিষ্কারভাবে লিখেছি? আমি কি অধ্যাপকের কাজ পড়ে ইমেইল করেছি? আমার ভাষা দক্ষতা কি যথেষ্ট? আমার একাডেমিক প্রস্তুতিতে কোথায় ঘাটতি আছে?

গবেষণার জগতে ব্যর্থতা আরও স্বাভাবিক। একটি পরীক্ষা একবারে সফল নাও হতে পারে। ল্যাবের ফল প্রত্যাশামতো নাও আসতে পারে। কোনো গবেষণাপত্র জার্নালে জমা দিলে রিভিউয়ার সেটি ফিরিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এগুলোই বিজ্ঞানচর্চার অংশ। বিজ্ঞান এগোয় প্রশ্ন, পরীক্ষা, ভুল, সংশোধন এবং আবার পরীক্ষার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই মানসিকতা বিশেষভাবে জরুরি। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় ব্যর্থতাকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। পরীক্ষায় নম্বর কম হলে শিক্ষার্থী নিজেকে ছোট মনে করে, পরিবার হতাশ হয়, সমাজ তুলনা শুরু করে। অথচ বাস্তব জীবনের বড় সাফল্যগুলো সাধারণত একাধিক ব্যর্থতা পেরিয়ে আসে।

ব্যর্থতাকে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা মানে ব্যর্থতাকে উদযাপন করা নয়; বরং ব্যর্থতা থেকে শেখার ক্ষমতা অর্জন করা। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রত্যাখ্যানের পর নিজের দুর্বলতা খুঁজে নেয়, নতুনভাবে প্রস্তুতি নেয় এবং আবার চেষ্টা করে, তাহলে সেই ব্যর্থতাই তার শক্তি হয়ে ওঠে।

ড. রানার পরামর্শ তাই অত্যন্ত বাস্তব—ধৈর্যশীল হতে হবে। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, স্কলারশিপ বা আন্তর্জাতিক ল্যাবে সুযোগ পাওয়ার পথে দ্রুত ফলের আশা করলে হতাশা আসবেই। কিন্তু লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে এবং প্রস্তুতি ধারাবাহিক হলে সুযোগ তৈরি হয়।

তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একটি ব্যর্থতা তোমার পরিচয় নয়। একটি প্রত্যাখ্যান তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। বরং তুমি প্রত্যাখ্যানের পর কী করছ, সেটিই তোমার পথ নির্ধারণ করে।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার গবেষণাযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্ন বড় হলে ধৈর্যও বড় হতে হয়। ব্যর্থতার ভেতর দিয়েই তৈরি হয় পরিণত গবেষক, দৃঢ় মানুষ এবং সফল ভবিষ্যৎ।

ড. রানার দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার পথচলা, হাইড্রোজেন এনার্জি নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বাস্তব পরামর্শ জানতে পড়ুন বিজ্ঞানী অর্গে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles