এসো শিখিগবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

“ভিত্তি শক্ত না হলে বড় স্বপ্নও দুর্বল হয়ে যায়” – ড. মো. হাফিজুর রহমান

Share
Share

“বড় হতে চাইলে আগে ভিত্তি শক্ত করতে হবে; মুখস্থ নয়, বুঝে পড়াই একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের গবেষক করে তোলে।”

অনেক শিক্ষার্থী খুব অল্প বয়স থেকেই বড় স্বপ্ন দেখে—বিদেশে পড়বে, গবেষণা করবে, বিজ্ঞানী হবে, নতুন কিছু আবিষ্কার করবে। এই স্বপ্ন অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের কথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে: বড় স্বপ্ন দেখার আগে নিজের ভিত্তি বা বেসিক শক্ত করতে হবে।

তিনি নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, হাই স্কুল পর্যায় থেকেই বিজ্ঞান শেখার আসল অভ্যাস তৈরি হওয়া দরকার। শুধু পরীক্ষার জন্য পড়া নয়; পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো বুঝতে হবে। কারণ পরবর্তী জীবনে একজন শিক্ষার্থী যে ক্ষেত্রেই যাক—রসায়ন, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান বা উপকরণবিজ্ঞান—এই ভিত্তিগুলোই তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় ভালো নম্বর পাওয়ার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরাও অনেক সময় পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন, সাজেশন, সংক্ষিপ্ত উত্তর বা মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে অসুবিধা হয়। ড. হাফিজুর রহমান এই সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন—অনেক শিক্ষার্থী ভালো রেজাল্ট করলেও বেসিক প্রশ্ন করলে পারে না।

এখানেই “ভালো ছাত্র” এবং “ভালো গবেষক” হওয়ার পার্থক্য বোঝা যায়।

ভালো ছাত্র পরীক্ষার উত্তর মুখস্থ করতে পারে। কিন্তু ভালো গবেষক প্রশ্ন করতে পারে—

কেন এমন হলো?

কীভাবে হলো?

যদি এই শর্ত বদলাই, তাহলে কী হবে?

এই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কোথায় কাজে লাগতে পারে?

বিজ্ঞান আসলে এই “কেন” ও “কীভাবে”-এর জগৎ। তাই শুধু সূত্র মুখস্থ করলেই বিজ্ঞান শেখা হয় না; সূত্রটি কোথা থেকে এল, কী বোঝায়, বাস্তবে কোথায় প্রযোজ্য—এসব বুঝতে হয়।

যেমন রসায়নে কোনো বিক্রিয়া মুখস্থ করা যায়। কিন্তু একজন গবেষক জানতে চাইবে—এই বিক্রিয়া কেন ঘটে? কোন অণু কোন অণুর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে? তাপমাত্রা বদলালে কী হবে? দ্রাবক বদলালে ফল বদলাবে কি না? এই প্রশ্নগুলো থেকেই গবেষণার চিন্তা তৈরি হয়।

ড. হাফিজুর রহমানের নিজের জীবনেও আমরা এই ভিত্তি তৈরির গুরুত্ব দেখি। ইন্টারমিডিয়েটে রসায়ন তাঁর কাছে কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে একজন সিনিয়রের সহায়তায় তিনি রসায়নের বেসিক বুঝতে শুরু করেন। সেই বোঝাপড়াই তাঁকে ধীরে ধীরে রসায়নের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। পরে পলিমার রসায়ন, বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণ, পানি শোধন প্রযুক্তি—এসব জটিল গবেষণাক্ষেত্রে কাজ করার ভিত্তি তৈরি হয়।

অর্থাৎ একটি বিষয় কঠিন লাগলে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং তার ভিত্তি বোঝার চেষ্টা করাই আসল পথ।

হাই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়েই চিন্তার অভ্যাস তৈরি হয়। কেউ যদি এই সময় শুধু মুখস্থ করে, তাহলে সে পরবর্তীতে জটিল ধারণা বুঝতে সমস্যায় পড়তে পারে। আবার কেউ যদি এই সময় থেকেই প্রশ্ন করে, উদাহরণ খোঁজে, ছোট পরীক্ষা করে, শিক্ষককে জিজ্ঞেস করে, বইয়ের বাইরের ব্যাখ্যা পড়ে—তাহলে তার শেখার ভিত্তি শক্ত হয়।

বেসিক বোঝা মানে কঠিন ভাষায় পড়া নয়। বরং সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা।

গণিত মানে শুধু অঙ্ক করা নয়; যুক্তি বোঝা।

পদার্থবিজ্ঞান মানে শুধু সূত্র নয়; প্রকৃতির নিয়ম বোঝা।

রসায়ন মানে শুধু বিক্রিয়া নয়; পদার্থের ভেতরের পরিবর্তন বোঝা।

জীববিজ্ঞান মানে শুধু নাম মুখস্থ করা নয়; জীবনের প্রক্রিয়া বোঝা।

ড. হাফিজুর রহমান শিক্ষার্থীদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন—স্বপ্ন বড় করতে হবে, কিন্তু সেই স্বপ্নকে নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা এবং বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। এই মিল খুঁজে পেতে হলে আগে বিভিন্ন বিষয়ের ভিত্তি জানা দরকার। যে শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা ও বাস্তবজগতের সমস্যা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে, সে ভবিষ্যতে নিজের পথ আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেছে নিতে পারে।

আজকের শিক্ষার্থীদের সামনে সুযোগ অনেক। অনলাইন লেকচার, ওপেন কোর্স, ইউটিউব, বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট, গবেষণাপত্র, ভার্চুয়াল ল্যাব—সবই পাওয়া যায়। কিন্তু সুযোগ থাকলেই শেখা হয় না। শেখার জন্য দরকার মনোযোগ, নিয়মিততা এবং বোঝার আগ্রহ।

তাই শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার—

শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ো না।

বেসিক বুঝে পড়ো।

প্রশ্ন করতে ভয় পেয়ো না।

ভুল করলে আবার শেখো।

একটি বিষয় না বুঝলে অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করো।

ছোট ক্লাস থেকেই বিজ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শেখো।

কারণ বড় গবেষণা শুরু হয় ছোট প্রশ্ন থেকে।

বড় বিজ্ঞানী তৈরি হয় শক্ত ভিত্তির ওপর।

আর শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় মুখস্থ নয়, বোঝার মাধ্যমে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন ও পরামর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গ্রাম, স্কুল, সুযোগের সীমাবদ্ধতা—এসব বাধা হতে পারে, কিন্তু বেসিক বুঝে পড়ার অভ্যাস একজন শিক্ষার্থীকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। আজ যে শিক্ষার্থী মন দিয়ে ভিত্তি তৈরি করছে, সে-ই হয়তো আগামী দিনের গবেষণাগারে বাংলাদেশের কোনো বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর মূল্যবান পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকারভিত্তিক ফিচার—

“পরিবেশবান্ধব উপকরণ গবেষণায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানীর পথচলা”

তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles