“চোখ যদি এতই নিখুঁত হয়, তবে অন্ধ মানুষ কেন কিছুই দেখতে পান না?”
প্রশ্নটি করতেই পুরো শ্রেণিকক্ষ নীরব হয়ে গেল। চোখ তো দেখার অঙ্গ। তাহলে অন্ধত্বের কারণ চোখেই থাকার কথা। শিক্ষক বোর্ডে একটি চোখ আঁকলেন। তারপর চোখের পেছন থেকে একটি রেখা টেনে মস্তিষ্ক পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। রেখাটি দেখিয়ে বললেন, “অনেকেই ভাবো, চোখ দেখে। আসলে চোখ শুধু আলো সংগ্রহ করে। পৃথিবীকে অর্থ দেয় মস্তিষ্ক। আর চোখ থেকে মস্তিষ্কে সেই তথ্য পৌঁছে দেয় অপটিক নার্ভ।”
ক্লাসের পেছন থেকে একজন ছাত্র জিজ্ঞেস করল, “স্যার, তাহলে এই পথটাই যদি নষ্ট হয়ে যায়?” শিক্ষক মুচকি হেসে বললেন, “তাহলে চোখ সুস্থ থাকলেও মানুষ দেখতে পারবে না। অনেকটা যেমন বর্ষায় একটি গ্রামের একমাত্র সেতু ভেঙে গেলে দুই পাশের মানুষ একে অপরকে দেখতে পেলেও সহজে পৌঁছাতে পারে না। অপটিক নার্ভও ঠিক তেমনই। এটি চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে তথ্য বহনকারী একমাত্র সেতু।”
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য দৃশ্য দেখি। সকালের রোদ, ধানক্ষেতের সবুজ, বইয়ের অক্ষর, প্রিয় মানুষের মুখ কিংবা সন্ধ্যায় আজানের ধ্বনির সঙ্গে মিলিয়ে আকাশের রঙ বদলে যাওয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসবের কোনোটিই চোখ সরাসরি “দেখে” না। চোখ কেবল আলোর কণাগুলো গ্রহণ করে। সেই আলোর অর্থ, রং, আকৃতি ও গভীরতা তৈরি হয় মস্তিষ্কে। অর্থাৎ আমরা চোখ দিয়ে নয়, মস্তিষ্ক দিয়ে দেখি। অপটিক নার্ভ সেই নীরব দূত, যে প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর খবর চোখ থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়।
কিন্তু মানুষ কি সবসময় এই সত্য জানত?
প্রাচীন গ্রিসে দৃষ্টি নিয়ে নানা ধারণা প্রচলিত ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, চোখ থেকে একধরনের অদৃশ্য রশ্মি বেরিয়ে বস্তুকে স্পর্শ করে, তারপর আমরা তাকে দেখতে পাই। আজ এই ধারণা ভুল বলে জানা গেলেও, সে সময় মানুষের কাছে এটি যুক্তিসংগত মনে হয়েছিল। কারণ তখন চোখের ভেতরের গঠন কিংবা মস্তিষ্কের সঙ্গে তার সম্পর্ক সম্পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না। মানুষের কৌতূহল তখনও উত্তর খুঁজছিল।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন প্রাণীর দেহ বিচ্ছেদ করে চোখ ও মস্তিষ্কের সংযোগ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি অপটিক নার্ভ শনাক্ত করেছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন, এটি দৃষ্টির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যদিও তিনি মনে করতেন এর ভেতর দিয়ে একধরনের “দর্শন-আত্মা” প্রবাহিত হয়, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তবু তাঁর কাজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। তিনি প্রথমদের মধ্যে একজন, যিনি চোখকে একটি বিচ্ছিন্ন অঙ্গ হিসেবে নয়, মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
কয়েক শতাব্দী পরে ইসলামি স্বর্ণযুগের বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইসাম মানুষের দৃষ্টিবিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনি দেখান, আলো চোখ থেকে বের হয় না; বরং বাইরের বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে চোখে প্রবেশ করে। শুধু মত প্রকাশ নয়, তিনি পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্যতম ভিত্তিও এখানেই। প্রকৃতিকে বুঝতে হলে বিশ্বাসের চেয়ে প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এরও কয়েক শতাব্দী পরে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়োহানেস কেপলার দেখালেন, রেটিনায় যে ছবি তৈরি হয়, তা আসলে উল্টো। কিন্তু আমরা তো পৃথিবীকে উল্টো দেখি না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রেনে দেকার্ত বললেন, চোখ কেবল একটি লেন্স। প্রকৃত দেখার কাজটি ঘটে মস্তিষ্কে। আজকের স্নায়ুবিজ্ঞান তাঁর সেই ধারণাকেই আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা বাইরের পৃথিবীকে সরাসরি দেখি না। আমরা দেখি, মস্তিষ্ক সেই পৃথিবীকে যেভাবে ব্যাখ্যা করে।
উনিশ শতকে জার্মান বিজ্ঞানী হেরমান ফন হেল্মহোল্টজ দৃষ্টিবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করেন। তিনি “অপথালমোস্কোপ” উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জীবিত মানুষের রেটিনা ও অপটিক নার্ভ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। আজও আধুনিক চক্ষুবিজ্ঞানে সেই যন্ত্রের উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করা হয়। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে আছে।
কিন্তু অপটিক নার্ভ আসলে কী?
অনেকে একে একটি সাধারণ স্নায়ু মনে করেন। বাস্তবে এটি প্রায় বারো লাখ অ্যাক্সনের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল তথ্যপথ। রেটিনায় আলো পড়ার পর রড ও কোণিকা কোষ সেই আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে। তারপর সেই সংকেত বাইপোলার কোষ হয়ে গ্যাংলিয়ন কোষে পৌঁছায়। গ্যাংলিয়ন কোষগুলোর দীর্ঘ অ্যাক্সন একত্র হয়ে অপটিক নার্ভ তৈরি করে। অনেকটা যেমন বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট খাল ও নদী একসময় পদ্মা, যমুনা বা মেঘনার মতো বড় নদীতে এসে মিশে যায়, তেমনি লক্ষ লক্ষ স্নায়ুতন্তু একত্র হয়ে এই একটিমাত্র তথ্যপথ গড়ে তোলে। এখান থেকেই শুরু হয় চোখ থেকে মস্তিষ্কের দিকে আলোর দীর্ঘ যাত্রা।
দুই চোখের অপটিক নার্ভ মস্তিষ্কের নিচে এসে একটি বিশেষ স্থানে মিলিত হয়, যাকে বলা হয় অপটিক কায়াজমা। এখানেই দৃষ্টিবিজ্ঞানের এক অসাধারণ বিন্যাস কাজ করে। প্রতিটি চোখের নাসিকামুখী অংশের স্নায়ুতন্তু বিপরীত পাশের মস্তিষ্কে চলে যায়, আর বাইরের অংশের তন্তুগুলো একই পাশে থেকে যায়। অনেকটা দেশের একটি বড় রেলওয়ে জংশনের মতো, যেখানে বিভিন্ন দিক থেকে আসা ট্রেন নির্দিষ্ট লাইনে ভাগ হয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এই বিন্যাসের কারণেই দুই চোখের আলাদা আলাদা তথ্য একত্রিত হয়ে আমাদের সামনে একটি ত্রিমাত্রিক পৃথিবী গড়ে তোলে। দূরত্ব বিচার করা, চলন্ত বস্তুর গতি বোঝা কিংবা কারও মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি চিনে নেওয়া, সবকিছুর পেছনেই কাজ করে এই নীরব সমন্বয়।
অপটিক নার্ভের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, যখন এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্লুকোমা, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, টিউমার কিংবা বিভিন্ন স্নায়বিক রোগে এই স্নায়ু নষ্ট হয়ে গেলে চোখ সুস্থ থাকলেও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যেতে পারে। অনেকটা ঝড়ে বিদ্যুতের প্রধান সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে যাওয়ার মতো। ঘরের প্রতিটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র অক্ষত থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকলে কোনোটিই কাজ করে না। তেমনি আলো চোখে পৌঁছালেও, অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই আলোর খবর আর মস্তিষ্কে পৌঁছায় না।
একসময় মনে করা হতো, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কোনো স্নায়ু একবার নষ্ট হলে তার আর পুনর্জন্ম সম্ভব নয়। অপটিক নার্ভও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞান স্থির নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট এবং চীনের একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে জিন থেরাপি, স্টেম সেল ও নিউরোপ্রোটেকশন নিয়ে আশাব্যঞ্জক গবেষণা চলছে। মানুষের জন্য কার্যকর চিকিৎসা এখনো প্রতিষ্ঠিত না হলেও, একসময় যাকে অসম্ভব মনে করা হতো, সেই সীমারেখা আজ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও এই ক্ষেত্রটি ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম আই ইনফার্মারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্লুকোমা ও অপটিক নিউরোপ্যাথি নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে মৌলিক গবেষণা, উন্নত গবেষণাগার এবং প্রশিক্ষিত গবেষকের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে অপটিক নার্ভের রোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। তাই এই ক্ষেত্রে গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
এই আলোচনার শুরু হয়েছিল একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে। শেষটাও যেন সেখানেই ফিরে আসে। আমাদের পাঠ্যবইয়ে চোখের গঠন শেখানো হয়, রেটিনা ও কর্নিয়ার নাম মুখস্থ করানো হয়। কিন্তু চোখ দিয়ে নয়, মস্তিষ্ক দিয়ে দেখার বিস্ময়টি খুব কমই কৌতূহলের ভাষায় তুলে ধরা হয়। অথচ একটি শিশুর মনে যদি একবার এই বিস্ময় জন্ম নেয়, তবে সেই বিস্ময়ই তাকে বিজ্ঞানের পথে হাঁটতে শেখাতে পারে।
অপটিক নার্ভ কেবল একটি স্নায়ু নয়। এটি চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যকার বিশ্বাসের সেতু। প্রতিটি সূর্যোদয়, প্রতিটি ধানক্ষেতের সবুজ, প্রতিটি নদীর ঢেউ, প্রতিটি প্রিয় মুখ, প্রতিটি বইয়ের অক্ষর এই সেতু পেরিয়েই আমাদের চেতনায় পৌঁছায়। আমরা প্রায়ই ভাবি, চোখ পৃথিবীকে দেখে। অথচ চোখ কেবল দরজাটি খুলে দেয়। পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তোলে মস্তিষ্ক, আর সেই নির্মাণের নীরব স্থপতি হয়ে অপটিক নার্ভ প্রতিটি মুহূর্তে আলোকে অর্থে, দৃশ্যকে অনুভূতিতে এবং বাস্তবতাকে আমাদের নিজস্ব পৃথিবীতে রূপান্তরিত করে।
লেখক পরিচিতিঃ
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ | আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment