ছবিঃ প্রতীকী সিজোফ্রেনিয়া
কার্ডের পর আবার লিখতে বসলাম। আসলে এটা একটা বাস্তব ঘটে যাওয়া ঘটনার ভেতর থেকে উঠে আসা লেখা। বিগত দুয়েক মাস আগে আমার মায়ের সিজোফ্রেনিয়ার একটা ভালোই রকম রোগ দেখা দেয়। এই অভিজ্ঞতাটা অবশ্য আমার কাছে একেবারে নতুন ছিল না। এর আগেও এমন কিছুর মুখোমুখি হয়েছি, তখনো মেডিকেলে পড়া শুরু করিনি, ইন্টারমিডিয়েটে থাকাকালীন আমার সহপাঠী রিফাতের মধ্যে এটা দেখা গিয়েছিল। তার এই রোগ ধরা পড়েছিল, সাথে ছিল ডিপ্রেশন, আর সম্ভবত কোনো একটা এন্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যুক্ত হয়েছিল সেবার। সেই ঘটনা নিয়ে আশেপাশে অনেক কথা রটেছিল। ধার্মিক মহলের একটা অংশ এই রোগকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন জিনে ধরার সাথে। আজ তাই ভাবলাম, সিজোফ্রেনিয়ার আসল ধারণাটা একটু বিস্তারিতভাবে বলি, যাতে এই ভুল বোঝাবুঝির জায়গাটা একটু হলেও কমে।
মস্তিষ্ক জিনিসটা আসলে একটা বিশাল যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোটি কোটি নিউরন প্রতি মুহূর্তে একে অপরের সাথে সংকেত আদান-প্রদান করে চলে, আর এই আদান-প্রদানের ভেতর দিয়েই তৈরি হয় আমাদের ভাবনা, অনুভূতি, স্মৃতি আর বাস্তবতার বোধ। যখন এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোথাও গোলমাল দেখা দেয়, বিশেষ করে ডোপামিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যে যখন হেরফের ঘটে, তখন মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে যেভাবে বোঝার কথা সেভাবে বোঝা বন্ধ করে দিতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া মূলত এই ধরনের একটা অবস্থা, যেখানে মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি আর বাস্তবের মধ্যেকার সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়।
যে মানুষটি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন তিনি এমন সব শব্দ শুনতে পারেন যা আসলে কেউ বলেনি, এমন কিছু দেখতে পারেন যা আসলে সেখানে নেই। একেই বলা হয় হ্যালুসিনেশন। আবার এমনও হতে পারে যে তার মনে এমন একটা বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে বসে যায় যা বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না, যেমন কেউ তাকে অনুসরণ করছে বা তার ক্ষতি করতে চাইছে, এমনকি প্রমাণ দেখিয়ে দিলেও সেই বিশ্বাস নড়ে না। এটাকে বলা হয় ডিলিউশন। কথাবার্তার সুতো হারিয়ে ফেলা, একটা প্রসঙ্গ থেকে আরেকটাতে অসংলগ্নভাবে চলে যাওয়া, দৈনন্দিন কাজ করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য হারিয়ে ফেলা, মুখের অভিব্যক্তি বা কণ্ঠস্বরে আবেগের প্রকাশ কমে যাওয়া, এসবও এই রোগের সাথে জড়িয়ে থাকে। লক্ষণগুলো একজন থেকে আরেকজনের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে, তীব্রতাও ওঠানামা করতে পারে সময়ের সাথে।
আমাদের সমাজে এই রোগটাকে ঘিরে যে ভুল ধারণাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তার মধ্যে জিনে ধরার ধারণাটা সবার আগে আসে। যখন কেউ এমন কথা বলতে শুরু করেন যা বাস্তবতার সাথে মেলে না, বা এমন কিছু শোনেন যা আর কেউ শোনেনি, তখন আশেপাশের মানুষ প্রথমেই একটা অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই প্রবণতাটা বোধগম্য, কারণ মস্তিষ্কের ভেতরের রাসায়নিক গোলযোগ চোখে দেখা যায় না, আর যা চোখে দেখা যায় না তাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানুষ প্রায়ই অতিপ্রাকৃতের আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা রোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এতে যথাযথ চিকিৎসা পিছিয়ে যায়, রোগী কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের চক্করে পড়েন, আর ততদিনে রোগের অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশ্বাসের জায়গা থেকে কেউ যদি এটা মনে করেন যে তার প্রিয়জনের ওপর কোনো অশুভ শক্তির প্রভাব পড়েছে, তাহলে সেই বিশ্বাসকে অসম্মান না করেও এটুকু বলা যায় যে মস্তিষ্কের রোগের চিকিৎসা মস্তিষ্কের চিকিৎসকের কাছেই হওয়া উচিত।
সিজোফ্রেনিয়ার কারণ একটামাত্র নয়, বরং কয়েকটা বিষয় মিলেই এটা তৈরি হয় বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বংশগতির একটা প্রভাব আছে, পরিবারে কারো এই রোগ থাকলে অন্যদের মধ্যেও এর ঝুঁকি কিছুটা বাড়ে। মস্তিষ্কের গঠন আর রাসায়নিক ভারসাম্যেও কিছু পার্থক্য দেখা যায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে। এর সাথে যুক্ত হয় পরিবেশগত কিছু কারণ, যেমন দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, শৈশবের কোনো আঘাতজনক অভিজ্ঞতা, বা কিশোর বয়সে মাদকের ব্যবহার। এটাও মনে রাখা জরুরি যে সিজোফ্রেনিয়ার সাথে প্রায়ই বিষণ্নতা জড়িয়ে থাকে, আর কখনো কখনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে যা সাময়িকভাবে সিজোফ্রেনিয়ার মতো মনে হয়। তাই সঠিক নির্ণয়ের জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াটাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।
চিকিৎসার কথা বললে এটা বলা দরকার যে সিজোফ্রেনিয়া আজ আর অচিকিৎসাযোগ্য কোনো রোগ নয়। এন্টিসাইকোটিক ওষুধ মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে, আর তার সাথে মনোসামাজিক থেরাপি রোগীকে দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে সহায়তা করে। পরিবারের ভূমিকা এখানে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে দোষারোপ না করে, তার কথাকে অবিশ্বাস না করে, বরং ধৈর্য নিয়ে পাশে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
রিফাতের কথা যখন মনে পড়ে, তখন মনে হয় সেদিন যদি আমরা সবাই এই বিষয়টা একটু বুঝতাম, তাহলে হয়তো ওর যন্ত্রণাটা অনেক আগেই কমানো যেত। মায়ের অসুস্থতার সময়েও এই একই উপলব্ধি নতুন করে ফিরে এলো। বিজ্ঞান আমাদের হাতে যে আলোটা তুলে দেয়, সেটা দিয়ে অন্ধকারের ভয়টুকু কাটিয়ে দেওয়াই বোধহয় সবচেয়ে বড় কাজ।
লেখক পরিচিতিঃ
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment