চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

ওজন কমানোর ওষুধ কি আমাদের অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

Share
Share

লেখক: ড. মশিউর রহমান

GLP-1 ওষুধ কোটি কোটি মানুষকে বাড়তি মেদ ঝরাতে সাহায্য করছে। কিন্তু গবেষকেরা সতর্ক করছেন—এই ওষুধ শরীরে জরুরি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। ওজন কমানো আর আগের মতো ক্লান্তিকর, দীর্ঘ লড়াই থাকছে না। গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১ (GLP-1) শ্রেণির ওষুধ—যেগুলো Ozempic, Wegovy কিংবা Mounjaro নামে পরিচিত—স্থূলতা মোকাবিলার ধরনটাই বদলে দিয়েছে। একটিমাত্র ইনজেকশনে নাটকীয় ফলাফল মিলছে।

সর্বোচ্চ ডোজে থাকা প্রাপ্তবয়স্কেরা মাত্র ১৬ মাসে শরীরের ওজনের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি কমিয়ে ফেলতে পারছেন—সঙ্গে যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, এমনকি মস্তিষ্কের জন্যও মিলছে বাড়তি উপকার। এই ওষুধ যে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বলছেন তাঁরা GLP-1 ব্যবহার করে দেখেছেন—সংখ্যায় যা প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ। আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যে গত এক বছরে আনুমানিক ১৬ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনো ওজন কমানোর ওষুধ নিয়েছেন। ওপর থেকে দেখলে GLP-1-এর এই জোয়ার আমাদের কোমরের মাপের জন্য নিঃসন্দেহে জয়। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের আড়ালে চোখে কম পড়া একটি সমস্যা ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে।

আড়ালে থাকা ঘাটতি

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ওষুধ শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যেই অনেক মানুষের শরীরে সুস্থভাবে কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের একটি গবেষণায় ৪ লাখ ৬০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ককে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, যাঁদের GLP-1 ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। দেখা যায়, প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের এক বছরের মধ্যেই কোনো না কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে—এবং তাঁদের অনেকেই তা টের পর্যন্ত পাননি।

মেক্সিকোর গবেষকদের আরেকটি গবেষণায় ৪ লাখ ৮০ হাজার GLP-1 ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রায় একই চিত্র পাওয়া গেছে: ওষুধ শুরুর এক বছরের মধ্যে ১৩.৬ শতাংশের শরীরে ভিটামিন D-এর উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে, আর প্রায় ৬০ শতাংশ খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়রন বা ক্যালসিয়াম পাচ্ছিলেন না। সমস্যাটি আরও গভীরে যায়। অন্যান্য গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, GLP-1 ব্যবহারে শরীরে একগুচ্ছ জরুরি উপাদান কমে যেতে পারে—যার মধ্যে আছে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন A, C, D ও E।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোএন্ডোক্রিনোলজি ও স্থূলতাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাইলস ইয়েও বলেন, “সুস্থ খাদ্যাভ্যাসে এই উপাদানগুলোর খুব বেশি পরিমাণে প্রয়োজন হয় না। এগুলো অণুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট—খুব সামান্য পরিমাণেই লাগে। কিন্তু এই সামান্য পরিমাণটুকুই শরীরের কাজকর্ম ঠিক রাখার জন্য একেবারে অপরিহার্য।”

আর সমস্যা শুধু অণুপুষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়। GLP-1 ব্যবহারকারীরা পর্যাপ্ত প্রোটিন আর আঁশ (ফাইবার) গ্রহণ করতেও হিমশিম খেতে পারেন। তবে এত ব্যাপক প্রচলন সত্ত্বেও এই ঘাটতিগুলো চিকিৎসকদের চোখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম। বহু মানুষ কোনোরকম পুষ্টি পর্যবেক্ষণ ছাড়াই এই ওষুধ ব্যবহার করছেন—২০২৫ সালে International Journal of Obesity-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে যাকে বলা হয়েছে একটি “গুরুতর তত্ত্বাবধানের ঘাটতি”।

লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির মেটাবলিজম অ্যান্ড বডি কম্পোজিশন ল্যাবরেটরির পরিচালক এবং ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ড. স্টিভেন হেইমসফিল্ডও একমত। তাঁর কথায়, “স্থূলতা একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, একে সেভাবেই সামলানো উচিত। কোনো চিকিৎসক যদি এই ওষুধ লিখে দেন, তাঁর উচিত রক্ত পরীক্ষা করে রোগীর পুষ্টির মাত্রা যাচাই করা—অন্য রোগের ক্ষেত্রে যেমনটা করা হয়।”

ছোট প্লেট, বড় বিপদ

তাহলে প্রথমেই এই ঘাটতিগুলো তৈরি হয় কেন? এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে—এই ওষুধ আমাদের খাওয়ার ধরন কীভাবে বদলে দেয়, তার মধ্যে। GLP-1 ওষুধ শরীরের একটি স্বাভাবিক “পেট ভরা” হরমোনের নকল করে, ফলে অল্প খাবারেই তৃপ্তি আসে। ওজন কমানোর পেছনে এটিই মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এর মানে দাঁড়ায়, প্রতিদিন শরীরের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি গ্রহণের সুযোগও কমে যায়।

“এই ওষুধ ব্যবহার করা অনেকের খাদ্যাভ্যাস হয়তো গোড়া থেকেই খুব ভালো ছিল না,” বলছেন ইয়েও। তিনি লক্ষ করেন, এসব খাবারে প্রায়ই থাকে কম পরিমাণে তাজা ফল ও শাকসবজি, বৈচিত্র্যের অভাব, কিংবা প্রচুর অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, যাতে জরুরি পুষ্টি উপাদান কম।

“আপনি যদি শুধু ওষুধ খান অথচ আচরণে কোনো পরিবর্তন না আনেন, তাহলে আপনি একটি মাঝারি মানের খাদ্যই কম পরিমাণে খাচ্ছেন,” তিনি যোগ করেন। “খাদ্যাভ্যাস না বদলালে শেষমেশ আপনি পুষ্টির ঘাটতিতে পড়তে পারেন।”

এই কারণেই GLP-1 ব্যবহারকারীদের মধ্যে যে ঘাটতিগুলো দেখা যায়, সেগুলো প্রায়ই সাধারণ জনগোষ্ঠীতে চিকিৎসকদের নিয়মিত চোখে পড়া ঘাটতিরই প্রতিচ্ছবি—নিরামিষাশী ও ভেগানদের মধ্যে ভিটামিন B12 ও আয়োডিন, ঋতুস্রাবের কারণে নারীদের মধ্যে আয়রন, এবং কম রোদ পাওয়া অঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে ভিটামিন D। “এগুলো এমন ঘাটতি যা আমরা এমনিতেই মোটামুটি প্রায়ই দেখি,” বলেন ইয়েও। “GLP-1-এর কারণে সেগুলো কেবল আরও খারাপ হবে।”

কিন্তু এই ওষুধ শুধু খাবারের পরিমাণ কমিয়েই ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ায় না; এর অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এতে ভূমিকা রাখে। “GLP-1 দিয়ে চিকিৎসা করালে মানুষ যেমন কম খায়, তেমনি বমি বা ডায়রিয়ার মতো পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাও দেখা দেয়,” বলেন হেইমসফিল্ড। “ডায়রিয়া হলে সেই পথ দিয়েও আপনি পুষ্টি হারাবেন।”

অর্থাৎ, ওষুধ চলাকালে আপনি যেটুকু পুষ্টি গ্রহণ করছেন, তার কিছু অংশ শোষিত হওয়ার আগেই শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। আর এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো বিরল নয়—প্রায় এক-তৃতীয়াংশ GLP-1 ব্যবহারকারী ডায়রিয়ায় ভোগেন, আর প্রায় এক-চতুর্থাংশ বমি বমি ভাব ও বমির কথা জানান।

পাল্লা ভারী কোন দিকে

বিশেষজ্ঞদের কাছে সমস্যার ব্যাপ্তিটাই উদ্বেগের। এখন যেহেতু কোটি কোটি মানুষ GLP-1 ব্যবহার করছেন, জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশের শরীরে অজান্তেই পুষ্টির ফাঁক তৈরি হতে পারে।

“আমি মনে করি এটি ভবিষ্যতে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে,” বলেন হেইমসফিল্ড। “আমি মানুষকে বলে আসছি—GLP-1-কে পুরোপুরি নিরাপদ ধরে নিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন না। দীর্ঘমেয়াদে এই ঘাটতিগুলো কী প্রভাব ফেলে, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”

সবচেয়ে চরম অবস্থায় পুষ্টির ঘাটতি চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থায় রূপ নিতে পারে। যেমন, GLP-1 ওষুধ নেওয়ার পর কারও কারও ভিটামিন B-এর ঘাটতির কারণে গুরুতর স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিয়েছে—অস্পষ্ট কথাবার্তা, দিশেহারা ভাব, দুর্বলতাসহ নানা উপসর্গ যার বৈশিষ্ট্য। এমন ঘটনা অবশ্য বিরল।

তবে সাধারণ জনগোষ্ঠীতেও সবচেয়ে প্রচলিত ঘাটতি—অর্থাৎ ভিটামিন D-এর অভাব—ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে। হেইমসফিল্ড ব্যাখ্যা করেন, ভিটামিন D-এর নিম্ন মাত্রা হাড়ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস) ডেকে আনতে পারে এবং বার্ধক্যে দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়ায়। আপনি যদি একইসঙ্গে প্রোটিনও কম পান এবং ওজন কমানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পেশি হারান—যা স্যারকোপেনিয়া নামে পরিচিত—তাহলে এই বিপদ আরও বেড়ে যায়।

“এমন মানুষ আছেন যাঁদের বয়স ৭০, যাঁরা স্থূল, যাঁরা এই ওষুধ নিচ্ছেন—আর এটি তাঁদের স্যারকোপেনিয়া ও দুর্বলতার পথে ঠেলে দিচ্ছে,” বলেন হেইমসফিল্ড। এতে পরবর্তী জীবনে পড়ে যাওয়া আর হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

দুই খাদ্যের গল্প

ক্রমবর্ধমান এই সমস্যা ইয়েওর কাছে “সত্যিকারের দুশ্চিন্তার”। “এটা মনে রাখা একান্ত জরুরি যে, এই মুহূর্তে যাঁরা GLP-1 পাচ্ছেন তাঁদের সিংহভাগই সচ্ছল শ্রেণির মানুষ—ফলে তাঁদের খাদ্যাভ্যাস কতটা খারাপ হতে পারে, তার একটা সর্বনিম্ন সীমা আছে,” বলেন তিনি।

বাস্তবেও যুক্তরাজ্যে বেশিরভাগ GLP-1 ব্যবহারকারী এখন ওষুধটি কেনেন ব্যক্তিগতভাবে, আর যুক্তরাষ্ট্রে মাসিক খরচ প্রায়ই কয়েকশো ডলার। এই শ্রেণির মানুষ তুলনামূলকভাবে বিত্তবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং তাঁদের পক্ষে স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা সম্ভব।

কিন্তু সাম্প্রতিক উদ্ভাবন—যেমন GLP-1-এর নতুন বড়ি (পিল) সংস্করণ—ধীরে ধীরে ওষুধের দাম কমিয়ে আরও বেশি মানুষের নাগালে এনে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

“একসময় বিপুল সংখ্যক মানুষ, যাঁরা ততটা সচ্ছল নন—এবং সে কারণে যাঁদের খাদ্যাভ্যাস প্রায়ই, নিজেদের ইচ্ছায় নয় বরং বাধ্য হয়ে, অনেক বেশি দুর্বল—তাঁরাও এই ওষুধের নাগাল পাবেন। সেটিই, আমার মনে হয়, একটি গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করবে,” বলেন ইয়েও।

সাপ্লিমেন্ট নির্দিষ্ট কিছু অণুপুষ্টির ঘাটতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে; তবে ইয়েও স্পষ্ট করে বলেন, GLP-1 ব্যবহারকারীদের জন্য যথাযথ চিকিৎসা-তত্ত্বাবধানের কোনো বিকল্প সাপ্লিমেন্ট নয়।

“আমরা বাড়িয়ে বলে আতঙ্ক ছড়াতে চাই না, কারণ এই ওষুধ এখনো শক্তিশালী হাতিয়ার,” তিনি যোগ করেন। “কিন্তু যেসব অণুপুষ্টির ঘাটতি সচরাচর দেখা যায়, সেগুলোর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতেই হবে। মানুষ যখন কম খাবে, তখন এই ঘাটতিগুলো কেবল বাড়বে।”


তথ্যসূত্র: হ্যাটি উইলমথ, “Are weight-loss drugs making us malnourished?”, BBC Science Focus. গবেষণা-উপাত্ত: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক (৪,৬০,০০০ রোগী); মেক্সিকোভিত্তিক গবেষণা (৪,৮০,০০০ ব্যবহারকারী); International Journal of Obesity (২০২৫)।

Share
Written by
ড. মশিউর রহমান

ড. মশিউর রহমান বিজ্ঞানী.অর্গ এর cofounder যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সনে। পেশাগত জীবনে কাজ করেছেন প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হিসাবে আমেরিকা, জাপান, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ডিজিটাল হেল্থকেয়ারে যেখানে তার টিম তথ্যকে ব্যবহার করছেন বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার জন্য। বিস্তারিত এর জন্য দেখুন: DrMashiur.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ