গল্পে গল্পে বিজ্ঞানবায়োটেকনলজিস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

স্ট্রবেরির লাল রঙের আড়ালে

Share
Share

হুয়েলভা স্পেনের দক্ষিণ উপকূলের একটা ছোট শহর, যেখানে ইউরোপের সবচেয়ে বেশি স্ট্রবেরি জন্মায়। এই শহরের একদল গবেষক একদিন একটা সহজ প্রশ্ন নিয়ে মাঠে নামলেন — বাজারে যত স্ট্রবেরি দেখা যায়, সবগুলোই কি আসলে সমান উপকারী?

তাঁরা বেছে নিলেন ১০টা ভিন্ন জাতের স্ট্রবেরি গাছ — Antilla, Sabrina, Candonga, Liberty, Primoris-এর মতো নাম। সবগুলো গাছ লাগানো হলো একই মাটিতে, একই আবহাওয়ায়, একই পরিচর্যায়। যেন দশজন শিশুকে একই স্কুলে, একই শিক্ষকের কাছে পড়ানো হলো — তারপর দেখা হবে কে কেমন বেড়ে ওঠে।

মৌসুম শুরু হলো জানুয়ারিতে, শেষ হলো মে মাসে। গবেষকরা তিনটা আলাদা সময়ে ফল তুললেন — ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, মার্চের শেষে, আর এপ্রিলের শুরুতে। প্রতিবার তাঁরা ল্যাবে নিয়ে মাপলেন প্রতিটা ফলের ভেতরের ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা, আর সেই গাঢ় লাল রঙের পেছনে থাকা রাসায়নিক উপাদান।

ফলাফল দেখে তাঁরা নিজেরাই অবাক হলেন।

Liberty জাতের স্ট্রবেরিতে ভিটামিন সি পাওয়া গেল সবচেয়ে বেশি — Rabida জাতের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। Candonga হয়ে উঠল অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের চ্যাম্পিয়ন, যেখানে Primoris পিছিয়ে রইল সবচেয়ে কম পয়েন্ট নিয়ে। আর যখন রঙের প্রশ্ন এলো, Florida-Fortuna আর Sabrina বেরিয়ে এলো সবচেয়ে গাঢ় লাল রূপে — Antilla-র চেয়ে প্রায় অর্ধেক বেশি রঙিন উপাদান নিয়ে।

কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারটা এলো অন্য জায়গা থেকে। গবেষকরা খেয়াল করলেন, Antilla জাতের স্বাদ সবচেয়ে মিষ্টি, কম টক — অথচ পুষ্টিগুণে সে সবার পিছনে। যেন গল্পের সেই চরিত্র, যে দেখতে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কিন্তু ভেতরে সবচেয়ে কম শক্তি রাখে।

বোঝা গেল, স্বাদ আর স্বাস্থ্য – দুটো সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না।

আরও একটা প্যাটার্ন ধরা পড়ল সময়ের সাথে। ফেব্রুয়ারিতে তোলা প্রথম ফসলের ফলগুলোতে সবকিছুই ছিল কম, ভিটামিন সি কম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কম, রঙও কম গাঢ়। কিন্তু মার্চ আর এপ্রিলে, যখন বসন্তের রোদ আর তাপ বাড়ল, ফলগুলো যেন নিজেদের ভেতরে আরও শক্তি জমা করল। ঠিক যেন একটা শিশু বয়সের সাথে সাথে পরিণত হয়ে ওঠে — শুরুর দিকের চেয়ে পরের দিকের সংস্করণ আরও সমৃদ্ধ।

তবে প্রতিটা জাতের নিজস্ব গল্প ছিল। Liberty সারা মৌসুমে নিজের ভিটামিন সি একইরকম বজায় রাখল, যেন তার নিজের একটা অভ্যন্তরীণ নিয়ম আছে। আবার Sabrina-র অ্যাসিডের পরিমাণ পুরো মৌসুমে প্রায় অপরিবর্তিত থাকল, যখন বাকিরা বদলে গেল ঋতুর সাথে সাথে।

গবেষকরা আরেকটা সম্পর্ক খুঁজে পেলেন — যে ফল যত গাঢ় লাল, তার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতাও তত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। প্রকৃতি যেন তার নিজের ভাষায় ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে — রঙই বলে দেয় ভেতরের গল্প।

ফলনের দিক থেকে Sabrina আর Fontanilla সবার আগে থাকলেও, সবচেয়ে পুষ্টিকর জাত Candonga-র ফলন ছিল মাঝারি। যেন প্রকৃতি বলতে চাইল — বেশি পাওয়া আর ভালো পাওয়া, এই দুটো জিনিস একসাথে পাওয়া সহজ নয়।

হুয়েলভার এই ছোট মাঠ থেকে বেরিয়ে আসা গল্পটা আসলে আমাদের সবার জন্য একটা শিক্ষা — যা দেখতে একরকম, তা ভেতরে একরকম নাও হতে পারে। আর সেই ভেতরের সত্যিটা বুঝতে হলে, সময় আর প্রকৃতির ভাষা বোঝার মতো ধৈর্য লাগে।

এই পেপারের মূল বক্তব্য গল্পাকারে লিখা হয়েছেঃ
https://journals.sagepub.com/doi/10.3233/JBR-150090

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org