কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচিকিৎসা বিদ্যা

স্টেথোস্কোপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: ১৫ সেকেন্ডে হৃদরোগ শনাক্তের এক নতুন যুগ

Share
Share

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসকদের কানে ঝুলে থাকা স্টেথোস্কোপের রূপ খুব একটা বদলায়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই আইকনিক যন্ত্রটি ডাক্তারদের কাছে একদিকে প্রতীকী, অন্যদিকে অত্যাবশ্যক। তবে সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, আর এবার সেই স্টেথোস্কোপে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ছোঁয়া। চিকিৎসকরা এখন শুধু শব্দ শুনেই নয়, মাত্র ১৫ সেকেন্ডে হৃদরোগ শনাক্ত করতে পারছেন—এ যেন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকরা ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এই যুগান্তকারী যন্ত্র তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইকো হেলথ তৈরি করেছে ডিভাইসটি, যেখানে একসঙ্গে মিলেছে প্রথাগত স্টেথোস্কোপের শোনা এবং দ্রুত ইসিজি রেকর্ডের সুবিধা। ডিভাইসটি হৃদস্পন্দনের শব্দ ও বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে নিরাপদভাবে ক্লাউডে পাঠায়। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেগুলো বিশ্লেষণ করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দেখিয়ে দেয় ফলাফল।

যুক্তরাজ্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পরিচালিত অন্যতম বৃহৎ এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই এআই স্টেথোস্কোপ প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। প্রায় দেড় মিলিয়ন রোগী এবং ২০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্র জুড়ে এই পরীক্ষা চালানো হয়। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—চিকিৎসকেরা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্বিগুণ বেশি নির্ভুলভাবে হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার রোগ শনাক্ত করতে পেরেছেন। এছাড়া অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন শনাক্তের সম্ভাবনা বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি, আর হার্টের ভালভজনিত সমস্যাও প্রায় দ্বিগুণ বেশি নির্ভুলতায় ধরা পড়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক নিকোলাস পিটার্স একে বলেছেন “শতাব্দীর প্রথম” বড় ধরনের পরিবর্তন। তাঁর মতে, চিকিৎসার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি বড় হৃদরোগ একইসঙ্গে, একই যন্ত্রে, মাত্র কয়েক মিনিটে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘ পথচলায় এটি নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

তবে এই আশাবাদী ছবির পাশাপাশি কিছু সতর্কতাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এই ডিভাইস নিয়মিত পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এখনো মিথ্যা-ইতিবাচক বা ভুল শনাক্তকরণের হার রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, যেসব রোগীকে এই যন্ত্র হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে দেখিয়েছে, পরবর্তী পরীক্ষায় তাদের দুই-তৃতীয়াংশই সুস্থ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি যতটা উন্নতই হোক, এখনো তা ডাক্তারদের অভিজ্ঞ বিচারবোধ ও অন্যান্য পরীক্ষার বিকল্প হয়ে ওঠেনি।

তারপরও চিকিৎসকদের হাতে এই নতুন সরঞ্জাম পৌঁছানো মানে রোগ নির্ণয়ের গতি ও নির্ভুলতা বাড়ানো। বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা অনেক কার্যকর হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কমানো যায়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর তাৎপর্য আরও বড় হতে পারে। যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা সীমিত, সেখানে একটি এআই-সক্ষম স্টেথোস্কোপ প্রাথমিক পর্যায়ের ডাক্তারদের জন্য হয়ে উঠতে পারে জীবনরক্ষাকারী হাতিয়ার।

স্টেথোস্কোপ চিকিৎসার প্রতীক, ডাক্তারদের পরিচয়ের অঙ্গ। আজ সেই প্রতীকী যন্ত্রে যোগ হলো নতুন বুদ্ধিমত্তা, নতুন সম্ভাবনা। যদিও এখনো ভুলের ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবুও এটি চিকিৎসার এক নতুন যাত্রার সূচনা। যেমন একসময় প্রথম স্টেথোস্কোপ ডাক্তারদের কানকে প্রশিক্ষিত করেছিল, তেমনি এআই-স্টেথোস্কোপ এখন ডাক্তারদের চোখ খুলে দিচ্ছে অদেখা সংকেতের প্রতি। প্রযুক্তির এই বিবর্তন চিকিৎসাশাস্ত্রকে এগিয়ে নেবে, আমাদের আয়ু বাড়াবে, আর হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থে হৃদরোগকে আগেভাগেই থামিয়ে দিতে পারবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org