সকালের নাস্তায় চা আর পাউরুটি বাংলাদেশের লাখো মানুষের প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্য। স্কুলগামী শিশু, হাসপাতালে রোগীর স্বজন, অফিসমুখী মানুষ কিংবা রাত জাগা শিক্ষার্থী সবার কাছেই পাউরুটি এক সহজলভ্য খাবার। নরম, হালকা আর সহজে খাওয়া যায় বলেই এই খাবারটি বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যখন প্রতিদিন নিশ্চিন্তে পাউরুটির টুকরো মুখে দিচ্ছি, তখন খুব কম মানুষই ভাবছি সেই নরম স্তরের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে এমন এক রাসায়নিক, যা ধীরে ধীরে মানবদেহের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম।
সম্প্রতি বিভিন্ন পরীক্ষায় পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেট (Potassium Bromate) বা ব্রোমাইডজাতীয় ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু খাদ্য ভেজালের একটি সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিতও হতে পারে। কারণ এই রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যানসার, ডিএনএ ক্ষতি এবং কোষীয় অস্বাভাবিকতার সম্পর্ক নিয়ে বহু আন্তর্জাতিক গবেষণা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
পটাশিয়াম ব্রোমেট মূলত এক ধরনের oxidizing chemical, যা বহু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেকারি শিল্পে dough improver হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এটি ময়দাকে দ্রুত ফুলতে সাহায্য করে, পাউরুটিকে আরও নরম ও আকর্ষণীয় করে তোলে এবং উৎপাদনের সময় কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ শিল্পকারখানার দৃষ্টিতে এটি লাভজনক। কিন্তু মানুষের শরীরের দৃষ্টিতে সেটি কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং International Agency for Research on Cancer (IARC) পটাশিয়াম ব্রোমেটকে “possible human carcinogen” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রাণীর উপর চালানো একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি কিডনি, থাইরয়েড এবং খাদ্যনালির ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। Food and Chemical Toxicology এবং Cancer Science Journal–এ প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় এর genotoxic effect বা জিনগত ক্ষতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই রাসায়নিক শরীরে oxidative stress তৈরি করতে পারে। এর ফলে ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি হয়, যা কোষের ডিএনএতে আঘাত করে। প্রথমে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তারপর ধীরে ধীরে mutation তৈরি হতে থাকে। একসময় সেই অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন থেকেই টিউমার বা ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ক্ষতি হঠাৎ করে চোখে পড়ে না। এটি ধীরে ধীরে ঘটে। একজন মানুষ হয়তো বছরের পর বছর অল্প পরিমাণে এমন রাসায়নিক গ্রহণ করছেন, কিন্তু শরীরের ভেতরে তখন নীরবে পরিবর্তন চলতে থাকে। তারপর একদিন হঠাৎ ধরা পড়ে কিডনির জটিলতা, খাদ্যনালির সমস্যা কিংবা ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগ। এই ধীর বিষক্রিয়াই পটাশিয়াম ব্রোমেটকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই ঝুঁকি উপলব্ধি করে খাদ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, নাইজেরিয়াসহ বহু দেশ বহু আগেই এই রাসায়নিককে খাদ্যশিল্প থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এমনকি ভারতও ২০১৬ সালে Food Safety and Standards Authority (FSSAI)-এর মাধ্যমে পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারণ পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, জনপ্রিয় অনেক ব্র্যান্ডের পাউরুটিতেও এই রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে। তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পৃথিবীর এত দেশ যখন এটি নিষিদ্ধ করেছে, তখন বাংলাদেশের বাজারে কীভাবে এখনও এই রাসায়নিক ঢুকে পড়ছে?
বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা জটিল। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। একসময় ফলের মধ্যে ফরমালিন, কাঁচা ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড কিংবা খাবারে টেক্সটাইল ডাই নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে বেকারি কেমিক্যাল। দেশের অনেক ছোট ও মাঝারি বেকারিতে এখনও আধুনিক food safety standard পুরোপুরি মানা হয় না। অনেক জায়গায় প্রশিক্ষিত ফুড কেমিস্ট নেই, কাঁচামাল পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, এমনকি কোন রাসায়নিক কতটুকু ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও অনেক সময় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। কম খরচে বেশি লাভের প্রতিযোগিতায় কিছু প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ব্যবহারের পথ বেছে নেয়। আর এর ফল ভোগ করে সাধারণ মানুষ।
এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে শিশুরা। বাংলাদেশে স্কুলগামী শিশুদের টিফিনে পাউরুটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু শিশুদের শরীর এখনও বিকাশমান হওয়ায় toxic chemical-এর প্রভাব তাদের উপর তুলনামূলক বেশি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমন রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে পারে এবং ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ যদি শিশু হয়, তাহলে খাদ্যে বিষ মেশানো মানে সেই ভবিষ্যৎকেই ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া।
এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানী, গবেষক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সংবাদ প্রকাশ বা অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা। বাংলাদেশে পটাশিয়াম ব্রোমেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে বড় আকারের epidemiological study পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে, যার মাধ্যমে কম খরচে দ্রুত খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিজ্ঞানকে শুধু গবেষণাগারে আটকে রাখলে হবে না। মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে কোন খাবারে ঝুঁকি বেশি, কীভাবে নিরাপদ খাবার চেনা যায় এবং কোন উপাদান শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কারণ সচেতনতা ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।
সরকারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, নিয়মিত ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক করা, ছোট বেকারিগুলোর লাইসেন্সিং কঠোর করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা আইন বাস্তবভাবে প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ খাদ্যের নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
একটি জাতির সভ্যতা শুধু তার প্রযুক্তি বা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করা যায় সেই জাতি তার মানুষকে কতটা নিরাপদ খাবার দিতে পারছে, তার মাধ্যমে। পাউরুটির মতো সাধারণ একটি খাবারের ভেতরে যদি নীরবে ক্যানসারের ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক ব্যর্থতাও।
বিজ্ঞান আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়। বিজ্ঞান আমাদের সতর্ক করার জন্য। আর সেই সতর্কবার্তা যদি আমরা আজও না শুনি, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম একদিন আমাদেরকেই প্রশ্ন করবে, “তোমরা কি জানতেই না, নাকি জেনেও চুপ ছিলে?”
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment