কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তি

মানুষকে ছাড়িয়ে এআই: স্ট্যাক ওভারফ্লোরের করুণ পরিণতি

Share
Share

একটা সময় ছিল, কোড নিয়ে সমস্যায় পড়লে ডেভেলপারদের প্রথম আশ্রয় ছিল স্ট্যাক ওভারফ্লো। রাত দুইটার সময় ল্যাপটপের সামনে বসে থেকে অসংখ্য মানুষ লিখেছে—“NullPointerException in Java, কীভাবে সমাধান করব?” কিংবা “Python list comprehension কেন কাজ করছে না?”। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেউ না কেউ উত্তর দিত। কখনও রূঢ় ভঙ্গিতে, কখনও সহানুভূতিশীলভাবে। কিন্তু উত্তর আসতই। এইভাবেই গড়ে উঠেছিল এক বিশাল ডিজিটাল পাঠশালা, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রশ্ন–উত্তরের ভেতর দিয়ে তৈরি হচ্ছিল ডেভেলপার জ্ঞানের এক সমষ্টিগত ভাণ্ডার।

২০১4 থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় স্ট্যাক ওভারফ্লোর সোনালী যুগ। মাসে দুই লাখ প্রশ্ন আসত। এই প্ল্যাটফর্ম শুধু কোডের সমস্যা মেটাত না, বরং এক ধরনের পেশাগত পরিচয়ও দিত। একজন ভালো উত্তরদাতা দ্রুত পরিচিতি পেত, প্রোফাইলের ব্যাজগুলো হয়ে উঠত গর্বের প্রতীক।

কিন্তু সময় বদলেছে। ছবিটা বদলাতে শুরু করে ধীরে ধীরে। কোভিড–১৯ এর সময়ে প্রশ্নের সংখ্যা কমে যায়, কারণ বিশ্বজুড়ে প্রোজেক্ট বন্ধ হচ্ছিল, নতুন শেখার চাপে গতি থেমে যাচ্ছিল। আর ২০২২ সালের শেষ দিকে যখন ওপেনএআই প্রকাশ করল চ্যাটজিপিটি, তখন স্ট্যাক ওভারফ্লোরের কফিনে শেষ পেরেকটা গেঁথে গেল।

আজকে মাসে গড়ে মাত্র ২৫ হাজার প্রশ্ন আসে স্ট্যাক ওভারফ্লোতে—যা এক সময়ের তুলনায় প্রায় এক–অষ্টমাংশ। কারণটা সহজ: মানুষ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে চায় না। যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডে উত্তর দিয়ে দিতে পারে, তখন কেন মানুষের ওপর নির্ভর করবে?

ঢাকার এক তরুণ প্রোগ্রামার ইফতেখার হোসেন আমাকে বলছিলেন, “আগে কোড নিয়ে আটকে গেলে স্ট্যাক ওভারফ্লো খুলতাম। কিন্তু এখন প্রায় সবকিছু চ্যাটজিপিটি দিয়ে মেটাই। উত্তর অনেক দ্রুত পাই, আর কেউ নিচু চোখে তাকায় না বলে স্বস্তিও বেশি।”

আসলে এখানেই বিদ্রূপটা সবচেয়ে প্রবল। যে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি হয়েছিল জ্ঞানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে, সেই জ্ঞানভাণ্ডারই এখন এআই মডেলগুলোকে খাওয়াচ্ছে। আর এআই–এর তৈরি উত্তরই হয়ে উঠেছে স্ট্যাক ওভারফ্লোরের বিকল্প। স্ট্যাক ওভারফ্লো কমিউনিটি তাদের প্রশ্ন–উত্তরের মাধ্যমে মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। এখন সেই কমিউনিটিই প্রায় অচল হয়ে গেছে।

প্রযুক্তি লেখক টিম ও’রেইলি একবার বলেছিলেন, “প্রত্যেক কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম একদিন তার নিজের সাফল্যের শিকার হয়।” হয়তো স্ট্যাক ওভারফ্লোরও সেই নিয়মেই হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ মানুষ চায় গতি, সরলতা আর তাত্ক্ষণিক সমাধান।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—এরপর কে? ডেভেলপার ব্লগ, ইউটিউব টিউটোরিয়াল, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক? উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। ইতিহাস বলে, প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত নতুন মাধ্যমের জন্ম দেয় এবং পুরোনোকে গ্রাস করে। লাইব্রেরির বুকশেলফ যেমন গুগল সার্চের কাছে হার মানলো, তেমনি স্ট্যাক ওভারফ্লো এআই–এর কাছে পরাজিত।

শেষ পর্যন্ত, এটা শুধু এক প্ল্যাটফর্মের মৃত্যু নয়; এটা মানুষের তৈরি জ্ঞানভাণ্ডার থেকে যন্ত্র–চালিত জ্ঞানভাণ্ডারে উত্তরণের গল্প। আর আমাদের সবারই মনে প্রশ্ন জাগছে—আজ স্ট্যাক ওভারফ্লো মরল, কাল কে মরবে?

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org