গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: রজার পেনরোজের ‘দ্য এম্পেরর’স নিউ মাইন্ড’ ও চেতনার বৈজ্ঞানিক বিতর্ক

Share
Share

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে উঠছে—মানুষের মন কি শেষ পর্যন্ত একটি জটিল গণনাযন্ত্রমাত্র? নাকি মানবচেতনার ভেতরে এমন কিছু আছে, যা কেবল অ্যালগরিদম দিয়ে ধরা যায় না? এই গভীর প্রশ্নকে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকভাবে সামনে নিয়ে আসেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রজার পেনরোজ তাঁর বহুল আলোচিত বই ‘দ্য এম্পেরর’স নিউ মাইন্ড’ (The Emperor’s New Mind)-এ। বইটি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে মানুষের চিন্তার প্রকৃতি নিয়ে এক সাহসী বিতর্ক উসকে দেয়।

পেনরোজের মূল যুক্তি হলো—মানুষের চিন্তাশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে অ্যালগরিদমিক বা গণনামূলক প্রক্রিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি কুর্ট গ্যোডেলের অসম্পূর্ণতা তত্ত্বের (Gödel’s incompleteness theorem) আলোকে যুক্তি দেন, যে কোনো আনুষ্ঠানিক গণনাপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে, অথচ মানবমন অনেক সময় সেই সীমার বাইরে গিয়ে সত্য উপলব্ধি করতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (strong AI) দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেন—যে দাবিতে বলা হয়, যথেষ্ট জটিল প্রোগ্রাম তৈরি করতে পারলে মানবমনের সমতুল্য চেতনা সৃষ্টি সম্ভব।

এই বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চেতনার ভৌত ভিত্তি নিয়ে পেনরোজের অনুসন্ধান। তিনি প্রস্তাব করেন, মানবমনের কিছু প্রক্রিয়া হয়তো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের গভীর স্তরের সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তীতে স্টুয়ার্ট হ্যামরফের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি “Orch-OR” (Orchestrated Objective Reduction) মডেল প্রস্তাব করেন, যেখানে মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতরের মাইক্রোটিউবিউলে কোয়ান্টাম প্রভাব চেতনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়। যদিও এই তত্ত্বটি এখনো ব্যাপক বিতর্কিত এবং পরীক্ষামূলক প্রমাণের অভাবে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, তবু এটি চেতনা গবেষণায় নতুন প্রশ্ন ও গবেষণার দিক খুলে দিয়েছে।

‘দ্য এম্পেরর’স নিউ মাইন্ড’ বইটি কেবল চেতনা নয়; বরং আধুনিক বিজ্ঞানের বড় বড় তত্ত্ব—কোয়ান্টাম মেকানিক্স, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, কসমোলজি—এসবের একটি বিস্তৃত ও জনপ্রিয় ব্যাখ্যাও দেয়। পেনরোজ দেখান, প্রকৃতির গভীর নিয়ম বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান তাত্ত্বিক কাঠামো এখনো অসম্পূর্ণ। এই অসম্পূর্ণতার মাঝেই তিনি মানবমনের বিশেষত্বের সম্ভাবনা খুঁজে পান। বইটির শিরোনামেই একটি রূপক আছে—অ্যান্ডারসেনের “এম্পেরর’স নিউ ক্লথস”-এর মতোই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের অনেক দাবি হয়তো বাহ্যিকভাবে চমকপ্রদ, কিন্তু গভীরে গিয়ে দেখলে তাতে মৌলিক ব্যাখ্যার ঘাটতি রয়ে গেছে।

আজকের দিনে এআই সিস্টেমগুলো ভাষা বোঝা, ছবি তৈরি বা জটিল সিদ্ধান্তে সহায়তা করার মতো কাজে অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে। তবু পেনরোজের বই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দক্ষ অনুকরণ আর প্রকৃত চেতনা এক জিনিস নয়। মানুষের মন, সৃজনশীলতা ও গাণিতিক অন্তর্দৃষ্টির প্রকৃতি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তিনি তুলেছিলেন, সেগুলো আজও খোলা রয়েছে। ‘দ্য এম্পেরর’স নিউ মাইন্ড’ তাই কেবল একটি বই নয়; বরং মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার সীমারেখা নিয়ে চলমান এক গভীর বৌদ্ধিক বিতর্কের সূচনা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org