জীবনের প্রশ্নে পদার্থবিজ্ঞানের চোখ: শ্রোয়েডিংগারের ‘হোয়াট ইজ লাইফ?’ ও আণবিক জীববিজ্ঞানের সূচনা
জীবন আসলে কী—শুধু জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর সংগঠিত নীতি? এই মৌলিক প্রশ্নটি বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নতুনভাবে উত্থাপন করেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম পথিকৃৎ পদার্থবিদ এরউইন শ্রোয়েডিংগার। তাঁর ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ক্ষুদ্র কিন্তু প্রভাবশালী বই ‘হোয়াট ইজ লাইফ?’ (What Is Life?) পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের মধ্যে এক নতুন বৌদ্ধিক সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের আণবিক জীববিজ্ঞানীদের জন্য এক গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
শ্রোয়েডিংগার এই বইয়ে জীবজগতকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রশ্ন তোলেন—জীবন্ত সত্তা কীভাবে তাপগতিবিদ্যার নিয়ম মেনে চলেও দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠিত ও সুশৃঙ্খল অবস্থায় টিকে থাকে? তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা বা এন্ট্রপি বাড়তে থাকে। অথচ জীবিত কোষের ভেতরে দেখা যায় চমৎকার শৃঙ্খলা ও স্থিতি। এই আপাতবিরোধ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রোয়েডিংগার প্রস্তাব করেন, জীবন্ত সত্তা পরিবেশ থেকে “নেগেটিভ এন্ট্রপি” বা নেগএন্ট্রপি গ্রহণ করে নিজের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখে। যদিও আজকের জীববিজ্ঞানে এই ধারণাটি আরও সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবু তাপগতিবিদ্যার আলোকে জীবনের ব্যাখ্যা দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ছিল যুগান্তকারী।
বইটির সবচেয়ে দূরদর্শী অংশ হলো বংশগত তথ্যের ভৌত ভিত্তি নিয়ে শ্রোয়েডিংগারের আলোচনা। তিনি অনুমান করেন, জীবের জিনগত তথ্য কোনো ধরনের “অপরিবর্তনশীল অণুগত কাঠামোতে” সংরক্ষিত থাকে—যাকে তিনি আখ্যা দেন “অ্যাপিরিয়ডিক ক্রিস্টাল”। সে সময় ডিএনএ-র গঠন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলেও, এই ধারণাই পরবর্তী সময়ে জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক ও অন্যান্য গবেষকদের ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স কাঠামো আবিষ্কারে অনুপ্রেরণা জোগায়। অনেক আণবিক জীববিজ্ঞানী তাঁদের কাজের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে ‘হোয়াট ইজ লাইফ?’ বইটির কথা উল্লেখ করেছেন।
‘হোয়াট ইজ লাইফ?’ কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্যের বই নয়; এটি এক ধরনের দার্শনিক অনুসন্ধান। শ্রোয়েডিংগার জীবনের ভৌত ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্ববোধ, চেতনা ও প্রকৃতির নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যদিও বইটির কিছু ধারণা আজকের আধুনিক জীববিজ্ঞানের আলোকে আংশিক বা সম্পূর্ণ সংশোধিত হয়েছে, তবু প্রশ্ন তোলার যে সাহসী ভঙ্গি ও আন্তঃবিষয়ক চিন্তা এখানে দেখা যায়, সেটিই বইটির আসল শক্তি।
আজকের দিনে জিনোমিক্স, সিস্টেমস বায়োলজি বা কৃত্রিম জীবনের গবেষণা আমাদের জীবনের অণুগত রহস্য আরও গভীরভাবে উন্মোচন করছে। তবু ‘হোয়াট ইজ লাইফ?’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন বোঝার পথে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের সীমারেখা আসলে কৃত্রিম। শ্রোয়েডিংগারের এই বই দেখিয়েছে, বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি প্রায়ই জন্ম নেয় ভিন্ন ভিন্ন শাস্ত্রের মাঝখানের সীমানা ভেঙে নতুন প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে।

Leave a comment