ড. আলিমুর রেজার এই বক্তব্যটি কেবল একটি ব্যক্তিগত মত নয়; এটি আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির একটি গভীর সমস্যাকে খুব পরিষ্কার করে সামনে আনে। অনেক সময় আমরা শিক্ষাকে লক্ষ্য না ভেবে, শিক্ষাকে প্রমাণপত্রে রূপান্তর করি—যেন ডিগ্রি পেলেই জ্ঞান এসে যাবে, সার্টিফিকেট পেলেই দক্ষতা তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু একজন গবেষক-শিক্ষক হিসেবে ড. আলিমুর রেজা জানেন, বাস্তবতা উল্টো: শেখা না হলে ডিগ্রি কেবল কাগজ, আর আগ্রহ না থাকলে উচ্চশিক্ষা কখনোই উচ্চতর ফল বয়ে আনে না।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে—বিশেষ করে অনেক প্রতিষ্ঠানে গবেষণার সংস্কৃতি কম, শেখার চেয়ে শুধু সনদের দিকে ঝোঁক বেশি—তখন এই বিষয়টি একেবারে ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য’ প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? কেবল চাকরি পাওয়া? সমাজে পরিচয় তৈরি করা? না কি সত্যি সত্যি জ্ঞান, চিন্তা ও দক্ষতা অর্জন? ড. আলিমুর রেজা যে কথাটি বলেন, তার কেন্দ্রে আছে এই বিশ্বাস: উচ্চশিক্ষা মানে কেবল ক্লাস করা নয়, এটি মানে প্রশ্ন করতে শেখা, সমস্যা ধরতে শেখা, এবং একটি বিষয়কে গভীরভাবে বুঝে তার ভেতরে নতুন কিছু যোগ করার চেষ্টা করা।
তিনি বিদেশের প্রসঙ্গও টানেন, কিন্তু খুব ভিন্ন দৃষ্টিতে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, বিদেশে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ড. আলিমুর রেজার সতর্কতা হলো—যদি ভেতরে সত্যি শেখার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে বিদেশে গেলেও সমস্যা থাকবে, বরং সময় ও সুযোগ নষ্ট হবে। কারণ গবেষণার কাজ দলগত। আপনি যদি কোনো গবেষণা দলে থাকেন, আপনার অনীহা শুধু আপনাকে নয়, আপনার সহপাঠী ও টিমমেটদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। উচ্চশিক্ষা মানে কেবল নিজের উন্নতি নয়; এটি অনেকটা সমবেত নির্মাণ—যেখানে প্রত্যেকে নিজের অংশটুকু আন্তরিকভাবে না করলে পুরো কাজ থেমে যায়।
এই বক্তব্যের ভেতরে শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি বড় শিক্ষা আছে। প্রথম শিক্ষা হলো উদ্দেশ্য ঠিক করা। আপনি কেন পড়ছেন? কেন একটি বিষয়ে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে চাইছেন? কারণ আপনি নতুন কিছু শিখতে চান, নাকি কেবল ডিগ্রি দিয়ে নিজেকে “বড়” দেখাতে চান? উদ্দেশ্য যদি হয় শেখা, তাহলে পথ কঠিন হলেও আপনি টিকে থাকবেন। উদ্দেশ্য যদি হয় শুধু সনদ, তাহলে কঠিন সময়ে আগ্রহ ফুরিয়ে যাবে। দ্বিতীয় শিক্ষা হলো শেখাকে দৃশ্যমান দক্ষতায় রূপান্তর করা। ড. আলিমুর রেজা বারবার তত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োগের কথা বলেছেন—ডেটাসেটে কাজ করা, প্র্যাকটিস করা, টুল ব্যবহার করা, সমস্যা সমাধান করা। এই একই নীতি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সত্য। আপনি যত ভালোভাবে প্র্যাকটিক্যাল কাজ করবেন, তত আপনার শেখা বাস্তব হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কথাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় পরীক্ষার নম্বর ও সার্টিফিকেটই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত ফল চায়, কিন্তু গভীর অনুশীলনের সময় দেয় না। অথচ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা গবেষণার পথে সফল হতে গেলে ধৈর্য লাগে। একটি গবেষণা প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। একটি প্রকল্প বারবার ব্যর্থ হতে পারে। একটি ধারণা কাজ নাও করতে পারে। এই ধৈর্য, এই লেগে থাকার মনোভাবই উচ্চশিক্ষাকে অর্থবহ করে। ড. আলিমুর রেজার কথায়, উচ্চশিক্ষা যদি সত্যিই নিতে হয়, তা নিতে হবে শেখার আগ্রহ নিয়ে—সনদের মোহ নিয়ে নয়।
এই বক্তব্য আমাদের শিক্ষা নীতির জন্যও একটি ইঙ্গিত দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেই গবেষণা বাড়ে না; গবেষণা বাড়ে সংস্কৃতি, পরামর্শ, সুযোগ, এবং মূল্যায়নের কাঠামো দিয়ে। শুধু ডিগ্রি বিক্রির মতো শিক্ষা হলে সমাজে দক্ষতা তৈরি হয় না; তৈরি হয় হতাশা। তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান—সবার জন্যই এই কথাটি এক ধরনের সতর্কবার্তা: উচ্চশিক্ষাকে সম্মান করতে হলে তাকে অর্থপূর্ণ করতে হবে।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment