গবেষণাগারের ভেতরে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের অণুজগৎ নিয়ে কাজ করা একজন বিজ্ঞানী হঠাৎ করে নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক বৈশ্বিক সংকটের মাঝখানে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন চারদিকে অনিশ্চয়তা, তখন তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা বাস্তব জীবনের একটি জরুরি সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে গেল। biggani.org–এ দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ড. মোহাম্মদ সাগর হোসেন নিজের গবেষণার পথচলা, সংকটের সময়ে বিজ্ঞানের ভূমিকা, এবং তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার কথা খুলে বলেন। এই কথোপকথনের ভেতর দিয়ে উঠে আসে এক বিজ্ঞানীর গবেষণাগারের বাইরের গল্প—যেখানে উপাদান বিজ্ঞান কেবল ল্যাবের বিষয় নয়, বরং সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত।
ড. সাগর হোসেনের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্লাস্টিক বা পলিমার উপকরণের ভেতরের গঠন এবং সেই গঠনের ওপর নির্ভর করে উপাদানের গুণাগুণ কীভাবে বদলে যায়। তিনি দেখান, 3D প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করলে শুধু বাইরে থেকে নতুন কোনো পণ্য তৈরি হয় না, ভেতরের অণুস্তরেও পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন উপাদানের শক্তি ও স্থায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়ার পথে পুনঃব্যবহার যথেষ্ট নয়; পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের বিজ্ঞান বুঝে তবেই টেকসই উপকরণ তৈরি সম্ভব।
সাক্ষাৎকারে তিনি উপাদান বিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন। একই প্লাস্টিক কখনো স্বচ্ছ, কখনো ঘোলা—এর কারণ উপাদানটি কীভাবে প্রসেস করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে। গলানোর পর দ্রুত বা ধীরে ঠান্ডা করার মতো ছোট পরিবর্তনও ভেতরের গঠন বদলে দিতে পারে, আর সেই গঠন বদলালেই বাহ্যিক গুণাগুণ বদলে যায়। এই উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝান, উপাদান বিজ্ঞানের গভীরে ঢুকলে দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বস্তুগুলোকেও নতুন চোখে দেখা যায়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ড. সাগর হোসেনের গবেষণা সরাসরি বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সার্জিক্যাল মাস্কের ঘাটতির সময়ে ব্যবহৃত মাস্ক কীভাবে নিরাপদভাবে জীবাণুমুক্ত করে পুনঃব্যবহার করা যায়—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি গবেষণা উদ্যোগে তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, গবেষণাগারের ফল দ্রুত হাসপাতালের কাজে লাগানো হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছে, সংকটের মুহূর্তে বিজ্ঞানীর কাজ শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না; গবেষণার ফল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক নিয়ে আলোচনায় তিনি আরেকটি বাস্তবতার কথা বলেন। এমন উপকরণ তৈরি করা সম্ভব হলেও, বাস্তব ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, নমনীয়তা ও নিরাপত্তা একসঙ্গে ধরে রাখা সহজ নয়। একাধিক বৈশিষ্ট্য যোগ করতে গিয়ে অনেক সময় উপকরণের প্রাকৃতিকভাবে ভেঙে যাওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, পরিবেশবান্ধব উপকরণ তৈরির পথটি বৈজ্ঞানিকভাবে জটিল এবং এতে দ্রুত কোনো সহজ সমাধান নেই।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পখাত প্রসঙ্গে ড. সাগর হোসেন উপাদান বিজ্ঞানের অবস্থান নিয়েও কথা বলেন। তাঁর মতে, দেশে এই বিষয়টি এখনো তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এবং শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহও কম। এই বাস্তবতা তাঁকে ভাবায়—উপাদান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা যতদিন না শিল্পখাত উপলব্ধি করবে, ততদিন এই বিষয়ের গুরুত্বও বাড়বে না।
নিজের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বহুমুখী শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলেন। অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে গবেষণাগারের ভাষা ও শিল্পক্ষেত্রের ভাষা—দুটোই বুঝতে সাহায্য করেছে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের গবেষণা ক্রমেই বিভিন্ন বিষয়ের সংযোগস্থলে গড়ে উঠবে। তাই তরুণদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু পরস্পর-সংযুক্ত বিষয়ে শেখার সুযোগ কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ডে গবেষণা করার অভিজ্ঞতা তুলনা করে তিনি দেখান, গবেষণার সংস্কৃতি কীভাবে কাজের ধরন নির্ধারণ করে। একদিকে শিল্পখাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ফলে গবেষণার গতি বাড়ে, অন্যদিকে গবেষকের স্বাধীন চিন্তার সুযোগ বাড়লে নতুন প্রশ্ন তৈরির পরিসরও বিস্তৃত হয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, গবেষণায় শিল্পের চাহিদা ও গবেষকের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
তরুণদের উদ্দেশে ড. সাগর হোসেন গবেষণাকে কোনো হঠাৎ পাওয়া সাফল্য হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির পথ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। প্রতিদিন অল্প অল্প করে দক্ষতা তৈরি করা, পড়াশোনার বাইরেও নিয়মিত শেখা, এবং শুরু থেকেই গবেষণার পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা তিনি জোর দিয়ে বলেন। তাঁর কথায়, গবেষক হওয়ার পথ এক দিনে তৈরি হয় না; ধীরে ধীরে নিজের ভিত শক্ত করতে হয়।
সাক্ষাৎকারের আরেকটি অংশে তিনি থিসিস বা গবেষণার বিষয় নির্ধারণ নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার কথা বলেন। লটারির মাধ্যমে বিষয় বণ্টনের মতো পদ্ধতি অনেক সময় শিক্ষার্থীর আগ্রহের সঙ্গে গবেষণার বিষয়কে মিলিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও সুপারভাইজারের অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয় না হলে গবেষণা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
biggani.org–এ দেওয়া এই দীর্ঘ আলাপচারিতায় ড. মোহাম্মদ সাগর হোসেনের কথাগুলো মিলিয়ে একটি বড় ছবি তৈরি হয়। গবেষণা তাঁর কাছে শুধু পরীক্ষাগারের কাজ নয়; এটি সমাজের সংকটের সঙ্গে যুক্ত, পরিবেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত, এবং তরুণদের জীবনের পথচলার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর গল্প আমাদের দেখায়, বিজ্ঞানীর কাজের ভেতরে যেমন আছে অণুজগতের অনুসন্ধান, তেমনি আছে মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার সাহস।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. মোহাম্মদ সাগর হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment