বিজ্ঞানের ইতিহাসে বড় অগ্রগতির সূচনা প্রায়ই ঘটে এমন এক মুহূর্তে, যখন কেউ প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস দেখায়। অনেক সময় গবেষণাগারে কিছু বিষয় “ধরে নেওয়া সত্য” হিসেবে চালু থাকে—যেগুলো কেউ নতুন করে যাচাই করে না। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত এই উপলব্ধিকে স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেন, “সবাই ধরেই নিয়েছিল এটা করা যায় না—আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কেন পারবে না?” এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল ট্রিপটোফ্যান সিনথেস নামের একটি এনজাইম। বায়োকেমিস্ট্রির পাঠ্যবইয়ে এই এনজাইমকে এমন একটি প্রোটিন হিসেবে বর্ণনা করা হতো, যা ট্রিপটোফ্যান নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে, কিন্তু সেটিকে ভাঙতে পারে না। একই পরিবারের আরেকটি এনজাইম—ট্রিপটোফ্যানেজ—দুটো কাজই করতে পারে। তবু গবেষণাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ধরে নেওয়া হয়েছিল, ট্রিপটোফ্যান সিনথেসের পক্ষে “ভাঙার কাজ” সম্ভব নয়। এই ধারণা এতটাই প্রতিষ্ঠিত ছিল যে কেউ সেটিকে প্রশ্ন করার প্রয়োজনই বোধ করেননি।
ড. আশরাফউদ্দিন এই জায়গাতেই থেমে থাকেননি। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—একই ধরনের এনজাইম পরিবারভুক্ত দুটি প্রোটিনের মধ্যে এমন মৌলিক পার্থক্য কেন থাকবে? প্রকৃতিতে কি সত্যিই কোনো এনজাইমকে কেবল একটি কাজেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়? এই প্রশ্ন থেকেই তিনি পরীক্ষার নকশা বদলাতে শুরু করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, আগের গবেষণাগুলোতে রিঅ্যাকশনের শর্ত—যেমন তাপমাত্রা, দ্রবণের অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব (pH), নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিবেশ—সব সময় একই রকম রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতিতে পরিবেশ বদলালে প্রোটিনের আচরণও বদলাতে পারে।
তিনি পরীক্ষার পরিবেশ বদলে দেখান—নির্দিষ্ট শর্তে ট্রিপটোফ্যান সিনথেসও ট্রিপটোফ্যান ভাঙতে সক্ষম। অর্থাৎ যে বিষয়টিকে সবাই অসম্ভব বলে ধরে নিয়েছিল, সেটি আসলে অসম্ভব নয়—বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্ভব। এই ফলাফল গবেষণাক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এতে বোঝা যায়, প্রোটিনের কার্যক্ষমতা অনেক সময় পরিবেশ-নির্ভর; কেবল পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞার মধ্যে তাকে বেঁধে রাখা যায় না।
এই অভিজ্ঞতা তরুণ গবেষকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা দেয়। গবেষণাগারে অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত ধারণা প্রশ্ন না করেই অনুসরণ করা হয়—কারণ সেগুলো বহুদিন ধরে পাঠ্যবইয়ে লেখা, বড় বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জার্নালে ছাপা হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান নিজেই তো প্রশ্ন করার পদ্ধতি। কোনো ধারণা বহুদিন ধরে চালু থাকলেই যে সেটি চূড়ান্ত সত্য হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং নতুন প্রশ্নই পুরোনো জ্ঞানকে আরও গভীর করে তোলে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি সামাজিক দিকও রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সময় শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়—“বইয়ে যা লেখা আছে, সেটাই ঠিক।” প্রশ্ন করা বা সন্দেহ প্রকাশ করাকে অনেক ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে কৌতূহল ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রশ্ন করার সাহসই গবেষণার প্রাণশক্তি। যে গবেষক প্রশ্ন করতে ভয় পায় না, সে-ই নতুন পথ খুলতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই একটি বাক্য—“কেন পারবে না?”—শুধু একটি বৈজ্ঞানিক কৌশল নয়; এটি এক ধরনের মানসিক অবস্থান। এই মানসিকতা মানুষকে সীমাবদ্ধতার বাইরে চিন্তা করতে শেখায়। বিজ্ঞানচর্চায়, এমনকি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও, অনেক সময় আমরা “এটা সম্ভব নয়” ধরে নিয়ে থেমে যাই। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—এই ধারণাকে একবার প্রশ্ন করলেই হয়তো নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।
ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment