ঢাকার বিএএফ শাহীন স্কুলের সেই কিশোর, যে ফাইটার প্লেনের গর্জন শুনে প্রযুক্তির প্রেমে পড়েছিল—আজ ইউরোপের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখাচ্ছেন কীভাবে একটি মোবাইল অ্যাপ বা একটি সাধারণ অ্যালার্ম বদলে দিতে পারে মানুষের জীবনযাপন। ডক্টর মোহাম্মদ সানাউল হক—আচরণ বিজ্ঞান ও টেকসই ডিজিটাল প্রযুক্তি গবেষক—বিজ্ঞানী ডট অর্গের সাক্ষাৎকারে খুলে বললেন তাঁর গবেষণা, জীবনদর্শন ও তরুণদের প্রতি আহ্বানের কথা।
ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়া একটি ছেলে। ঢাকায় জন্ম, ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা। বেলজিয়ামপ্রবাসী মামা একবার দেশে এলেন, সঙ্গে নিয়ে এলেন একটি ওয়াকম্যান—ফিলিপস বা সনির সেই ছোট্ট যন্ত্র, যেটাতে ক্যাসেট ঢুকিয়ে গান শোনা যেত। প্রায় একই সময়ে সৌদি আরবে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত চাচা এনে দিলেন ভিডিও গেমস। সমবয়সীরা যখন শুধু খেলায় মেতে উঠত, সেই ছেলেটি ভিডিও গেমস খেলার ফাঁকে ভাবত—এই যন্ত্রটা আসলে বানালো কীভাবে? ব্যাটারির সংযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? এই ছোট্ট জিনিসটা কীভাবে আমাকে এত আনন্দ দিচ্ছে? প্রযুক্তি আর মানুষের মধ্যে যে একটা অদৃশ্য সেতু আছে—সেই উপলব্ধির বীজ বোনা হয়েছিল তখনই।
ছেলেটির নাম মোহাম্মদ সানাউল হক। আজ তিনি ডক্টর সানাউল হক—ফিনল্যান্ডের এলইউটি (LUT) বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণ বিজ্ঞান ও টেকসই ডিজিটাল প্রযুক্তি গবেষক এবং সুইডেনের ইয়ংশপিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাংক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। বিজ্ঞানী ডট অর্গ আয়োজিত ‘ডিজিটাল উদ্ভাবন: মানুষের আচরণ ও স্বাস্থ্য’ শীর্ষক সাক্ষাৎকারে তিনি বিস্তারিত জানালেন তাঁর গবেষণার জগৎ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর ভাবনার কথা। উপস্থাপনায় ছিলেন বিজ্ঞানী ডট অর্গের নিয়মিত ভলান্টিয়ার জাকিয়া খাতুন তাকি এবং সহকারী উপস্থাপক ও কো-অর্ডিনেটর হাসনাবানু মমু।
ওয়াকম্যান থেকে গবেষণাগার: এক কৌতূহলী কিশোরের যাত্রা
ডক্টর সানাউল হকের গবেষণার পথে আসা কোনো পেশাগত বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, বরং একেবারে ছোটবেলার ভালোলাগা থেকে। তিনি নিজেই বললেন, “আমি এই গবেষণায় এসেছি আমার পেশার কারণে নয়, এসেছি ছোটবেলার ভালোলাগা থেকে।”
বিএএফ শাহীন স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের সামনে দিয়ে প্রতিদিন উড়ে যেত ফাইটার প্লেন আর বেসামরিক বিমান—ঢাকা বিমানবন্দর আর বিমানবাহিনীর ঘাঁটি ছিল একেবারে পাশেই। যন্ত্র আর প্রযুক্তির সেই দৃশ্য তাঁকে ছোটবেলা থেকেই নাড়া দিত। এরপর নিজে থেকেই শুরু করলেন নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা—মোটর বানানো, ছোটখাটো রোবট তৈরি করা, বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট চালানো। আস্তে আস্তে এটাই হয়ে উঠল তাঁর প্যাশন, তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি।
লন্ডনের পাঠশালা: নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয়
এইচএসসি বা ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেই সানাউল হক পাড়ি জমালেন লন্ডনে। ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন থেকে বিএসসি অনার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করলেন। লন্ডনের পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে—শুধু একাডেমিক দিক থেকে নয়, মানুষ চেনা ও বিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রেও।
তিনি জানালেন, লন্ডনের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ব্যবহারিক প্রকৃতি। শুধু পরীক্ষায় উত্তর লিখে নম্বর পাওয়া নয়—সেখানে তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প হাতে-কলমে তৈরি করতে হয়। তবে চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, পরিবার ছাড়া একা থাকা—শুরুর এক-দুই বছর বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু সেই কঠিন সময়ই তাঁকে শিখিয়েছে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিশতে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে এবং নিজেকে সামাজিকভাবে এগিয়ে নিতে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বললেন, বিদেশে পড়তে যাওয়াটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। “আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন। দেশেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ আছে। তবে নতুন জায়গায় গেলে নতুন তথ্য, নতুন শিক্ষা এবং নতুন অভিজ্ঞতা অবশ্যই পাওয়া যায়।” প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করলেন যে নেপালের একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছিলেন—শিক্ষার মান শুধু দেশ দিয়ে বিচার করা যায় না।
দেশে-বিদেশে শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য: একটি সৎ পর্যবেক্ষণ
ডক্টর সানাউল হক দেশ ও বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য নিয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিত মতামত দিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক পড়াশোনার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াটাই যেন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, আর ব্যবহারিক শিক্ষার অংশ থেকে যায় উপেক্ষিত।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ টানলেন। নটরডেম কলেজে পড়ার সময় বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাসে নম্বর বরাদ্দ ছিল মাত্র পনেরো থেকে পঁচিশ শতাংশ। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই তাত্ত্বিক পরীক্ষায় বেশি মনোযোগ দিত। কিন্তু সংজ্ঞা মুখস্থ করাটা বাস্তব জীবনের সঙ্গে কতটা সংযুক্ত—সেই প্রশ্নটা অনেক সময় অনুত্তরই থেকে যায়।
তবে তিনি কাউকে দোষ দিতে নারাজ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, সীমিত বাজেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে আদর্শ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সত্যিই চ্যালেঞ্জের। আবার বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তিগত সুবিধা বেশি হলেও সেখানে অন্য ধরনের অভাব আছে—যেমন দেশের মতো বৈচিত্র্যময় খাবার পাওয়া যায় না, পরিচিত মানুষের উষ্ণতা থাকে না। তাঁর ভাষায়, “প্রতিটা জায়গারই ভালো-মন্দ দুটোই আছে। জীবনে কোন জিনিসটাকে আপনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।”
গবেষণার হৃদয়ে: যখন একটি অ্যাপ বদলে দেয় খাদ্যাভ্যাস
ডক্টর সানাউল হকের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী প্রশ্ন: প্রযুক্তি কি মানুষের আচরণ বদলাতে পারে? এবং যদি পারে, তাহলে সেই পরিবর্তন কি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনমানকে উন্নত করতে পারে?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি কাজ করছেন বেশ কয়েকটি আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্রে। এগুলোর মধ্যে প্রধান তিনটি ধারণা বারবার উঠে এসেছে তাঁর আলোচনায়:
পারসুয়েসিভ টেকনোলজি বা প্ররোচনামূলক প্রযুক্তি—এমন প্রযুক্তি যা মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন, মোবাইল কোম্পানিগুলো যখন বিশেষ অফার দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে, সেটাও এক ধরনের পারসুয়েসিভ টেকনোলজি—তবে সেটা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। ডক্টর সানাউল হক এই একই কৌশলকে ব্যবহার করতে চান মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য।
গ্যামিফিকেশন—খেলার উপাদান ব্যবহার করে মানুষকে কোনো কাজে আগ্রহী করে তোলা। যেমন, আপনি যদি এক মাস ধরে খাওয়ার পর না বসে হাঁটাহাঁটি করেন, তাহলে নিজেকে একটা পুরস্কার দিন—এটাই গ্যামিফিকেশনের সহজ উদাহরণ। পয়েন্ট, ব্যাজ, লেভেল—এসব খেলার উপকরণ ব্যবহার করে পড়াশোনা বা স্বাস্থ্যচর্চাকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়।
নাজিং বা মৃদু ধাক্কা—মানুষকে সরাসরি বাধ্য না করে একটু ঠেলে দেওয়া যাতে সে নিজে থেকেই ভালো সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন, ফোনে সকালের অ্যালার্মে যদি শুধু ঘুম ভাঙানোর বদলে লেখা থাকে—”সকাল ছয়টায় উঠুন, দাঁত ব্রাশ করুন, আধা ঘণ্টা হাঁটতে বেরোন”—তাহলে এটা একটা ছোট্ট নাজ, যা দীর্ঘমেয়াদে অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করে।
তাঁর পিএইচডি গবেষণার একটি চমৎকার বাস্তব প্রয়োগ ছিল একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা যা মানুষকে জাঙ্ক ফুড এড়াতে এবং বেশি হাঁটাচলা করতে সাহায্য করে। তিনি বললেন, আমরা এখন রেস্তোরাঁয় গিয়ে বার্গার-পিৎজা খাই, ফেসবুকে চেক-ইন দিই, কিন্তু কখনো ভাবি না এই খাবার আমার শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর। তাঁর গবেষণায় তৈরি অ্যাপটি মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ব্যবহার করে মানুষকে অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়াতে এবং শারীরিক কার্যকলাপ বাড়াতে উৎসাহিত করত। ফলাফলও ছিল ইতিবাচক—অংশগ্রহণকারীদের ওজন কমেছিল এবং তারা মানসিকভাবেও বেশি সক্রিয় অনুভব করেছিলেন।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা: রোগ হওয়ার আগেই সচেতন হওয়া
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে ডক্টর সানাউল হক জোর দিলেন প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর। এর মূল কথা হলো—রোগ হওয়ার আগেই নিজেকে রক্ষা করা। আপনার নিজের মধ্যেই আছে আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, আর প্রযুক্তি হবে সেই ক্ষমতার সহায়ক।
তিনি একটি সহজ কিন্তু গভীর কথা বললেন: “আমরা যখন ছোট ছিলাম, বাবা-মা আমাদের যত্ন নিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবার নিজের জীবন তৈরি হয়, সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সেই সময়ে প্রযুক্তি আপনার একটি গাইড হতে পারে—আপনার আচরণ বদলানোর জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।”
মেডিকেল ডিভাইস, সফটওয়্যার সেবা, মোবাইল অ্যাপ—এগুলো যদি ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এগুলো আমাদের শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। রোগ থাকুক বা না থাকুক—সবকিছুর মূলে আছে সচেতনতা। “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল—এটা আমরা সবাই জানি। কাজেই আমাদের স্বাস্থ্য আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে।”
ওভার থিংকিং থেকে মুক্তি: একজন কিশোরীর প্রশ্নে গবেষকের উত্তর
সাক্ষাৎকারের একটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল যখন উপস্থাপক জাকিয়া খাতুন তাকি—যিনি নিজেও একজন টিনএজার—ব্যক্তিগত একটি প্রশ্ন করলেন। তিনি জানতে চাইলেন, অতিরিক্ত চিন্তা বা ওভার থিংকিং কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, বিশেষ করে পরীক্ষার সময় যখন এটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
ডক্টর সানাউল হক অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে উত্তর দিলেন। তিনি স্বীকার করলেন যে এই সমস্যা সবার মধ্যেই আসে, এমনকি তাঁর নিজের মধ্যেও। তাঁর পরামর্শ ছিল বহুমুখী:
প্রথমত, বিজ্ঞানী ডট অর্গের মতো সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকা—এটি মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তিনি নিজেও স্কুল-কলেজ জীবনে এ ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার সিলেবাসকে ছোট ছোট ভাগে ভেঙে প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়া—”কচ্ছপের মতো ধীরে কিন্তু অবিচলভাবে এগিয়ে যাওয়া।” এভাবে করলে পরীক্ষার আগের রাতে পড়ার চাপই থাকে না। তিনি মজা করে বললেন, তাঁর নিজের ফাইনাল পরীক্ষার আগে তিনি গেমস খেলতেন—কারণ আগে থেকেই প্রস্তুতি সেরে রাখতেন।
তৃতীয়ত, ভালো লাগার কাজ করা—হতে পারে বাগান করা, সিনেমা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে ইতিবাচক বিষয়ে কথা বলা। তবে সেই কথোপকথন যেন ইতিবাচক হয়—ভ্রমণ, জীবনের সুন্দর মুহূর্ত, সুস্থ থাকার উপায় নিয়ে কথা বলা। নেতিবাচক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুধু মনকে আরো ভারী করে। তাঁর ভাষায়, “প্রযুক্তি ব্যবহার করুন নিজেকে সুখী করতে, জটিল করতে নয়।”
কৃত্রিম অভাব: নিজেকে বদলানোর অভিনব কৌশল
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অংশগুলোর একটি ছিল যখন ডক্টর সানাউল হক “আর্টিফিশিয়াল স্কারসিটি” বা কৃত্রিম অভাবের ধারণাটি ব্যাখ্যা করলেন। মনোবিজ্ঞানের এই ধারণাটি সাধারণত অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হয়—যেমন কেউ তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করে। কিন্তু এই একই ধারণাকে ইতিবাচকভাবে ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগ করা যায়।
ধরুন, আপনি খাওয়ার পর সবসময় বসে ফেসবুক স্ক্রল করেন—যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং গ্যাস্ট্রিকের একটি বড় কারণ। এখন যদি আপনি এমন পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে বসার জায়গাই নেই—চেয়ার সরিয়ে রাখলেন বা দাঁড়িয়ে কাজ করার ব্যবস্থা করলেন—তাহলে আপনি বাধ্য হবেন দাঁড়িয়ে থাকতে বা হাঁটতে। এটাই কৃত্রিম অভাব—নিজেকে একটু কষ্ট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে উপকার পাওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর শরীরের কিছু নড়াচড়া করা দরকার—নইলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়।
তিনি নিজের জীবন থেকে একটি চমৎকার উদাহরণ দিলেন। ইউরোপে তাঁর একটি ডিজেল গাড়ি ছিল যেটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং জ্বালানি খরচও বেশি। তিনি সেটি ব্যবহার বন্ধ করে সাইকেল চালানো শুরু করলেন। ফলে তিনটি জিনিস একসঙ্গে সাশ্রয় হলো—বীমার টাকা, রোড ট্যাক্স এবং জ্বালানি খরচ। আর সেই বাঁচা টাকা তিনি দান করেন বিভিন্ন সামাজিক কাজে। “প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ পৃথিবীকে বদলাতে পারে,” তিনি বললেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি মনোবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট বা পুরস্কার ও শাস্তির কথা বললেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আপনি নিজেকে একটি লক্ষ্য দিন—এক মাস খাওয়ার পর না বসে হাঁটব। সফল হলে নিজেকে একটি পুরস্কার দিন। এভাবে ধাপে ধাপে—এক মাস, তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর—লক্ষ্য বাড়াতে থাকুন। বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, একটি মানুষের আচরণ স্থায়ীভাবে পরিবর্তন হতে সর্বনিম্ন তিন মাস সময় লাগে।
সেলফ-রেগুলেটেড লার্নিং: নিজের শিক্ষক নিজেই
সুইডেনের ইয়ংশপিং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বর্তমান কাজের কথা জানালেন ডক্টর সানাউল হক। সেখানে তিনি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) টুল তৈরি করেছেন যা শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। এই টুলের পেছনে যে তত্ত্ব কাজ করছে তার নাম সেলফ-রেগুলেটেড লার্নিং বা স্ব-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা—অর্থাৎ আপনি কীভাবে নিজে থেকে নিজেকে পরিচালনা করেন।
এর তিনটি ধাপ: প্রথমে নিজের লক্ষ্য ঠিক করা, তারপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করা, এবং শেষে পেছন ফিরে দেখা—কোথায় ভুল হলো, কী শেখা হলো, কীভাবে আরো ভালো করা যায়। শুধু পড়াশোনা নয়, এই কৌশল ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত জীবনেও প্রয়োগ করা যায়।
একই সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের সাউথ ইস্ট টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি (SETU)-এর সঙ্গে একটি ইরাসমাস প্রকল্পে তিনি প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও সহ-প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ করছেন এলইউটি থেকে। সেখানেও গ্যামিফিকেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে একটি যাত্রার মতো সাজানো হচ্ছে—প্রতি সপ্তাহে কাজ জমা দিন, পয়েন্ট পান, ব্যাজ অর্জন করুন, এবং ধাপে ধাপে এগিয়ে যান।
পরিবেশ ও প্রযুক্তি: চ্যাটজিপিটি ব্যবহারেও কার্বন নির্গমন হয়
সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ডক্টর সানাউল হক প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে কথা বললেন—একটি বিষয় যা অনেকেই জানেন না বা ভাবেন না।
“আপনি কি জানেন যে আপনি যখন দশ মিনিট বা আধা ঘণ্টা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন, এটা যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে এবং যে পরিমাণ শক্তি খরচ করে, সেটা অনেক বেশি?” তিনি বললেন।
শুধু চ্যাটজিপিটি নয়—গুগল জেমিনি, সোশ্যাল মিডিয়া, যেকোনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করলেই শক্তি খরচ হয় এবং কার্বন তৈরি হয়। জাপানে প্রকাশিত তাঁদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নির্গমন হয়।
তিনি পৃথিবীকে মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করলেন—”যদি আপনার হাতে গ্যাংগ্রিন ছড়ায়, আপনার পুরো শরীরই অস্বস্তি বোধ করে। ঢাকার বায়ু দূষণও তেমনি—এটা শুধু ঢাকার সমস্যা নয়, এটা পুরো পৃথিবীর সমস্যা।” কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন নয়, কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল একটাই।
সফটওয়্যার খাতে কাজ করার সুবাদে তিনি বললেন, সমাধানের একটি পথ হলো দক্ষ কোডিং। যদি একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার তার কোড ছোট ও কার্যকর করতে পারেন, তাহলে সফটওয়্যার চালাতে কম শক্তি লাগবে, সার্ভারে কম জায়গা দখল করবে, এবং সামগ্রিকভাবে কার্বন নির্গমন কমবে। একইভাবে, সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা যদি অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার কমাই—দশ মিনিটের কাজ দুই মিনিটে সারি কিন্তু আউটপুট একই রাখি—তাহলে আমরাও পৃথিবী রক্ষায় অবদান রাখছি।
গবেষণা আর ভালোবাসা: রবীন্দ্রনাথ থেকে শেখা পাঠ
বাংলাদেশের গবেষণা পরিবেশ উন্নয়নে কী পরিবর্তন দরকার—এই প্রশ্নে ডক্টর সানাউল হক একটি অসাধারণ তুলনা আনলেন। তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা, উপন্যাস, গান—সবকিছু লিখতে পেরেছিলেন কারণ তাঁকে মৌলিক চাহিদা নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন, তাঁর অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ফলে তিনি পুরোপুরি সৃষ্টিশীল কাজে মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন।
গবেষণার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে গবেষণায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন। আর এখানেই আসে গবেষণা তহবিল বা ফান্ডিংয়ের প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা ফান্ডিং সবচেয়ে বেশি—এ কারণেই তারা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে এত এগিয়ে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ফান্ডিং সীমিত, এবং এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু তাঁর মতে, ফান্ডিংয়ের চেয়েও বড় বিষয় হলো গবেষণার প্রতি ভালোবাসা। “গবেষণা করা মানে প্রেমে পড়া। যদি গবেষণার প্রতি সেই গভীর টান না থাকে, তাহলে বাকি সব ব্যবস্থা করেও লাভ নেই।” তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL) দেখা একটি ঘটনার কথা বললেন—সেখানে একজন গবেষক তাঁর গবেষণার জন্য নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এই পর্যায়ের নিবেদন ক’জন দেখাতে পারে?
তাঁর আহ্বান তরুণ প্রজন্মের প্রতি: “যদি এই ধরনের প্যাশন আপনাদের মধ্যে থাকে, তাহলে এগিয়ে যান। আর যদি না থাকে, তাহলে তৈরি করুন। এই দায়িত্ব আপনাদেরই—পরবর্তী প্রজন্মের।”
সোশ্যাল কানেক্টিভিটি: প্রযুক্তি যখন মনের ওষুধ
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে বিজ্ঞানী ডট অর্গের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ডক্টর মশিউর রহমান যোগ দিলেন। ডক্টর সানাউল হক তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, এই মিটিংয়ে যোগ দেওয়াটাই তাঁর জন্য আজকের সবচেয়ে ভালো অনুভূতি—কারণ আজকের আবহাওয়া ছিল মেঘলা ও অন্ধকার, সূর্যের আলো ছিল না, ভিটামিন ডি-ও খাওয়া হয়নি, ব্যায়ামও করা হয়নি—ফলে মানসিক চাপ অনুভব করছিলেন। কিন্তু এই সামাজিক সংযোগ তাঁকে আনন্দ দিচ্ছে।
“প্রযুক্তি আমাকে এই সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করছে এবং আমাকে সুখী করছে।” এটাই পারসুয়েসিভ টেকনোলজির ইতিবাচক ব্যবহার—মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরি করা, একাকীত্ব দূর করা, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা।
তবে তিনি সতর্ক করলেন, এই একই প্রযুক্তি যদি নেতিবাচক কাজে ব্যবহৃত হয়—যেমন পরনিন্দা, গুজব ছড়ানো, নেতিবাচক খবর আদান-প্রদান—তাহলে সেটা মন ও শরীর দুটোরই ক্ষতি করে। তাঁর বার্তা স্পষ্ট: “পৃথিবীতে সবকিছুরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক আছে। কোনটা আপনি বেছে নিচ্ছেন—সেটা আপনার হাতে। ইতিবাচক চিন্তা বেছে নিলে জীবন সুন্দর হবে।”
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও পৃথিবী: দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভাবা
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনায় ডক্টর সানাউল হক এক বিস্তৃত ও দূরদর্শী চিত্র এঁকে দিলেন। তিনি বললেন, সবকিছুই ক্রমশ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। একসময় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) চাকরির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন ছিল। এখন সেই জায়গা নিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, সরকারি সেবায়, শিক্ষায়, এমনকি নির্বাচনী ব্যবস্থায়ও আইটি এখন অপরিহার্য।
তিনি তরুণদের আহ্বান জানালেন আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করতে—কারণ ভবিষ্যতে এই জ্ঞান ছাড়া টিকে থাকা কঠিন হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—এই দুটি খাতে গবেষণার বিশাল সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশে।
তবে তিনি শুধু বাংলাদেশের কথা না ভেবে বিশ্বের সাতশো কোটি মানুষের কথা ভাবতে বললেন। “পৃথিবীতে সাতশো জন মানুষ আছে ভাবুন, তার মধ্যে বাংলাদেশ হলো মাত্র সতেরো জন। আপনি কি সেই সতেরো জনের জন্য তৈরি হবেন, নাকি সাতশো জনের জন্য?” এই রূপক ব্যবহার করে তিনি বোঝালেন যে গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈশ্বিক—শুধু স্থানীয় নয়।
এমনকি তিনি আরো দূরের ভবিষ্যতের কথাও ভাবলেন। দুইশো বছর আগে বাংলাদেশ নামে কোনো দেশ ছিল না, আমেরিকাও ছিল না বর্তমান রূপে। একশো বছর পর হয়তো দেশের ধারণাই বদলে যেতে পারে—হয়তো এআই সরকার আসবে, হয়তো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিশ্ব পরিচালনা করবে। এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মানব-কেন্দ্রিক নকশা: সমস্যা সমাধান শুরু হোক স্থানীয়ভাবে
গবেষণা বা উদ্ভাবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী—এই প্রশ্নে ডক্টর সানাউল হক বললেন, সবার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—আমি কেন এটা করছি? কোনো স্থানীয় সমস্যা সমাধান করতে চাইছি? তাহলে সেই সমস্যাকে ভালো করে বুঝুন, মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, ফিজিবিলিটি স্টাডি বা পাইলট স্টাডি করুন।
তিনি যে পদ্ধতির কথা বললেন তাকে বলা হয় ইউজার-সেন্টারড ডিজাইন বা ব্যবহারকারীকেন্দ্রিক নকশা এবং ডিজাইন থিংকিং—যেখানে সমস্যা সমাধানের প্রতিটি ধাপে মানুষকে সম্পৃক্ত রাখা হয়। শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না—সেই প্রযুক্তি মানুষের আসল প্রয়োজন মেটাচ্ছে কি না, সেটা যাচাই করা জরুরি।
জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বললেন, কিছু সমস্যা আমাদের হাতে নেই—যেমন আন্তর্জাতিক তেলের দাম। কিন্তু আমরা যা করতে পারি সেটা হলো এই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তরুণ বয়সে ধাক্কা খাওয়াটা বরং ভালো—কারণ তখন শক্তি আছে, উদ্যম আছে, নতুন করে শুরু করার সাহস আছে। পঞ্চাশ বছর বয়সে এই ধাক্কা সামলানো অনেক কঠিন।
তিনি ইসলামের রোজা রাখার উদাহরণও টানলেন—ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা বিরতিসহ উপবাস নিয়ে জাপানি একজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, অথচ এই চর্চা ইসলামে বহু শতাব্দী ধরে আছে। কম খেলে স্বাস্থ্যের উপকার হয়, খরচ বাঁচে, এবং সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ও ভোগের চাপ কমে—পুরো ব্যবস্থাতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তাঁর মূল বার্তা: পরিবর্তন শুরু হোক ব্যক্তি থেকে। “আপনি একটি ছোট পদক্ষেপ নিলে হয়তো কেউ বুঝবে না। কিন্তু যখন কোটি মানুষ সেই একই পদক্ষেপ নেবে, তখন বিশাল প্রভাব তৈরি হবে।” আর হ্যাঁ, শুরুতে কেউ হয়তো আপনাকে নিয়ে হাসবে, পাগল বলবে—”কিন্তু এজন্যই তো আমরা বিজ্ঞানী! নতুন কিছু করতে গেলে একটু পাগলামি দেখাতেই হয়।”
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন শাখা, একই লক্ষ্য
ডক্টর সানাউল হক অনার্স-মাস্টার্স জীবন থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—যেমন আইইইই (IEEE) স্টুডেন্ট সোসাইটি। দেশেও বিভিন্ন সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক ক্লাবে সক্রিয় ছিলেন। এই সংযোগগুলো তাঁকে নতুন নতুন মানুষ, নতুন চিন্তাধারা, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন কাজের পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
বিশেষভাবে চমকপ্রদ হলো তাঁর আন্তঃবিষয়ক কাজের অভিজ্ঞতা। তাঁর নিজের পটভূমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, পিএইচডি ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর, আর এখন কাজ করছেন সমাজবিজ্ঞান ও মানবিক শাখার গবেষকদের সঙ্গে। এই বৈচিত্র্য তাঁর গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে অসাধারণভাবে—কারণ একটি সমস্যাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমাধানও হয় বহুমাত্রিক।
তিনি বাংলাদেশের তরুণদের উৎসাহিত করলেন এ ধরনের আন্তর্জাতিক ও আন্তঃবিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে—হোক সেটা স্বেচ্ছাসেবামূলক, হোক সেটা পেশাগত। এটা শুধু সিভিতে একটা লাইন যোগ করে না—এটা জীবনকে সমৃদ্ধ করে।
তরুণদের প্রতি পরামর্শ: টিম গড়ুন, গবেষণা করুন, সমাজে অবদান রাখুন
আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করতে আগ্রহী তরুণদের জন্য ডক্টর সানাউল হকের পরামর্শ ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর।
প্রথমত, ব্যাচেলর বা মাস্টার্সের থিসিসটাকে গুরুত্বের সঙ্গে করুন। বাংলাদেশে অনেক সময় এই থিসিসগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না—কিন্তু এটাই হতে পারে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার প্রথম সিঁড়ি।
দ্বিতীয়ত, একটি দল গড়ে তুলুন। একা কাজ করার চেয়ে দলগত কাজ অনেক বেশি ফলদায়ক—কেউ তথ্য সংগ্রহ করবে, কেউ প্রযুক্তিগত দিক দেখবে, কেউ লেখালেখি করবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা যায়, একটি গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশ করা যায়, এমনকি একটি পণ্য তৈরি করে পেটেন্ট করা যায় বা ব্যবসা শুরু করা যায়।
তৃতীয়ত, দেশে-বিদেশে কী ধরনের গবেষণা হচ্ছে সেগুলো পড়ুন, জানুন, সময় দিন। “নতুন তরুণরা মনে করে সবকিছু খুব সহজ। কিন্তু সবকিছু এত সহজে আসে না—এর জন্য অনেক সময় ও পরিশ্রম দরকার।”
আর সবশেষে, মানসিকতা বদলান। “গবেষণায় বিলিয়নিয়ার হওয়া যায় না। গবেষকরা আসলে অন্যদের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেন—তাদের তথ্য দিয়েই ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যায়। গবেষকরা হলেন সমাজের স্তম্ভ।” কাজেই গবেষণায় আসতে হলে মানসিকতা হতে হবে—”আমি সমাজে অবদান রাখতে এসেছি, টাকা উপার্জনের জন্য নয়। টাকা আজ না হোক কাল আসবে। কিন্তু সমাজে অবদান রাখার যে আনন্দ—সেটাই আসল অর্জন।”
জীবনটা একটা ট্রেন যাত্রা
তাঁর সবচেয়ে বড় শেখা কী—এই প্রশ্নে ডক্টর সানাউল হকের উত্তর ছিল অপ্রত্যাশিত এবং গভীর। তিনি বললেন, “আমি এখনো নিজেকে একজন ছাত্র মনে করি। যেদিন আমি মনে করব যে আমি সব শিখে ফেলেছি, সেদিনই আমার ভেতরের বিজ্ঞানী মরে যাবে।”
তিনি জীবনকে একটি ট্রেন যাত্রার সঙ্গে তুলনা করলেন। ধরুন, আপনি ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যাচ্ছেন। পথে বিভিন্ন স্টেশনে থামতে হয়, টিকিট চেকার আপনার টিকিট দেখে—আপনি পাশ করলেন, পরের ধাপে এগিয়ে গেলেন। জীবনের প্রতিটি অর্জন—পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, ডিগ্রি পাওয়া, চাকরি পাওয়া—এগুলো হলো সেই স্টেশনের টিকিট চেক। গন্তব্য এখনো অনেক দূরে, যাত্রা শেষ হয়নি।
“আজকে আপনাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে আসা—এটাও আমার জীবনের একটা বড় অর্জন। এই প্ল্যাটফর্মে আসতে আমার বিশ বছরের পরিশ্রম লেগেছে।”
উপসংহার: একজন গবেষকের গল্প, একটি প্রজন্মের প্রেরণা
ডক্টর মোহাম্মদ সানাউল হকের যাত্রাটি একজন সাধারণ ঢাকার কিশোরের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। ওয়াকম্যানের ব্যাটারি নিয়ে কৌতূহলী সেই ছেলে আজ ইউরোপের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখাচ্ছেন কীভাবে প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের জীবন বদলানো যায়। তাঁর গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক নয়—এটি মোবাইল অ্যাপ থেকে শুরু করে এআই টুল পর্যন্ত বাস্তব সমাধান তৈরি করছে, যা মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং শেখার দক্ষতা উন্নত করছে।
কিন্তু তাঁর গবেষণার চেয়েও বড় যে বার্তাটি তিনি দিলেন তা হলো—গবেষণা মানে কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশ বা ডিগ্রি অর্জন নয়। গবেষণা মানে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের জীবন সুন্দর করার অঙ্গীকার, এবং সর্বোপরি নিজেকে একজন চিরন্তন শিক্ষার্থী হিসেবে দেখার বিনয়। “স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মন ভালো থাকলে দেখবেন জীবনের অন্যান্য জিনিসগুলো এমনিতেই ভালো আসবে”—তাঁর এই সরল উপলব্ধিই হয়তো সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সত্য।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর যাত্রা একটি জীবন্ত প্রমাণ যে—ছোটবেলার ভালোলাগা, একটু পাগলামি, আর লেগে থাকার জেদ থাকলে ঢাকার বিএএফ শাহীন স্কুল থেকে ফিনল্যান্ড-সুইডেন-আয়ারল্যান্ডের গবেষণাগার পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। শুধু মনে রাখতে হবে—কচ্ছপের মতো ধীরে কিন্তু অবিচলভাবে এগিয়ে যেতে হবে, আর পথটাকে উপভোগ করতে হবে।
সাক্ষাৎকারটি বিজ্ঞানী ডট অর্গ আয়োজিত ‘ডিজিটাল উদ্ভাবন: মানুষের আচরণ ও স্বাস্থ্য’ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থাপনায় ছিলেন জাকিয়া খাতুন তাকি ও হাসনাবানু মমু।
ড. মোঃ সানাউল হকের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

Leave a comment