চিকিৎসা বিদ্যাপরিবেশ ও পৃথিবীস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

আর্সেনিক সংকট: আমরা কেন এত দেরিতে কার্যকর সমাধান পেলাম?

Share
Share

বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণকে অনেকেই “নীরব দুর্যোগ” বলে থাকেন। কারণ এই বিষের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না, কিন্তু বছরের পর বছর শরীরে জমে গিয়ে এটি মানুষের স্বাস্থ্যকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি নব্বইয়ের দশকে বৈজ্ঞানিকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—সমস্যা জানা সত্ত্বেও কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে আমাদের এত দেরি হলো কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ড. আবুল হুস্সামের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। তাঁর কথায়, “সমস্যা আমরা অনেক আগে জেনেছি, সমাধানে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে।”

আর্সেনিক সংকটের শুরুটা হয়েছিল নিরাপদ পানির অভাব থেকে মুক্তি পেতে নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে। ভূগর্ভস্থ পানিকে নিরাপদ মনে করে দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ নলকূপ বসানো হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলাফল হিসেবে বহু অঞ্চলে আর্সেনিক দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। বৈজ্ঞানিকভাবে সমস্যাটি শনাক্ত হওয়ার পরও সমাধান মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে—এর পেছনে নীতিনির্ধারণের দুর্বলতা, পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি কাজ করেছে।

ড. হুস্সামের উদ্ভাবিত সোনো ফিল্টার দেখিয়ে দেয়, সমাধান প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব ছিল। প্রশ্ন হলো, এই ধরনের প্রযুক্তি কেন দ্রুত বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি? এর একটি কারণ হলো, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি। বিজ্ঞানীরা সমাধান বের করলেও তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনেক সময় প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আটকে থাকে, মাঠপর্যায়ে স্কেল-আপ করা হয় না। ফলে মানুষ কার্যকর সমাধান পেতে দেরিতে পৌঁছায়।

এই সংকট আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—সমস্যা শনাক্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি দ্রুত সমাধান বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশে প্রযুক্তিগত সমাধান অনেক সময় আন্তর্জাতিক সহায়তা, দাতা সংস্থা বা প্রকল্পনির্ভর হয়ে পড়ে। প্রকল্প শেষ হলে উদ্যোগও অনেক সময় থেমে যায়। আর্সেনিক সংকটের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই সমাধানের অভাব লক্ষ করা গেছে।

ড. হুস্সামের কাজ দেখায়, কার্যকর সমাধান তখনই সম্ভব, যখন প্রযুক্তি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। তাঁর ফিল্টার বিদ্যুৎ ছাড়াই কাজ করে এবং কম খরচে তৈরি করা যায়—এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একে গ্রামীণ বাস্তবতায় উপযোগী করেছে। তবু এই ধরনের প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ার পেছনে যে প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা আমাদের উন্নয়ন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার দিকটি সামনে আনে।

তরুণ গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন ছাড়া কোনো বড় সামাজিক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে পরিবেশ, পানি বা স্বাস্থ্য সংকটে যাতে এমন দেরি না হয়, সে জন্য গবেষণালব্ধ সমাধান দ্রুত মাঠে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা জরুরি। আর্সেনিক সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমস্যা জানা থাকলেই যথেষ্ট নয়; সময়মতো সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নই মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।

ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ