কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

“পানির নিচের পৃথিবী আমাদের মাটির উপরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন—তাই সেখানে ভিশন টেকনোলজি আরও কঠিন।” ড. আলিমুর রেজা

Share
Share

আমরা শহরের রাস্তা, ঘরের ভেতর, অফিসের কক্ষ—এসব পরিবেশে এআইকে কাজ করতে দেখেছি। ক্যামেরা বসিয়ে ট্রাফিক দেখা, ফেস রিকগনিশন, দোকানে পণ্য শনাক্ত—এসব এখন পরিচিত। কিন্তু পানির নিচে? সেখানে তো মানুষ থাকে না, আমাদের চোখও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে চায় না। ঠিক এই কারণেই পানির নিচের জগতকে ‘দেখা’ শেখানো কম্পিউটার ভিশনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

পানির নিচে ছবি তোলার কথা ভাবুন। আপনি যদি কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে দূরের কিছু দেখেন, তেমনই লাগে। আলো দ্রুত কমে যায়, রং বদলে যায়, পানি ও কণার কারণে দৃশ্য ঝাপসা হয়, কখনো আলো ভেঙে পড়ে (রিফ্র্যাকশন) বস্তুর আকৃতি ভিন্নভাবে ধরা পড়ে। ফলে যেটা স্থলে সহজ—একটা মাছ আর একটা শৈবালকে আলাদা করা—পানির নিচে তা হঠাৎ কঠিন হয়ে যায়। ছবির মান খারাপ হলে মানুষের চোখও ভুল করে; যন্ত্র তো শিখে এসেছে পরিষ্কার ছবিতে—তাই সে আরও বেশি ভুল করতে পারে। ড. আলিমুর রেজা দেখান, সমস্যাটা কেবল প্রযুক্তির নয়, সমস্যাটা পরিবেশেরও। মানুষ যেখানে স্বাভাবিকভাবে থাকে না, সেখানে ডেটা কম, অভিজ্ঞতা কম, আর সিস্টেম বানানোর চর্চাও কম।

এইখানে আসে সেমান্টিক সেগমেন্টেশন, ড. আলিমুর রেজার মূল আগ্রহের ক্ষেত্র। সেমান্টিক সেগমেন্টেশন মানে ছবি বা ভিডিওকে অর্থপূর্ণ অংশে ভাগ করা, এবং প্রতিটি অংশকে নাম দেওয়া—এটা মাছ, এটা পাথর, এটা প্রবাল, এটা শৈবাল। আপনি এটাকে এক ধরনের বুদ্ধিমান মানচিত্র আঁকা বলতে পারেন। তবে পানির নিচে মানচিত্র আঁকতে গেলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়, কারণ একই মাছ বিভিন্ন আলোতে ভিন্ন রঙের দেখাতে পারে, ঢেউয়ের কারণে সীমারেখা (এজ) কাঁপতে পারে, আর এক বস্তু আরেকটার গায়ে এমনভাবে মিশে যায় যে আলাদা করা কঠিন। এইসব জটিলতার মাঝেও গবেষকদের লক্ষ্য হলো এমন মডেল তৈরি করা, যা বাস্তব পানির নিচের ভিডিওতে স্থিরভাবে কাজ করবে।

ড. আলিমুর রেজা জানান, তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় তারা পানির নিচের পরিবেশে অনেক বেশি সংখ্যক অবজেক্ট ক্যাটাগরি নিয়ে একটি সেমান্টিক সেগমেন্টেশন মডেল তৈরি করেছেন। এখানে মূল ভাবনাটি সহজ: আমরা যেমন স্থলে নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তেমনি পানির নিচের প্রাণী ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণেও এআই কাজ করতে পারে। বিশেষ করে মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ বা মাছচাষ ব্যবস্থাপনায় এই প্রযুক্তির গুরুত্ব অনেক। নর্ডিক দেশগুলোতে যেমন বড় আকারে ফিশিং ও অ্যাকুয়াকালচার চলে, সেখানে মাছের রোগ, আচরণ পরিবর্তন, কিংবা পানি-পরিবেশের সমস্যাগুলো দ্রুত ধরতে এআইভিত্তিক মনিটরিং দরকার হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি আরও প্রাসঙ্গিক। আমাদের নদীনির্ভর জীবন, উপকূলীয় অঞ্চল, মৎস্যসম্পদ—সব মিলিয়ে পানির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর। ভাবুন, যদি ভবিষ্যতে মাছচাষের ঘেরে ক্যামেরা বা সেন্সর বসিয়ে এআই দিয়ে মাছের অস্বাভাবিক আচরণ ধরা যায়, কিংবা পানির নিচের পরিবেশে দূষণ বা পরিবর্তন আগেভাগে শনাক্ত করা যায়—তাহলে ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে। বাস্তবে এটি একদিন বাস্তবায়িত হলে কৃষি ও মৎস্যখাতে টেকসই উন্নয়নের (SDG) সঙ্গে যুক্ত নানা লক্ষ্য—খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার—এসবের সঙ্গে প্রযুক্তির সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।

তবে ড. আলিমুর রেজার বক্তব্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি এগোয় প্রশ্নের পথ ধরে। আমরা যেসব পরিবেশে প্রতিদিন চলি, সেখানে প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হয়; আর যে জগত আমাদের চোখের বাইরে, সেখানে উন্নয়ন ধীর। কিন্তু ভবিষ্যৎ পৃথিবী শুধু ঘরের ভেতর থেমে থাকবে না। সমুদ্র, নদী, গভীর জল—এই বিশাল অদেখা জগৎও একদিন ডেটা, ভিশন, আর বুদ্ধিমত্তার মানচিত্রে ধরা দেবে। আর সেই পথে যারা কাজ করছেন, তাদের একজন ড. আলিমুর রেজা—যিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, বিজ্ঞান মানে পরিচিত জগৎকে শুধু দ্রুত করা নয়; অচেনা জগতকে বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা।

পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org