উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগকৃষিবিজ্ঞানীদের জীবনী

“ল্যাবরেটরি অস্ট্রেলিয়ায়, মন পড়ে থাকে বাংলাদেশের মাঠে”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

বিশ্ববিজ্ঞানের গবেষণাগারে কাজ করা অনেক বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর জীবন দুই জগতের মধ্যে বিভক্ত—একদিকে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি, অন্যদিকে দেশের মাঠঘাট, কৃষক ও বাস্তব সমস্যার টান। উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর জীবনেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা CSIRO-তে কাজ করলেও তাঁর ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ফিরে আসে বাংলাদেশের কৃষি ও বীজের সংকট। তাঁর কথায়, তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে গিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন—এই স্বপ্ন ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি দায়িত্ববোধের প্রকাশ।

প্রবাসে গবেষণা, দেশের জন্য দায়

ড. আবেদ চৌধুরীর শিক্ষাজীবন ও গবেষণা পথচলা তাঁকে বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়, NIH ও MIT-এর মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মুকুট নয়; এই অভিজ্ঞতা দেশের জন্যও এক বিরাট সম্পদ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবাসী বিজ্ঞানীর জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের উন্নয়নে পুরোপুরি কাজে লাগে না।

ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, বিদেশে থেকে কাজ করলেও দেশের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ রাখা সম্ভব। নিয়মিত দেশে যাওয়া, স্থানীয় বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, যৌথ গবেষণা উদ্যোগ নেওয়া—এসবের মাধ্যমে প্রবাসী বিজ্ঞানীরা দেশের গবেষণা পরিকাঠামোকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। তিনি নিজেও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের কৃষি ও বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট নানা উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন, যাতে গবেষণাগারের জ্ঞান মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় কাজে লাগে।

‘ব্রেইন ড্রেইন’ নয়, ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’

দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগ ছিল ‘ব্রেইন ড্রেইন’—মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যান, দেশের জন্য তাঁদের অবদান সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ড. আবেদ চৌধুরী এই প্রক্রিয়াকে দেখেন ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ হিসেবে—যেখানে বিজ্ঞানীরা বিদেশে জ্ঞান অর্জন করে সেই জ্ঞান বিভিন্নভাবে দেশে ফিরিয়ে দেন।

এই জ্ঞান ফিরিয়ে দেওয়ার পথ শুধু স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যৌথ প্রকল্প, অনলাইন মেন্টরিং, গবেষণা সহযোগিতা, এমনকি প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমেও এই অবদান সম্ভব। তাঁর মতে, রাষ্ট্র যদি প্রবাসী বিজ্ঞানীদের জন্য সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে এই ‘সার্কুলেশন’ আরও গতিশীল হতে পারে।

দেশের বাস্তব সমস্যা না জানলে গবেষণা অসম্পূর্ণ

ড. আবেদ চৌধুরীর দৃষ্টিতে বিজ্ঞান কেবল তত্ত্ব বা গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার। বাংলাদেশের কৃষি ও বীজ সংকট সম্পর্কে তাঁর গভীর উদ্বেগের কারণ, তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখেছেন। গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, উন্নত জাতের বীজ বা আধুনিক প্রযুক্তির অভাব কীভাবে কৃষকের উৎপাদন ও আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করেছে। উদ্ভিদের বীজ নিয়ে মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি তিনি ভাবছেন, কীভাবে এই জ্ঞান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মতো দেশে ব্যবহারিক সমাধান হিসেবে কাজে লাগানো যায়। এতে বিজ্ঞানীর ভূমিকা কেবল গবেষক হিসেবে নয়, সমাজের সমস্যার অংশীদার হিসেবেও রূপ নেয়।

তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা

প্রবাসী বিজ্ঞানীদের গল্প তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। ড. আবেদ চৌধুরীর জীবনপথ দেখায়, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করা সম্ভব হলেও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি নয়। বরং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেশের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

তিনি তরুণদের উৎসাহ দেন বড় স্বপ্ন দেখতে, বিদেশে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ নিতে। তবে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, নিজের শিকড় ভুলে না যাওয়ার গুরুত্ব। দেশের বাস্তব সমস্যার প্রতি সংবেদনশীলতা থাকলে বিজ্ঞানচর্চা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

শেষকথা

ড. আবেদ চৌধুরীর জীবন ও ভাবনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—বিশ্বের নাগরিক হয়েও আমরা কি দেশের নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারি না? তাঁর গল্প প্রমাণ করে, গবেষণাগারের আলো আর দেশের মাঠের মাটি একে অপরের বিরোধী নয়; বরং এই দুইয়ের সংযোগেই টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি হতে পারে। প্রবাসী বিজ্ঞানীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যদি পরিকল্পিতভাবে দেশের উন্নয়নে যুক্ত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও আলোকিত হতে পারে।


ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org