বিজ্ঞানীদের জীবনী

“আমি দেখেছি আমার নিজের এলাকার পানিতে আর্সেনিক আছে—তখন মনে হলো কিছু করা দরকার” — ড. আবুল হুস্সাম

Share
Share

কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অনেক সময় গবেষণাগারের ভেতরে জন্ম নেয়, আবার অনেক সময় তার জন্ম হয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তীব্র ধাক্কা থেকে। ড. আবুল হুস্সামের ক্ষেত্রে আর্সেনিক দূষণ নিয়ে তাঁর কাজের পেছনের প্রেরণাটি ছিল এমনই এক ব্যক্তিগত উপলব্ধি। নিজের জন্মভূমি কুষ্টিয়ার পানিতে যখন তিনি আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত করলেন, তখন বিষয়টি আর কেবল একটি গবেষণার প্রশ্ন রইল না—এটি হয়ে উঠল মানুষের জীবনের প্রশ্ন। তাঁর কথায়, “আমি দেখেছি আমার নিজের এলাকার পানিতে আর্সেনিক আছে—তখন মনে হলো কিছু করা দরকার।”

বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট। বহু বছর ধরে নলকূপের পানিকে নিরাপদ ভেবে ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ সেই পানিতেই ধীরে ধীরে জমেছে বিষ। আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাব তাত্ক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে না। বছরের পর বছর শরীরে জমে গিয়ে এটি ত্বকের রোগ, কিডনি সমস্যা এমনকি ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের জন্ম দেয়। ফলে সমস্যাটি যতটা ভয়াবহ, ততটাই নীরব। এই নীরব বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে একজন বিজ্ঞানীর দায়বদ্ধতা কী হওয়া উচিত—ড. হুস্সামের কাজ সেই প্রশ্নের একটি মানবিক উত্তর।

তিনি অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রির গবেষক হিসেবে আর্সেনিক শনাক্তের উন্নত পদ্ধতি জানতেন। কিন্তু কেবল শনাক্ত করাই সমস্যার সমাধান নয়। তাঁর উপলব্ধি ছিল, গ্রামের মানুষের হাতে এমন একটি প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে হবে, যা তারা নিজেরাই ব্যবহার করতে পারে। এখানেই বিজ্ঞান ও মানবিক দায়িত্ব একসূত্রে মিলিত হয়। গবেষণাগারের তত্ত্বকে মাঠের বাস্তবতায় নামিয়ে আনাই হয়ে ওঠে তাঁর মূল লক্ষ্য।

এই চিন্তা থেকেই তিনি স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে সোনো ফিল্টার উদ্ভাবন করেন। এটি এমন একটি পানি পরিশোধন পদ্ধতি, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই কাজ করে এবং স্বল্প খরচে তৈরি করা যায়। ফলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়। আর্সেনিকের মতো একটি জটিল সমস্যার সমাধান যদি গ্রামের মানুষের ঘরের উঠোনেই করা যায়—এটাই ছিল ড. হুস্সামের স্বপ্ন।

এই উদ্ভাবনের পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, ছিল গভীর মানবিক অনুভূতি। নিজের এলাকার মানুষের পানিতে বিষের উপস্থিতি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই অনুভূতিই তাঁকে গবেষণাগারের বাইরে নিয়ে এসেছে। অনেক সময় বিজ্ঞানীরা সমাজের সমস্যা নিয়ে গবেষণা করলেও সরাসরি সমাধানের পথে হাঁটেন না। কিন্তু ড. হুস্সামের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা আলাদা দুটি পথ হয়ে দাঁড়ায়নি; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করেছে।

এই গল্প তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ার মানেই কেবল প্রকাশনা, পদোন্নতি বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। সমাজের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার সমাধান খোঁজার মধ্যেই বিজ্ঞানীর প্রকৃত ভূমিকা নিহিত। যখন নিজের চোখে দেখা কোনো সমস্যাকে গবেষণার প্রশ্নে রূপ দেওয়া যায়, তখনই বিজ্ঞান মানুষের জীবনে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন আনতে পারে।

ড. হুস্সামের উক্তিটি তাই কেবল একটি স্মৃতিচারণ নয়; এটি একটি আহ্বান—নিজের চারপাশের সমস্যাকে দেখুন, অনুভব করুন এবং ভাবুন, আপনি কীভাবে বিজ্ঞান বা জ্ঞানের মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে পারেন।

ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org