ভাষা সব সময় সরল ও সোজা নয়। আমরা যেমন এক কথায় যা বলতে চাই তা সরাসরি প্রকাশ করি না, তেমনই ভাষা বহু অর্থের সম্ভাব্যতায় ভরা। একবার ভাবুন: আপনি যখন বলেন, “আমি ভালো আছি,” এই কথাটি কি কেবল তার বস্তুনিষ্ঠ অর্থ বহন করছে? না, তা তো বহুবিধ ভাব প্রকাশ করতে পারে—উদাহরণস্বরূপ: আশ্বস্তকরণ, কষ্ট, উপহাস বা এড়িয়ে যাওয়ার সংকেত। সবকিছু নির্ভর করে কে শুনছে, কী প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে, টোন কেমন। ঠিক এমনই ভাব ভাবুন, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে যেমন একটি কণার অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না যতক্ষণ না সেটিকে পরিমাপ করা হয়, তেমনি ভাষার অর্থও থাকে “সুপারপজিশন” অবস্থায়।
আমার ভাষাবিজ্ঞানের যাত্রা যন্ত্র, মডেল বা কম্পিউটেশন দিয়ে শুরু হয়নি। আমার এই চিন্তাভাবনা শুরু হয় জনাব নায়রা খান (সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এর কাছে, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে আছেন। তাঁর পাঠ ও লেখনী আমাকে প্রথমে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) দেখিয়েছিল কেবল প্রযুক্তিগত ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ভাষাকে ভিন্নভাবে চিন্তা করার এক দৃষ্টিকোণ হিসেবে। ভাষা কেবল কাগজে বিশ্লেষণের বিষয় নয়; এটি মডেল করা, পরীক্ষা করা, পর্যবেক্ষণ করা যায়। আমি ছোট ছোট পরীক্ষামূলক কাজ করেছি, ভেঙেছি, শিখেছি, আবার চেষ্টা করেছি। প্রথাগত ব্যাকরণ আমাকে কাঠামোর কথা শিখিয়েছিল, স্ট্রাকচারাল ভাষাতত্ত্ব আমাকে সম্পর্কের জটিলতা শিখিয়েছিল, এবং জেনারেটিভ ব্যাকরণ আমাকে আভাস দিয়েছিল ভাষার নিখুঁত এবং বিমূর্ত কাঠামোর। কিন্তু ফাঁক ছিল: চমস্কি মূলত সিনট্যাক্সে কাজ করেছেন, কিন্তু ধ্বনিতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব বা প্রাগম্যাটিক্সে তুলনামূলকভাবে কম। কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞান এই ফাঁকগুলো পূরণ করে এটি বিজ্ঞান, গণিত, এবং কম্পিউটেশনের সাহায্যে বোঝায় কীভাবে শব্দ বিভিন্ন অর্থ বহন করে এবং কীভাবে অর্থ প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হয়।
শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল মনে আছে কি? কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞানে, শব্দ এবং বাক্যও অনেকটা সেই বিড়ালের মতো। বিজ্ঞানজগতে সবচেয়ে রহস্যময় প্রাণীটির নাম সম্ভবত শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল। ১৯৩৫ সালে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ আরউইন শ্রোডিঙ্গার একটি কাল্পনিক পরীক্ষার কথা বলেছিলেন, যেখানে একটি বদ্ধ বাক্সের ভেতরে থাকা বিড়াল একই সঙ্গে ‘জীবিত’ এবং ‘মৃত’ অবস্থায় থাকতে পারে। যতক্ষণ না আমরা বাক্সটি খুলছি, ততক্ষণ বিড়ালটি এই দুই বিপরীত অবস্থার একটি মিশ্রণে বা ‘সুপারপজিশন’-এ থাকে। শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও অতি-পারমাণবিক কণা বা কোয়ান্টাম জগতে এটাই চরম সত্য। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানের এই জটিল ধাঁধাটি কি কেবল পদার্থবিজ্ঞানের ল্যাবে বা সমীকরণে সীমাবদ্ধ? উত্তর হচ্ছে, না। আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন, আপনার মনের ভেতরেও শব্দের অর্থগুলো ঠিক শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের মতোই আচরণ করছে। জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বিজ্ঞান, কোয়ান্টাম লিঙ্গুইস্টিকস বা কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞান।
ভাষা কি একটি কোয়ান্টাম সিস্টেম?
কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞানে, শব্দ এবং বাক্যগুলো কোয়ান্টাম কণার মতো আচরণ করে: এটি একাধিক সম্ভাব্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে যতক্ষণ না একজন সচেতন পর্যবেক্ষক এটি “পরিমাপ” করে। ধরা যাক, শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল: জীবিত এবং মৃত দুই অবস্থায় একসাথে থাকে যতক্ষণ না খোলা বাক্সে দেখা হয়। শব্দের অর্থও এভাবেই সম্ভাবনার জটিলতায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, run শব্দটি শারীরিক গতিশীলতা বা কোম্পানি পরিচালনার অর্থ বহন করতে পারে। দুটি অর্থই সম্ভাব্য, তবে প্রেক্ষাপটের দ্বারা এটি নির্দিষ্ট অর্থে ধসে আসে।
এছাড়াও বাক্য কাঠামো স্থির নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলায় একটি বাক্য হতে পারে SVO (আমি ভাত খাই) এবং OSV (ভাত আমি খাই) একসাথে সম্ভাব্য অবস্থায় থাকে, এবং প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করে কোনটি ধসে আসবে। সিনট্যাক্স জটিলভাবে যুক্ত: একটি শব্দের অর্থ পরিবর্তন অন্য শব্দের অর্থকে প্রভাবিত করতে পারে, ঠিক যেমন কোয়ান্টাম জগতে দুটি জটিল কণা একে অপরকে প্রভাবিত করে।
একদিন আমি ভাবছিলাম, ভাষা কি কেবল নিয়ম ও কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ? আমি মনে করি, না। যেমনই ব্ল্যাকহোলের বিষয়টি আপনি জানেন, ব্ল্যাকহোল আলোকে “টানে না,” বরং তার চারপাশের স্থান-কালকে এত বাঁকিয়ে দেয় যে আলো সেই বাঁকা পথ ধরেই চলে এবং আর বাইরে ফিরে আসতে পারে না। ঠিক তেমনি ভাষা ও অর্থও কোনো স্থির পথ অনুসরণ করে না। যখন একটি বাক্য বলা হয়, তার অর্থ “collapse” হয় সেই প্রসঙ্গ এবং শ্রোতার মানসিকতার সাথে।

ভাষার সুপারপজিশন
কল্পনা করুন একটি শব্দ, যেমন “BAT”। এটি হতে পারে একটি mammal বা sports equipment একসাথে। শব্দটি একাধিক অর্থ বহন করে এবং প্রতিটি সম্ভাব্য অর্থের সম্ভাবনা আলাদা। শ্রোতা যখন বাক্যটি শুনেন, তখন তার মন সেই অর্থের সম্ভাবনার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অর্থকে collapse করে। যেমন: “আমি ব্যাট নিয়ে খেলতে যাচ্ছি” এখানে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ব্যাট হলো খেলার সরঞ্জাম। আর যদি বলা হয়, “বাঘের ব্যাট রাস্তায় দৌড়াচ্ছে,” তখন অর্থ অন্য রকম।
এই ধারণাটি দেখায়, ভাষা পর্যবেক্ষক নির্ভর। অর্থ নির্ভর করে কে শুনছে, কোন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। একই বাক্য ভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
সিনট্যাক্টিক (বাক্যগত) এবং সিম্যানটিক (অর্থগত) এনট্যাঙ্গেলমেন্ট
কোয়ান্টাম জগতের আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো ‘এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট’ বা কোয়ান্টাম আসক্তি। দুটি কণা যদি এন্ট্যাঙ্গলড হয়, তবে একটির অবস্থা পরিবর্তন করলে অন্যটির অবস্থাও মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়, তারা যত দূরেই থাকুক না কেন। আইনস্টাইন একে বলেছিলেন ‘ভুতুড়ে কাণ্ড’ (Spooky action at a distance)।
ভাষার ব্যাকরণ বা সিনট্যাক্সেও কি এমনটা ঘটে? অবশ্যই। বাংলার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। “সে বই পড়ছে” আর “ আমি বই পড়ছি” এখানে ‘সে’ থেকে যখনই ‘আমি’তে পরিবর্তন করা হলো, বাক্যের শেষে ‘পড়ছে’ ক্রিয়াটির রূপও মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। এখানে কর্তা আর ক্রিয়া যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা বা এন্ট্যাঙ্গলড। একটির পরিবর্তন মানেই অপরটির অনিবার্য রূপান্তর।
কোয়ান্টাম ভাষায় শব্দ ও বাক্যাংশের মধ্যে entanglement থাকে। উদাহরণস্বরূপ, “নায়রা নিজেকে আঘাত করল।” এখানে নায়রা এবং নিজেকে শব্দগুলো একে অপরের সাথে জড়িত। একটির অবস্থান ও ব্যাখ্যা অন্যটির ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই entanglement বোঝায়, ভাষার অংশগুলো কখনও স্বাধীন নয়। তারা পরস্পরের সাথে জড়িত, এবং একটি অংশের পরিবর্তন অন্য অংশের অর্থকে প্রভাবিত করতে পারে।
এটি শুধু বাক্যতত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থতত্ত্বেও একইভাবে প্রযোজ্য। যেমন: “আমি ভালো আছি,” কথাটির টোন, প্রসঙ্গ, এবং শব্দের উপর ভিত্তি করে এর অর্থ পরিবর্তিত হতে পারে।
ভাষার অনিশ্চয়তা নীতি
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে, কোনো কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে জানা অসম্ভব। ভাষাতত্ত্বেও কি এমন কোনো দেয়াল আছে? গবেষকরা বলছেন, আছে। শব্দের অর্থের ক্ষেত্রেও কাজ করে এক ধরনের অনিশ্চয়তা নীতি। একটি শব্দের আক্ষরিক অর্থ আপনি যত নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করতে যাবেন, তার ভেতরের আবেগীয় গভীরতা বা রূপক আবহ ততটাই ফিকে হয়ে আসবে।
কবিরা যখন কবিতা লেখেন, তাঁরা শব্দের অর্থের এই নমনীয়তা বা অনিশ্চয়তাকে ব্যবহার করেন। একটি স্যাটায়ার বা বিদ্রূপাত্মক বাক্যের অর্থ অভিধান দিয়ে নিখুঁতভাবে ধরা যায় না, কারণ সেখানে অর্থ এবং আবেগ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে অনিশ্চয়তার মেঘ তৈরি করে রাখে।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে যেমন অনিশ্চয়তা নীতি আছে, ঠিক তেমনি ভাষাতেও নির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণের সাথে সাথে সম্ভাব্যতা এবং ফ্লেক্সিবিলিটি কমতে থাকে। যদি আমরা শব্দের অর্থকে পুরোপুরি নির্দিষ্ট করতে চাই, তবে তার ইমোশন বা প্রসঙ্গের সূক্ষ্মতা হারিয়ে যায়। আবার যদি আমরা ফ্লেক্সিবিলিটি রাখতে চাই, নির্দিষ্ট অর্থ কিছুটা অস্পষ্ট থাকে।
একবার ভাবুন, ব্ল্যাকহোলের কথা। ব্ল্যাকহোল আলোকে সরাসরি টানে না, বরং তার চারপাশের স্থান-কাল এমনভাবে বাঁকিয়ে দেয় যে আলো আর বাইরে যেতে পারে না। এভাবে ভাষার কথাও। যখন শব্দ উচ্চারিত হয়, তার সম্ভাব্য অর্থগুলি contextual curvature বা প্রসঙ্গের বাঁক অনুযায়ী চলতে থাকে। কেউ বুঝতে পারল, কেউ পারল না, কিন্তু সম্ভাবনার তরঙ্গ স্থায়ী থাকে। যেমন ব্ল্যাকহোলের event horizon-এর মধ্যে একবার ঢুকলেই কোনো আলোর পথ নেই, তেমনি ভাষার সম্ভাব্যতা নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে নির্ধারিত হয়। তাই আমরা ভাষাকে শুধু বিশ্লেষণ করি না, বরং পর্যবেক্ষণ করি, বুঝি এবং তার মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করি।
যেমন ব্ল্যাকহোল আমাদের শেখায় মহাকর্ষ শুধু টানে না, বক্র করে পথ তৈরি করে, তেমনি কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞান শেখায় ভাষা শুধু বোঝায় না, প্রসঙ্গ, পর্যবেক্ষক এবং সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে অর্থকে রূপায়িত করে। আমাদের বাক্য, শব্দ ও অর্থ সবই একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র, যেখানে পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সময়ে ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন অর্থ তৈরি করে। এভাবেই আমরা ভাষার নতুন জগৎ কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞানের প্রবেশদ্বার পেরোতে পারি। ভাষা কেবল শব্দের সারি নয়, বরং একটি চলমান সম্ভাবনার জগৎ যেখানে অর্থ জন্ম নেয় প্রেক্ষাপট, নীরবতা, উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যার পারস্পরিক সংঘাতে। প্রচলিত ভাষাবিজ্ঞান ভাষাকে প্রায়ই স্থির কাঠামো ও নির্দিষ্ট অর্থের ভেতরে আবদ্ধ করে দেখে, কিন্তু বাস্তব ভাষা ব্যবহারে আমরা দেখি একটি বাক্য একই সঙ্গে একাধিক অর্থ বহন করতে পারে, আর সেই অর্থ নির্ধারিত হয় শ্রোতার ব্যাখ্যার মুহূর্তে। এখানেই Quantum Linguistics-এর জন্ম ও প্রয়োজন। ভাষার এই অনিশ্চিত, বহুস্তর ও পর্যবেক্ষণ-নির্ভর প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার জন্যই কোয়ান্টাম ভাষাবিজ্ঞানের জন্ম। কারণ ভাষা সবসময় নিয়ম মেনে চলে না, বরং সম্ভাবনার মধ্যেই তার আসল সত্য লুকিয়ে থাকে।

লেখক,
মনীষা রানী বিশ্বাস
ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ।
ই-মেইল: [email protected]

Leave a comment