একজন তরুণ গবেষক একদিন বলছিলেন, “আমি লিঙ্কডইনে সব দিয়েছি—প্রোফাইল, পেপার, সার্টিফিকেট। আলাদা ওয়েবসাইটের কী দরকার?” প্রশ্নটি নতুন নয়। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলই যেন পরিচয়ের সমার্থক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আপনি কি নিজের পরিচয় একটি ভাড়ার ঘরে রাখতে চান, নাকি নিজের বাড়িতে? কারণ লিঙ্কডইন, গিটহাব, রিসার্চগেট—সবই অন্যের প্ল্যাটফর্ম। আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। কিন্তু নিজের ওয়েবসাইট মানে আপনার নিজের জমি, নিজের ঠিকানা, নিজের ইতিহাস।
ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রথম ছাপ তৈরি হয় কয়েক সেকেন্ডে। গবেষণা বলছে, একজন নিয়োগকর্তা বা স্কলারশিপ রিভিউয়ার একটি প্রোফাইল বা আবেদনপত্রে গড়ে সময় দেন মাত্র ৬–৮ সেকেন্ড। এই কয়েক সেকেন্ডে আপনি আলাদা হয়ে উঠবেন কীভাবে? উত্তর একটাই—যেখানে আপনার কাজ, গল্প আর পরিচয় এক জায়গায় সাজানো আছে। একটি পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট সেই জায়গা।
আজকের চাকরি ও গবেষণার বাজার ভয়ংকর প্রতিযোগিতামূলক। লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি একটি চাকরির জন্য গড়ে আবেদন পড়ে প্রায় ২৫০–৩০০টি। এর মধ্যে কেবল ৫–৭ জন ডাক পান ইন্টারভিউতে। একইভাবে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বা পিএইচডি আবেদনেও গ্রহণযোগ্যতার হার অনেক ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের নিচে। এই বাস্তবতায় কেবল সিভি যথেষ্ট নয়। আপনার কাজকে চোখে পড়ার মতোভাবে উপস্থাপন করতে না পারলে আপনি সেই ভিড়ের আরও একজন হয়ে থাকবেন।
একটি পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট আপনাকে সেই ভিড় থেকে বের করে আনে। কারণ এতে আপনি শুধু বলেন না—আপনি দেখান। বলার চেয়ে দেখানো সবসময় শক্তিশালী। আপনি আপনার প্রজেক্ট, থিসিস, কোড, ডেটা ভিজুয়ালাইজেশন, ব্লগ—সব এক জায়গায় রাখেন। এর মানে আপনি নিজের গল্প নিজেই বলছেন, অ্যালগরিদমের ওপর ভর করে নয়। গবেষণা বলছে, যেসব প্রার্থী চাকরির আবেদনের সঙ্গে নিজেদের ওয়েবসাইট যুক্ত করেন, তাঁরা ইন্টারভিউ কল পাওয়ার সম্ভাবনা ৩০–৪০ শতাংশ বেশি পান। কারণ নিয়োগকর্তা একজন কাগজের মানুষ নয়, একজন জীবন্ত মানুষের ঝলক দেখতে চান—আর সেটি ওয়েবসাইট সবচেয়ে ভালোভাবে দেখায়।
বিশ্ব আজ গুগল-নির্ভর। আমরা কিছু জানলে খুঁজি, কাউকে চিনতে চাইলে সার্চ করি। একটি জরিপ বলছে, নিয়োগকর্তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ কোনো প্রার্থীকে ইন্টারভিউ ডাকার আগে অনলাইনে তার নাম সার্চ করেন। এখন ভাবুন, সেই সার্চে যদি আপনার নামের পাশে আপনার নিজস্ব ওয়েবসাইট না আসে, সেখানে যদি আসে অন্য কারও পোস্ট, পুরোনো কোনো ছবি, কিংবা কিছুই না—তাহলে কী বার্তা যাচ্ছে? একটি ওয়েবসাইট সেখানে কাজ করে ডিজিটাল পরিচয়পত্রের মতো। আপনি ঠিক করে দেন, মানুষ আপনাকে কীভাবে দেখবে।
এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন আসে—বিশ্বাসযোগ্যতা। মার্কেটিং গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকলে ব্যবহারকারীর কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। মানুষের মনস্তত্ত্বের দিক থেকে বিষয়টি সহজ—যে নিজের জায়গা বানাতে পেরেছে, সে সিরিয়াস। একজন গবেষক নিজের কাজের জন্য জায়গা বানাচ্ছেন—এটি একটি নীরব কিন্তু শক্ত বার্তা দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এখানে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিজেদের উপস্থাপন করার অভ্যাস কম। অথচ আজ একটি ওয়েবসাইট বানাতে খরচ পড়ে না বললেই চলে। গিটহাব পেজ, গুগল সাইট, নোশন, নেটলিফাই—ফ্রি টুল ভরপুর। বিশ্বের বড় বড় গবেষক যেটা ব্যবহার করেন, আপনার হাতেও সেটাই আছে। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, মানসিকতায়।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো—নেটওয়ার্কিং। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের অনলাইন পোর্টফোলিও থাকে, তাঁরা সহযোগিতার প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে দেড় গুণ বেশি সম্ভাবনাময়। কারণ আপনার কাজ দেখলে মানুষ বুঝতে পারে, আপনি কী পারেন। শুধু “ইন্টারেস্টেড” লিখলে কেউ সহযোগী হতে চায় না, কিন্তু একটি কাজের পাতা দেখলে সে আগ্রহী হয়।
পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট দীর্ঘমেয়াদে আপনার ক্যারিয়ার আর্কাইভ হয়ে দাঁড়ায়। আজ আপনি ছাত্র, কাল গবেষক, পরশু উদ্যোক্তা। আপনার পরিচয় বদলাবে, কিন্তু আপনার ডোমেইন একই থাকবে। এটি হয়ে উঠবে আপনার ডিজিটাল আত্মজীবনী। এখন থেকে দশ বছর পর কেউ আপনার নাম সার্চ করলে আপনার যেসব কাজ আমাকোস করবেন, সেগুলো আপনি আজই লিখতে শুরু করছেন।
তবে এখানে একটি সতর্কতা আছে। ওয়েবসাইট বানানো মানেই ভালো ওয়েবসাইট বানানো নয়। একটি অগোছালো, পুরোনো, ভাঙা লিঙ্কে ভরা সাইট আপনার ক্ষতিও করতে পারে। তাই পোর্টফোলিও মানে দায়িত্ব। আপডেট রাখা, ভুল ঠিক করা, ভাষা শুদ্ধ রাখা—এসবও পেশাদারিত্বের অংশ।
সবচেয়ে বড় কথা হলো—নিজের ওয়েবসাইট মানে নিজের স্বর। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি অ্যালগরিদমের দাস, ওয়েবসাইটে আপনি সম্পাদক। সেখানে আপনি ঠিক করেন কী শিরোনাম হবে, কোন কাজ সামনে আসবে, কোন গল্প বলা হবে। আপনার গবেষণা তখন আর একটি পিডিএফ নয়, হয়ে ওঠে একটি যাত্রা।
আজকের পৃথিবীতে দক্ষতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দৃশ্যমানতা। আপনি যতই ভালো হোন না কেন, কেউ না জানলে তার মূল্য নেই। আর জানাতে হলে কণ্ঠ দরকার, মঞ্চ দরকার। পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট সেই মঞ্চ।
প্রশ্নটা তাই আর এই নয়—“আমার ওয়েবসাইট লাগবে কি না?” প্রশ্নটা হলো—“আমি কি নিজের ভবিষ্যৎটা নিজের হাতে নিতে চাই?” যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনার ঠিকানার কাজ আজই শুরু করা উচিত।
নিজের একটি ডোমেইন নিন, নিজের গল্প লিখুন, নিজের কাজ দেখান। কারণ ডিজিটাল দুনিয়ায় পরিচয় তৈরি হয় নিজে হাতে—আর তা না করলে, অন্য কেউ আপনার হয়ে পরিচয় বানিয়ে দেবে।
আপনার কাজ আপনার কথা বলবে—যদি তাকে বলার জন্য একটি জায়গা দেন।

Leave a comment