শুরুটা কোনো স্লাইডের টাইটেল দিয়ে নয়—একটি গল্প দিয়ে। তিনশ বছর আগের দক্ষিণ এশিয়া; সমুদ্রপথে শ্রীলঙ্কা থেকে এলাচ-দারচিনি-লবঙ্গের মতো কাঠমশলা আসছে, ঝড়-দস্যু—বিপদের ভেতর দিয়ে পাড়ি দিচ্ছে; আর তার ভোক্তা মূলত রাজা-বাদশাহ বা সমাজের এলিট শ্রেণী। অথচ আজ কেমন? ঢাকার যে কোনো বাজারে, এমনকি বাড়ির নিচের দোকানেই এ মশলা হাতের নাগালেই। ড. মশিউর রহমান সেই পরিবর্তনকে বলেছেন ‘দুর্লভ থেকে সহজলভ্য হয়ে ওঠা’—যুগের পর যুগ মানুষ যে পথটা খুঁজে বের করেছে, সেই পথের নামই মূলত উন্নততর বিতরণ, উন্নততর সংগঠন, আর ধীরে ধীরে এক ধরনের ‘সাম্যাবস্থা’ তৈরি হওয়া।
এই “ভারসাম্য”-এর ধারণাটি আমাদের নিয়ে যায় প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের কাছে। ড. মশিউর বলছিলেন, মানুষের জীবনে ভালো বা কল্যাণকর পথ সাধারণত কোনো চরম অবস্থানে থাকে না; থাকে মাঝখানে—যাকে এরিস্টটল বলেছেন Golden Mean, বা মধ্যমপন্থা। এরিস্টটলের মতে, টেকসই ও মানবিক পথ হলো এই দুই চরমতার মাঝামাঝি অবস্থান—যেখানে ভারসাম্য থাকে।
এই গল্পটা তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম–এর এক সংলাপে, শিরোনাম ছিল “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ”—বাংলাদেশের তরুণদের ভাবনা, প্রশ্ন, আশা-শঙ্কার সঙ্গে মুখোমুখি হতে। তাঁর যুক্তি ছিল—যা একসময় এলিটদের জন্য সংরক্ষিত ছিল (মশলা, বই, শিক্ষা, তথ্য), প্রযুক্তি আর সময় মিলে সেটিকে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেয়। তিনি মনে করেন, আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেই ‘জ্ঞান-বিতরণের’ নতুন ধাপ।
এই লেখাটি সেই কথোপকথন/সেমিনারের পূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্টকে ভিত্তি করে একটি ধারাবাহিক ফিচার হিসেবে পুনর্লিখন।

এক বিজ্ঞানীর পরিচয়—ল্যাব, নেতৃত্ব ও বাংলা বিজ্ঞানচর্চা
ড. মশিউর রহমানকে শুধু “এআই নিয়ে বক্তা” বললে তাঁর যাত্রাপথটা খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। একদিকে তাঁর পেশাগত কাজ—ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, ক্লাউড, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি—এসবের শেকড়ে দাঁড়িয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান। অন্যদিকে তাঁর এক ধরনের সাংস্কৃতিক-জ্ঞানচর্চার আন্দোলন—বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে জনতার কাছে নিয়ে যাওয়া।
নিজের পরিচিতিতে তিনি জানান, তাঁর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা Toyohashi University of Technology–এ (ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং), আর পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি The Graduate University for Advanced Studies–এ। তাঁর কর্মজীবনের শুরুটা ছিল বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ব্যবহারযোগ্য হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যার সিস্টেম ডিজাইন, ডেটা সংগ্রহ (ডাটা অ্যাকুইজিশন) এবং রিপোর্টিং/বিশ্লেষণ অবকাঠামো তৈরি—যা বায়োমেডিক্যাল, ন্যানোটেকনোলজি, বায়োসেন্সর—এ ধরনের ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত।
সময়ের সঙ্গে তিনি নেতৃত্বশীল ভূমিকায় যান—মোবাইল অ্যাপ, ক্লাউড সমাধান, এআই, অ্যানালিটিক্স, টেলিহেলথ/ই-হেলথ, পরিধানযোগ্য ডিভাইস (wearables), আইওটি—এসব নিয়ে দল পরিচালনা ও পণ্য উন্নয়নের দিকে। বর্তমানে তিনি ওমরন হেল্থকেয়ারে ডিজিটাল হেলথকেয়ার সল্যুশনস–এ কাজ করছেন; কাজের ক্ষেত্র সিঙ্গাপুর ও জাপান–কেন্দ্রিক, এবং তিনি এশিয়া অঞ্চলে বহুজাতিক দলে নেতৃত্ব ও মেন্টরিংয়ের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন।
তাঁর জনপরিসরের আরেকটি পরিচয়—বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞানী.অর্গ। ২০১০ সালে বাংলাদেশে জাতীয় ই-কনটেন্ট ও আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পুরস্কারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছিল এই উদ্যোগ—সে সময় সংবাদমাধ্যমেও তা উঠে আসে। ড. মশিউর রহমান নিজেই বলেছেন, এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—বাংলাদেশের প্রান্তিক প্রান্ত পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকার পৌঁছে দেওয়া; ঠিক যেন “জ্ঞান-বিতরণের” অনলাইন সংস্করণ।
ক্যারিয়ার গঠন ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে তরুণদের জন্যও তিনি কাজ করেন; এ ধারার বই হিসেবে তাঁর সফল ক্যারিয়ার গড়ার উপায় প্রকাশিত হয়েছে। এই বহুমাত্রিক পরিচয়—ডিজিটাল হেলথে পেশাগত নেতৃত্ব এবং বাংলায় বিজ্ঞান-যোগাযোগ—এই দুইয়ের সংযোগবিন্দুতেই দাঁড়িয়ে তাঁর এআই-বিষয়ক কথাগুলো বাংলাদেশের তরুণদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে জ্ঞানকে ‘সম্য’ করে
ড. মশিউর রহমানের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল এক ধরনের “জ্ঞান-সম্য”—ঢাকা, হাতিয়া বা নিউ ইয়র্ক—যেখানে থাকুন না কেন, তথ্য ও শেখার সুযোগ যেন কাছাকাছি হয়ে আসে। তিনি বলেছিলেন, ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট মানুষের হাতে ‘অ্যাকসেস’ দিয়েছে—দূরে থাকা তথ্যকে কাছে এনেছে। কিন্তু ইন্টারনেটের পরের প্রশ্ন ছিল: “তথ্য তো আছে—কিন্তু বুঝব কীভাবে? খুঁজে পাব কীভাবে? নিজের প্রয়োজনমতো সাজিয়ে নেব কীভাবে?” সেই জায়গায় এআই নলেজকে “বিতরণ ও সংগঠিত” করতে পারে—এটাই তাঁর মূল যুক্তি।
এই “সাম্যাবস্থা”র ব্যাখ্যায় তিনি যে রূপক টেনেছিলেন, তা দর্শনের ভাষায় না হলেও ভৌতবিজ্ঞানের সঙ্গে সহজেই মেলে। দুই ঘর—এক ঘরে গরম, এক ঘরে ঠান্ডা; দরজা খুলে দিলে কিছু সময় পর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসে—এটাই তাপীয় সাম্যাবস্থার সহজ ছবি। এ ধারণা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘থার্মাল ইকুইলিব্রিয়াম’—তাপ আদান-প্রদানের পর এমন অবস্থা, যেখানে আর নিট তাপপ্রবাহ থাকে না।
তিনি এই যৌক্তিকতাকে সমাজেও টেনেছেন—রাজনীতি বা মতাদর্শে চরমতা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপথের দিকে টানে—এমন আশাবাদী ভঙ্গিতে। এই সামাজিক ব্যাখ্যা তর্কযোগ্য হলেও, তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল একটি: “দুর্লভকে সাধারণে পৌঁছানো”র পেছনে দীর্ঘ সময়ের প্রযুক্তিগত-সামাজিক অভিযোজন কাজ করে—এআইকেও তিনি সেই ধারায় দেখছেন।
এআই কীভাবে কাজ করে—তার ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় তিনি কয়েকটি ধাপ সামনে আনেন। ১৯৫০ সালে Alan Turing মানুষের মতো মেশিন-চিন্তার সম্ভাবনা ও “ইমিটেশন গেম”–এর কথা তোলেন—এটি পরবর্তীতে ‘টিউরিং টেস্ট’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৫৬ সালে Dartmouth College–এ “Artificial Intelligence” শব্দটি গবেষণা-প্রকল্পের শিরোনামে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়—সেটি ক্ষেত্রটিকে নতুন নাম দেয়।
ড. মশিউর রহমানের বর্ণনায় এরপর আসে বাস্তব প্রয়োগ—হাতের লেখা সংখ্যা চেনানো, পোস্ট অফিসের চিঠি সাজানো, বই স্ক্যান করে অক্ষর শনাক্ত করা। পোস্টাল ব্যবস্থায় হাতে লেখা ঠিকানা/জিপ কোড পড়তে অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (OCR) প্রযুক্তির ব্যবহার—এই ধারারই অংশ; এই প্রযুক্তির বিকাশে ১৯৬০-এর দশক থেকে মেইল প্রসেসিং অটোমেশনের ইতিহাস আছে।
তারপর ভাষা—এটাই ছিল বড় বাধা। কম্পিউটার শুধু অক্ষর পড়তে পারলে হবে না; মানুষের ভাষা বুঝতে হবে। এই প্রয়োজন থেকেই Natural Language Processing (NLP)–এর মতো ক্ষেত্র—যার লক্ষ্য, মানুষ যেভাবে কথা বলে বা লেখে, সেই ভাষাকে কম্পিউটার যেন শনাক্ত-অনুধাবন-উৎপাদন করতে পারে। তিনি বলেছিলেন—এখন আপনি কেবল “ফ্যানটা অন করো” লিখলেই (বা বললেই) অনেক স্মার্ট ডিভাইস বুঝে যায়; এটি ইন্টারনেট-অফ-থিংস (IoT)–এর সাথে মিলে ঘরের যন্ত্রকে ‘কমান্ড’ অনুযায়ী চালায়।
ভাষা, বই, উইকিপিডিয়া—এভাবে বিপুল ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত আধুনিক এআই সিস্টেম আজ এমন পর্যায়ে এসেছে যে, আপনি চাইলে William Shakespeare–এর কবিতার মধ্যে “বৃষ্টি” বিষয়ক অংশ খুঁজে দিতে বলতে পারেন; বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর লেখায় “শ্রাবণ”–সংক্রান্ত ভাবনা সাজিয়ে দিতে পারেন—ড. মশিউর রহমানের ভাষায়, জ্ঞান যেন “গুদামঘরে সাজানো” থাকে, আর দরকারমতো বেরিয়ে আসে।
এইখানেই এআইকে তিনি ইন্টারনেটের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখান: ইন্টারনেট ‘রাস্তা’ বানায়, এআই সেই রাস্তায় ‘মানচিত্র’ হাতে দেয়।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: রক্তচাপের ডাটা থেকে জীবনের সিদ্ধান্ত
এআই নিয়ে কথা বললে বাংলাদেশে অনেক সময় আলোচনা থেমে যায় “চাকরি যাবে” বা “রোবট এসে বসবে”—এ ধরনের আশঙ্কায়। ড. মশিউর রহমান বরং আলোচনা টেনে এনেছেন দৈনন্দিন জীবনের জরুরি সমস্যায়—কৃষক, রোগী, শিক্ষার্থী, লেখক—সবার হাতেই এআই কীভাবে ‘সহকারী’ হতে পারে।
কৃষিতে তাঁর উদাহরণ ছিল সহজ: মাঠের ফসলের পাতায় অস্বাভাবিক দাগ—কী রোগ? আগে একজন কৃষককে হয়তো উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে যেতে হবে বা অভিজ্ঞ কারও শরণ নিতে হবে। তাঁর মতে, এআই–সমর্থিত অ্যাপ হলে কৃষক শুধু ছবি তুলেই প্রাথমিক ধারণা পেতে পারে—এটি সময় বাঁচায়, সিদ্ধান্তকে দ্রুত করে। (এখানে অবশ্য তিনি নিজেও ইঙ্গিত করেন—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের ভূমিকা থাকবে; কারণ ভুল পরামর্শের ঝুঁকিও আছে।)
স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর বাড়তি জোর—কারণ এটিই তাঁর কাজের ক্ষেত্র। তিনি পোস্ট অফিসের চিঠি সাজানোর মতো উদাহরণ দিয়ে বোঝান: স্বাস্থ্যসেবায় ডেটা আছে প্রচুর, কিন্তু সেটি ‘সাজানো’ না হলে কাজে লাগে না। তাঁর কাজ Omron Healthcare–এর রক্তচাপ মাপার ডিভাইস থেকে পাওয়া ডেটা বিশ্লেষণ করে মানুষ কীভাবে জীবনযাপন উন্নত করতে পারে, উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে—এই ধরনের সমাধান খোঁজা।
এখানে প্রসঙ্গটা বাংলাদেশের জন্যও ভীষণ প্রাসঙ্গিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৩০–৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১৪০ কোটি প্রাপ্তবয়স্কের উচ্চ রক্তচাপ ছিল—এবং এর বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপকে প্রধান অবদানকারী ঝুঁকি-কারক হিসেবে উল্লেখ করে WHO বলছে—উচ্চ রক্তচাপ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় রক্তচাপ নিয়মিত মাপা, ডেটা দেখে ঝুঁকি বোঝা, ও জীবনযাপন বদলানো—এসবের গুরুত্ব বাড়ে।
ডিজিটাল হেলথ ইন্টারভেনশন (মোবাইল অ্যাপ/এসএমএস/রিমোট মনিটরিং)—এসব রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে—এমন ফলাফল আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সচেতনতা ও জীবনাচরণ বদলাতে mHealth–ভিত্তিক উদ্যোগের গবেষণাও আছে—যা দেখায়, উপযুক্ত নকশা ও শিক্ষা থাকলে প্রযুক্তি মানুষের আচরণে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে।
ড. মশিউর রহমানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল “রোগী-ক্ষমতায়ন”। তিনি বলেন—এআই থাকলে একজন সাধারণ মানুষ ওষুধের লেবেল স্ক্যান করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ওষুধ-ওষুধ মিথস্ক্রিয়ার (drug interactions) সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই জানতে পারে; এতে রোগী নিজের চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, সচেতন হতে পারে। যদিও তিনি আলোচনায় একটি উচ্চ সংখ্যার (ভুল ওষুধে মৃত্যুহার) উল্লেখ করেন, বৈজ্ঞানিক ও নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য যে—ওষুধ-ভুল/অসুরক্ষিত ওষুধচর্চা বিশ্বব্যাপী রোগীর ক্ষতির বড় কারণ, এবং এর আর্থিক-মানবিক ক্ষতি বিপুল।

ঝুঁকি, পক্ষপাত ও নিয়ন্ত্রণ: ডিপফেক থেকে নীতিমালা পর্যন্ত
এআইকে ড. মশিউর রহমান কোনো রূপকথার নায়ক বানাননি। বরং বারবার বলেছেন—প্রতিটি বড় আবিষ্কার “সুফল-অসুফল” একসঙ্গে নিয়ে আসে। তিনি উদাহরণ টেনেছেন—একই ছুরি দিয়ে সার্জন অপারেশন করে জীবন বাঁচাতে পারেন, আবার সেই ছুরি দিয়ে অপরাধও হতে পারে। প্রযুক্তি নিজে নৈতিক নয়; কে কীভাবে ব্যবহার করবে—সেখানেই আসল প্রশ্ন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি কয়েকটি ঝুঁকি-চ্যালেঞ্জ সামনে আনেন।
প্রথমত, “যন্ত্রপাতি ও শক্তি”—এআই চালাতে কত বড় কম্পিউটার লাগে? প্রশ্নোত্তরের অংশে তিনি একটি সহজ বিভাজন করেন: এআই তৈরি (training) আর এআই ব্যবহার (inference) এক জিনিস নয়। ট্রেনিং—অর্থাৎ ছড়ানোছিটানো আলু “গুদামঘরে সাজানো”র মতো—এটা করতে লাগে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি; সাধারণ সিপিইউ (CPU) যথেষ্ট নয়, লাগে বিশেষ ধরনের চিপ—জিপিইউ (GPU)। আধুনিক এআই প্রশিক্ষণ ও ইনফারেন্সে জিপিইউ কেন কার্যকর—তার পেছনে আছে সমান্তরাল গণনা (parallel computing)–এর সুবিধা; এনভিডিয়া নিজেই ব্যাখ্যা করে কেন জিপিইউ এ কাজে দ্রুত ও শক্তি-সাশ্রয়ী।
কিন্তু ব্যবহারকারী যে মোবাইলে প্রশ্ন লেখে, তার মোবাইলে তো সেই সুপারকম্পিউটার থাকে না। ড. মশিউর রহমান বোঝান—সেই প্রশ্ন “ক্লাউড”–এ যায়; উত্তর আসে ক্লাউডের বড় সার্ভার থেকে। এই কারণেই অনেক জনপ্রিয় এআই টুল ইন্টারনেট-নির্ভর। তবে তিনি আশার কথাও বলেন—হালকা মডেল বা লোকাল রান–এর প্রযুক্তি এগোচ্ছে; যেমন লোকাল মডেল চালাতে নানা টুল এসেছে। বর্তমানে Ollama-এর মতো সফটওয়্যারের মাধ্যমে ম্যাক, উইন্ডোজ বা লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে খুব সহজেই লোকাল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল চালানো সম্ভব। বিশেষ করে, Meta Platforms-এর উদ্ভাবিত Meta AI যখন তাদের Llama সিরিজের মডেলগুলো উন্মোচন করেছে (যেগুলোর সর্বশেষ আপডেট নিয়ে মেটার অফিসিয়াল ব্লগে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে), তখন থেকেই লোকালি এআই ব্যবহারের বিষয়টি সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, “ডিপফেক ও প্রতারণা”—তিনি বলেন, এআই–চালিত ভুয়া ভিডিও/অডিও (ডিপফেক) এমন বাস্তবসম্মত হতে পারে যে আদালতে ভিডিও সাক্ষ্য বা অনলাইন-ভিত্তিক সাক্ষ্য গ্রহণ—এসব জায়গায় সংকট তৈরি হতে পারে; নতুন আইনি কাঠামো তৈরি না হলে আস্থা নষ্ট হবে। আদালতে এআই-নির্মিত প্রমাণের ঝুঁকি নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিচারিক সংস্থা ও গবেষণায় আলোচিত হচ্ছে—কারণ “fabricated evidence” আগেও ছিল, তবে এখন তা তৈরি করা অনেক সহজ ও সস্তা।
এআই দিয়ে প্রতারণা শুধু আদালত নয়—ব্যক্তিগত জীবনেও। ড. মশিউর রহমান স্ক্যাম/ফ্রড–এর কথাও বলেন—পরিচিতজনের কণ্ঠ নকল করে সাহায্য চাওয়া, ভুয়া বার্তা—এসব চেনার জন্য নতুন ধরনের সচেতনতা দরকার। বিশ্বজুড়ে “ভয়েস ক্লোনিং”–ভিত্তিক স্ক্যামের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতাও বাড়ছে।
তৃতীয়ত, “হ্যালুসিনেশন ও ভুল তথ্য”—ড. মশিউর রহমান বলেন, এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে; তাই যাচাই করার অভ্যাস জরুরি, বিশেষ করে চিকিৎসা/আইন/উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রে। ‘এআই হ্যালুসিনেশন’ বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয়—মডেল যখন বাস্তবে নেই এমন প্যাটার্ন ধরে ভুল বা বিভ্রান্তিকর আউটপুট তৈরি করে।
চতুর্থত, “পক্ষপাত”—এটাই সম্ভবত তাঁর আলোচনার সবচেয়ে বাস্তব সতর্কতা। শ্রোতাদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এআই–এর বায়াস (bias) আসে ডেটা থেকে; আপনি যেটা দিয়ে মডেলকে শেখাবেন, মডেল সেখানকার সমাজ-ইতিহাস-সংস্কৃতির ছাপ নিয়েই উত্তর দেবে। তিনি উদাহরণ দেন—একই প্রশ্নে ভিন্ন সংস্কৃতির ডেটা থাকলে ভিন্ন ফল আসতে পারে; এমনকি ছবি আঁকার নির্দেশ দিলে (ইমেজ জেনারেশন) কারও ত্বকের রং/পেশা/ভূগোল নিয়ে পক্ষপাত ফুটে উঠতে পারে। এ ধরনের বায়াসের উদাহরণ গবেষণাতেও উঠে এসেছে—বিশেষ করে স্বাস্থ্য-শিক্ষা বা মেডিক্যাল ইমেজ–জাতীয় ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এই সব ঝুঁকি সামলাতে তিনি বারবার “দায়বদ্ধতা” শব্দটি ফিরিয়ে আনেন—ব্যবহারকারীও দায়ী, প্রতিষ্ঠানও দায়ী, রাষ্ট্রও দায়ী। এই দায়বদ্ধতার একটি বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে UNESCO–র এআই নৈতিকতার সুপারিশে মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও মানব তত্ত্বাবধান (human oversight)–এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নীতিমালা-পরিসরেও একই সুর দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক ICT Division–সম্পর্কিত খসড়া নীতিদলিলে মানবকেন্দ্রিকতা, পক্ষপাত-বিরোধী নীতি, জবাবদিহি, এবং ঝুঁকিভিত্তিক (risk-based) নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। একই নীতিতে উল্লেখ আছে—অসুরক্ষিত বিদেশি, এপিআই-নির্ভর এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ-নির্দিষ্ট ভাষা মডেল ও দেশীয় হোস্টিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া; পাশাপাশি প্রশিক্ষণ-ডেটাসেটকে “বাংলাদেশের জনমিতিক বৈচিত্র্য” প্রতিফলনকারী করতে বলা হয়েছে। নীতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তি, লেখা ও সমস্যা সমাধানের মৌলিক দক্ষতা ধরে রাখার কথাও স্পষ্টভাবে আছে—যা ড. মশিউর রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়।
সবশেষে, তিনি যে আরেকটি বড় প্রসঙ্গ এনেছেন—চিপ ও ভূরাজনীতি। প্রশ্নোত্তরে আলোচনা এসেছে “চিপ যুদ্ধ,” সেন্সরশিপ–ফিল্টারিং, সামরিক ব্যবহার—এসব নিয়ে। বিশ্বে উন্নত চিপ (বিশেষ করে এআই-উপযোগী) নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি-নীতির কড়াকড়ি, এবং প্রযুক্তি-সাপ্লাইচেইন—এগুলো এখন কৌশলগত সম্পদ; এ বিষয়ে নীতিনির্ধারক বিশ্লেষণও আছে। যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়/আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের নৈতিক ঝুঁকি নিয়ে International Committee of the Red Cross–সহ বহু সংস্থা জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের কথা বলছে।
ড. মশিউর রহমানের সার কথা, তবু—“ভয় পেয়ে থেমে যাওয়া” সমাধান নয়; সমাধান হলো নিয়ন্ত্রণ, নীতি, শিক্ষা, এবং নৈতিক বোধকে প্রযুক্তির সঙ্গে একসঙ্গে বড় করা।

ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ও তরুণদের প্রতি আহ্বান
এআই নিয়ে একটি দুশ্চিন্তা প্রায়ই শোনা যায়—“এআই এলে মানুষ বই পড়া ছেড়ে দেবে।” ড. মশিউর রহমান এই আশঙ্কাকে দেখেছেন ইতিহাসের ধারায়। একসময় হাতে কপি করা পাণ্ডুলিপিই ছিল জ্ঞানের বাহন; ছাপাখানা আসার পর অনেকে ভয় পেয়েছিল—লিপিকারদের কাজ যাবে, বই ছড়ালে ‘নিয়ন্ত্রণ’ থাকবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাপাখানাই গণশিক্ষাকে এগিয়ে নিয়েছে—এটাই তাঁর ইঙ্গিত। তিনি বলেন, এখন কাগজের বই না-ও হতে পারে—পিডিএফ, ই-বুক, স্ক্রিন—রূপ বদলাবে, কিন্তু “জানার আকাঙ্ক্ষা” মানুষকে পড়তেই টানবে।
আরেকটি জায়গায় তিনি একটি গভীর কথা বলেন—মানুষের ভাষা, কথাবার্তা, জ্ঞান আদান-প্রদান—এই ক্ষমতাই মানুষকে আজকের মানুষ করেছে। অর্থাৎ, এআই যদি তথ্য দেয়, তা হলেও ভাষা-চর্চা, বোঝার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার দক্ষতা—এসব মানুষের মধ্যেই গড়ে তুলতে হবে। এই কারণে তিনি বারবার “ব্যবহার”-কে গুরুত্ব দেন: এআইকে টুল হিসেবে ধরুন—ডাক্তার, শিক্ষক, সম্পাদক—যে ভূমিকায় আপনি তাকে বসান, সেই ভূমিকায় সে আপনাকে সহায়তা করবে; কিন্তু চূড়ান্ত বিচার-বুদ্ধি আপনারই।
ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এলে তিনি আরও সতর্ক—এআই কি “টুল” থাকবে, নাকি স্বাধীন “এন্টিটি” হয়ে উঠবে? তিনি বলেন, এজিআই (Artificial General Intelligence) নিয়ে নানা কথা শোনা যায়—কেউ ২০৩০–এর কাছাকাছি বলেন, কেউ আরও পরে; কিন্তু নিশ্চিতভাবে এগুলো “স্পেকুলেটিভ,” অর্থাৎ অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাই তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা—প্রযুক্তি বদলাবে দ্রুত, কিন্তু মৌলিক দক্ষতা (ভাষা, গণিত/যুক্তি, নৈতিকতা, বাস্তব সমস্যা বোঝা) বদলাবে না।
একজন বিজ্ঞান-যোগাযোগক ও প্রযুক্তিনেতা হিসেবে ড. মশিউর রহমান তরুণদের কাছে যে বার্তা রেখে যান, সেটিকে কয়েকটি বাক্যে ধরলে এমন দাঁড়ায়:
বাংলাদেশকে শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা (consumer) হয়ে থাকলে চলবে না; বাংলা ভাষায় জ্ঞান-ডেটা তৈরি, স্থানীয় সমস্যা-সমাধান, এবং ন্যায্য-স্বচ্ছ প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে—তবেই “হাতিয়া–ঢাকা–নিউ ইয়র্ক”–এর জ্ঞান-দূরত্ব সত্যিই কমবে।
শেষ পর্যন্ত এই ফিচারের শুরুতে ফিরতেই হয়—এলাচের গল্পে। তিনশ বছর আগে এলাচ ছিল ক্ষমতার প্রতীক; আজ সেটি রান্নাঘরের সাধারণ উপকরণ। ড. মশিউর রহমান দেখাতে চান, জ্ঞানও তেমনই—যদি আমরা বিতরণব্যবস্থা উন্নত করি, ভাষাকে শক্তিশালী করি, নীতিকে জবাবদিহিমুখী করি, এবং প্রযুক্তিকে নৈতিকতার সঙ্গে বেঁধে ফেলি।
এই পথচলায় তাঁর নিজের জীবনও এক ধরনের প্রতীক—জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার পণ্য ও ডেটা নিয়ে কাজ, আর একই সঙ্গে বাংলায় বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার নিরন্তর চেষ্টা। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এতে একটাই বড় প্রেরণা আছে: বিশ্বমানের বিজ্ঞানচর্চা ‘অন্য দেশের ব্যাপার’ নয়—জন্মভূমির ভাষা, মানুষের সমস্যা, আর বিশ্বজ্ঞান—এই তিনকে একসঙ্গে ধরে রাখতে পারলেই বিজ্ঞান হয়ে ওঠে জাতীয় গর্বের উৎস, এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার।
লিংক: বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম এর ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/BangladeshStudyForum/photos
অনুষ্ঠানটি ৭ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের উদ্দ্যোগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র ঢাকাতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান আলোচক হিসাবে ছিলেন ড. মশিউর রহমান।

Leave a comment