একসময় পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকত নিয়ম-কানুন। পকেটে যদি ছোট্ট কোনো ক্যালকুলেটরও পাওয়া যেত, সঙ্গে সঙ্গে সেটি বাজেয়াপ্ত হতো। কারণ, ধারণা ছিল—গণিতের জটিল হিসাব হাতে করলেই কেবল “আসল” দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ অনেক পরীক্ষায় ক্যালকুলেটরের ব্যবহার অনুমোদিত। কারণ পরীক্ষকরা বুঝেছেন, দীর্ঘ ও যান্ত্রিক গাণিতিক হিসাব কষা দক্ষতার প্রমাণ নয়; বরং সঠিক পদ্ধতি ও যুক্তি প্রয়োগ করাই আসল বিষয়। সংখ্যাগণনার যান্ত্রিক বোঝা মেশিনের কাঁধে চাপিয়ে দিলে পরীক্ষার্থী নিজের মেধা সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে পারে।
এভাবেই পরীক্ষার আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে ওপেন-বুক পরীক্ষা আকারে। একসময় পরীক্ষার হলে বই বা নোট আনা ছিল ‘অপরাধ’। কিন্তু এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাগত পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদেরকে রেফারেন্স বই সঙ্গে আনার অনুমতি দেওয়া হয়। যুক্তি স্পষ্ট—শুধু মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর না করে, প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা, সঠিকভাবে ব্যবহার করা ও সমাধান বের করাই আসল দক্ষতা। কর্মক্ষেত্রেও তো এমনটাই হয়—যেখানে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, আইনজীবী কিংবা গবেষকরা প্রতিনিয়ত বই, ডাটাবেস ও অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করেন।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে আমরা এখন এক নতুন দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। ক্যালকুলেটরের মতোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—যেমন ChatGPT বা অন্যান্য এআই সহায়ক টুল—শিক্ষা ও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে জায়গা করে নিতে পারে। অনেকের কাছে এটি হয়তো ‘অতিরিক্ত সাহায্য’ মনে হতে পারে, কিন্তু ভাবুন তো—যখন তথ্য অনুসন্ধান, ভাষা রূপান্তর, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা লেখনী তৈরির মতো কাজ মুহূর্তে করা সম্ভব, তখন পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই টুলগুলো ব্যবহার করে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করা।
এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি কর্মক্ষেত্রের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও। সম্প্রতি মেটা (Meta) তাদের প্রোগ্রামার নিয়োগ পরীক্ষায় “ভাইব কোডিং” (Vibe Coding) পদ্ধতি চালু করেছে। এতে প্রার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুল—যেমন ChatGPT বা GitHub Copilot—ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়। যুক্তি হলো, আসল কাজের সময় যেভাবে ইঞ্জিনিয়াররা এ ধরনের টুল ব্যবহার করেন, পরীক্ষাতেও যেন সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়। সিইও মার্ক জাকারবার্গ এমনকি বলেছেন, ভবিষ্যতে মেটার অধিকাংশ কোডই এআই লিখবে।
এই পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ আছে। সমর্থকেরা বলছেন, এখানে মূল পরীক্ষা হলো—আপনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে এআইকে কাজে লাগাতে পারেন। সমালোচকেরা আবার সতর্ক করছেন—এতে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হতে পারে যারা নিজেরাই এআই-এর ভুল ঠিক করতে পারবে না। প্রোগ্রামিং জগতে এই প্রবণতাকে অনেকে বলছেন ভাইব কোডিং—যেখানে প্রোগ্রামার নিজের বোঝাপড়া না বাড়িয়ে শুধু এআই-এর সাজেশন নিয়ে কাজ চালিয়ে যান।
ভাবুন, একই ধারণা যদি আইন পেশার নিয়োগে ব্যবহার হয়—যেখানে নবীন আইনজীবীরা “হার্ভি” (Harvey)-এর মতো এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে জটিল কেস বিশ্লেষণ করেন। তখন আসল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে—আপনি কি এআইকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে প্রাসঙ্গিক ও নির্ভুল উত্তর বের করতে পারেন, নাকি শুধু “ভাইব” করেই এগোচ্ছেন?
শিক্ষা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের বিষয়টি আসলে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সঙ্গে আসবে নতুন চ্যালেঞ্জ—প্রশ্নপত্র এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে সরাসরি উত্তর না পাওয়া যায়; বরং পরীক্ষার্থীকে এআই-এর আউটপুট যাচাই করতে, প্রাসঙ্গিকভাবে সম্পাদনা করতে এবং নিজের যুক্তি দিয়ে সমাধান সাজাতে হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে এসেছে সংশয়, তারপর ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা। ক্যালকুলেটর একসময় যেমন ‘চিটিং’ বলে ধরা হতো, পরে তা হয়ে উঠেছে অপরিহার্য, তেমনি ভবিষ্যতের কোনো একদিন হয়তো ChatGPT বা অনুরূপ এআই টুল পরীক্ষার হলে বসে থাকবে পরীক্ষার্থীর পাশেই—ঠিক যেমন পেনসিলবক্স বা ক্যালকুলেটর থাকে আজ। তখন পরীক্ষার উদ্দেশ্য হবে একটাই—আপনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তিকে নিজের জ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
প্রশ্নটি তাই আজ আর ‘এআইকে পরীক্ষায় ঢুকতে দেওয়া উচিত কি না’—এই সীমায় আটকে নেই। বরং প্রশ্নটি হচ্ছে, আমরা কি প্রস্তুত আছি এমন একটি শিক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির জন্য, যেখানে মানুষ ও মেশিন একসঙ্গে কাজ করবে, আর আসল দক্ষতা হবে সেই সমন্বয়ের কৌশল?

Leave a comment