চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

সকালে না খাওয়া, দুপুরে জাঙ্ক : একটা প্রজন্মের খাদ্যচিত্র

Share
Share

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ঢোকেনি। হোস্টেলের করিডোরে ভেজা গন্ধ, রাতের জমে থাকা ঘাম, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর বাসি খাবারের গন্ধ মিশে আছে বাতাসে। এক কোণে রাখা প্লাস্টিকের বালতিতে কাল রাতের প্লেট, চামচ এখনো ধোয়া হয়নি। রুমের ভেতরে ছয়জনের মধ্যে তিনজন ঘুমাচ্ছে, দুজন মোবাইল স্ক্রিনে মুখ গুঁজে আছে, আর একজন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র চুপচাপ উঠে বসেছে। তার নাম মহসিন। সে জানে, আজও সকালে নাস্তা করা হবে না। শুধু না খেয়ে থাকা নয়, আসলে হোস্টেলে সকালে খাওয়ার মতো কিছু নেই। মেস আছে, কিন্তু সকালের খাবার বলতে আগের রাতের ভাত গরম করে নেওয়া যেটা সে আর পারে না।

মহসিন মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়ে। ক্লাস আটটায়। পেটে হালকা মোচড়, কিন্তু সে এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে। বাসস্ট্যান্ডের পাশে এক কাপ চা আর একটা কেক এই হলো তার ব্রেকফাস্ট। ক্ষুধা কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে যায়, কিন্তু শরীর নয়। মস্তিষ্ক তখনো অপেক্ষায় থাকে গ্লুকোজের জন্য। ক্লাসে বসে সে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। স্যার বোর্ডে যা লেখান, সেটা চোখে পড়ে, মাথায় ঢোকে না। সে জানে না, না খেয়ে থাকার কারণে তার কর্টিসল হরমোন বাড়ছে, সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অ্যাক্টিভ হয়ে আছে, আর তার ব্রেইন এখন শেখার জন্য সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়।

দুপুরে ক্ষুধা আর দেরি করে না। ক্লাস শেষ হতেই সে আর বন্ধুরা বেরিয়ে পড়ে। কলেজের পাশের সেই চিরচেনা হোটেল ঝাঁঝালো গন্ধ, কালচে তেল, অর্ধেক ধোয়া প্লেট। ভাত, ডাল, ভাজি, ডিম বা মুরগির ঝোল। খাবারটা খারাপ নয়, কিন্তু তেলটা কয়বার ব্যবহার করা হয়েছে কেউ জানে না। লবণ বেশি, সবজি কম, ফাইবার প্রায় নেই। খাওয়ার সময় সে তৃপ্তি পায়, কারণ শরীর অবশেষে ক্যালরি পেয়েছে। কিন্তু এই তৃপ্তি খুবই প্রতারণামূলক।

এই একবেলার খাবার দিয়ে মহসিনের শরীর সারাদিনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে না। সকালে না খেয়ে থাকার ফলে যে হাইপোগ্লাইসেমিক স্ট্রেস তৈরি হয়েছিল, সেটা দুপুরে হঠাৎ ভারী খাবার খেয়ে আরও খারাপ হয়। ইনসুলিন হঠাৎ বেড়ে যায়, ব্লাড সুগার দ্রুত ওঠানামা করে। এই প্যাটার্ন যদি মাসের পর মাস চলে, শরীর ধীরে ধীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের দিকে যায় যেটা বাংলাদেশে তরুণ বয়সেই ডায়াবেটিস বাড়ার বড় কারণ।

মহসিনের গল্পটা আলাদা নয়। বাংলাদেশের প্রায় সব হোস্টেল, মেস, এমনকি শহরের অনেক ভাড়া বাসায় থাকা শিক্ষার্থীদের জীবনচিত্র প্রায় একই। সকালে সময় নেই, সুযোগ নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা: সচেতনতার অভাব। আমরা ভাবি, “এখন তো বয়স কম, পরে ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু শরীর বয়স দেখে হিসাব করে না। সে অভ্যাস দেখে সিদ্ধান্ত নেয়।

বাহিরের খাবার নিয়মিত খাওয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় হজমতন্ত্রে। আমাদের দেশের স্ট্রিট ফুড বা ছোট হোটেলগুলোতে খাবার তৈরিতে যে পানি ব্যবহার হয়, তার মান প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক সময় সেই পানি সরাসরি ওয়াসার লাইন বা পুকুরের। এর ফলে শরীরে ঢোকে ই-কোলাই, সালমোনেলা, শিগেলা যেগুলো একদিনে বড় অসুখ তৈরি না করলেও দীর্ঘদিনে গাটের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়া ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। মহসিনের মাঝেমধ্যেই পেট ফাঁপে, গ্যাস্ট্রিক হয়, কিন্তু সে এটাকে কলেজ লাইফের অংশ মনে করে।

এই গাট সমস্যার প্রভাব শুধু পেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান পরিষ্কারভাবে জানে  গাট আর ব্রেইন সরাসরি সংযুক্ত। যাকে বলা হয় gut–brain axis। এটা নিয়ে ছোট্ট করে আগেও একটি আর্টিকেল লিখেছিলাম; তাই ডিটেইলস বলছি না। দীর্ঘদিন জাঙ্ক ও অপরিষ্কার খাবার খেলে সেরোটোনিন উৎপাদন কমে যায়। ফলে মুড খারাপ থাকে, অল্পতেই বিরক্ত লাগে, ঘুম ঠিক হয় না। মহসিন টের পায় সে আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। পড়াশোনার চাপ না থাকলেও অকারণে ক্লান্ত লাগে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটা বড় সমস্যা হলো খাবারের ভেজাল। বাহিরের খাবারে রঙ, টেস্টিং সল্ট, অতিরিক্ত মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এগুলো স্বল্পমেয়াদে স্বাদ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর চাপ ফেলে। আমাদের দেশে তরুণ বয়সে ফ্যাটি লিভার, উচ্চ ইউরিক এসিড, এমনকি হাইপারটেনশন বাড়ার পেছনে এই খাদ্যাভ্যাস বড় ভূমিকা রাখে।

এই পরিস্থিতি কি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা? না। এটা একটা সামাজিক কাঠামোর সমস্যা। হোস্টেলগুলোতে পুষ্টিকর সকালের খাবার নেই, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যান্টিনগুলো স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের চেয়ে লাভের কথা বেশি ভাবে, আর পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো গাইডলাইন থাকে না। আমরা পরীক্ষার রুটিন বানাই, ক্লাস রুটিন বানাই কিন্তু খাওয়ার রুটিন বানাই না।

সমাধান অসম্ভব কিছু না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় প্রভাব ফেলতে পারে। হোস্টেল বা মেসে সপ্তাহে কয়েকদিন হলেও সকালের সহজ নাস্তা – খিচুড়ি, ডিম, কলা, রুটি এই জিনিসগুলো চালু করা যায়। কলেজ ক্যান্টিনে স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য ন্যূনতম নীতিমালা থাকা দরকার। শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে, সকালে এক কাপ চা দিয়ে দিন শুরু করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

মহসিনের জীবনেও একসময় পরিবর্তন আসে। হয়তো হঠাৎ কোনো বড় অসুখে নয়, বরং একদিন আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখ দেখে। সে ধীরে ধীরে সকালে একটা কলা, সিদ্ধ ডিম যোগ করে। দুপুরে বাইরের খাবার খেলেও রাতের খাবার হালকা রাখে। এই ছোট সিদ্ধান্তগুলোই ধীরে ধীরে তার শরীরকে ফিরিয়ে আনে।

এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ভয় দেখানো নয়। বরং একটা বাস্তব আয়না দেখানো। বাহিরের খাবার আমাদের জীবনের অংশ থাকবে, কিন্তু সেটা যদি অভ্যাস হয়ে যায়, তাহলে তার মূল্য দিতে হয় শরীর দিয়ে, মন দিয়ে, ভবিষ্যৎ দিয়ে।

আজকের কলেজপড়ুয়া মহসিন ই আগামী দিনের কর্মজীবী নাগরিক। তার প্লেটে কী আছে, সেটাই ঠিক করবে সে আগামী বিশ বছরে কতটা সুস্থ থাকবে।
 খাবার একটা সাধারণ বিষয় মনে হলেও, আসলে এটা জীবনের সবচেয়ে নীরব কিন্তু শক্তিশালী সিদ্ধান্তগুলোর একটি।


মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org