১৯১৯ সালের নভেম্বরে Scientific American-এর পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল এক ভবিষ্যদ্বাণী—ঘোড়ার কর্মজীবন প্রায় শেষের পথে। তখনও শহরের রাস্তায়, খামারের মাঠে কিংবা গাড়ি টানার কাজে ঘোড়াই ছিল প্রধান শক্তি। অথচ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মোটরগাড়ি, ট্রাক আর ট্রাক্টরের আগমনে এ ‘নোবেল প্রাণী’র প্রয়োজনীয়তা হঠাৎ করেই হ্রাস পেতে শুরু করল। প্রকাশিত লেখাটির ভাষায়, “ঘোড়ার দিন শেষ হতে চলেছে। গাড়ি ঘোড়ার জায়গা নিচ্ছে, ট্রাক প্রতিস্থাপন করছে মালবাহী ঘোড়াকে, আর ট্রাক্টর খামারের ঘোড়াকে করছে অপ্রয়োজনীয়।”
এক সময় মানুষের সভ্যতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর ছিল ঘোড়া। পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষিকাজ, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও তার ছিল অপরিসীম ভূমিকা। কিন্তু প্রযুক্তির গতিপথে দাঁড়িয়ে মানুষ উপলব্ধি করল, যান্ত্রিক শক্তি কেবল দ্রুততর নয়, বরং সস্তা ও কার্যকরও বটে। তাই ঘোড়ার কষ্টকর শ্রম থেকে মুক্তির কথাই তখন আলোচনায় উঠে আসে। লেখাটিতে বলা হয়েছিল, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে আনন্দের খবর হিসেবেই দেখা উচিত—কারণ ঘোড়া আর বাধ্য হবে না সারাজীবন দাসত্বে শ্রম দিতে।
তবু অর্থনৈতিক বাস্তবতাই ছিল মূল চালিকাশক্তি। মেশিন ঘোড়ার চেয়ে বহুগুণ দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, আর খরচও কম পড়ে। কৃষিক্ষেত্রে ট্রাক্টরের ব্যবহার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ফসল ফলানোর ধরনই পাল্টে দেয়। শহরের রাস্তায় গাড়ি ও ট্রাকের দাপটে ঘোড়ার গাড়ি অচিরেই বিরল দৃশ্য হয়ে ওঠে। ১৯২০ সালের জানুয়ারির মধ্যে অন্তত অর্ধেক ঘোড়াকে ‘ছাঁটাই’ করা হবে—এই পূর্বাভাসই দেওয়া হয়েছিল তখন।
আজ এক শতাব্দী পরে এই লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কখনোই কেবল নতুন যন্ত্রের আবিষ্কার নয়; বরং সেটি পুরো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেই পাল্টে দেয়। যেভাবে তখন ঘোড়া অচল হয়ে পড়েছিল, আজ হয়তো সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে অন্য কোনো পেশা বা দক্ষতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয়তার যুগে অনেক কাজই মানুষের হাতছাড়া হতে চলেছে। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার থেকে শুরু করে ড্রাইভার কিংবা কনটেন্ট লেখক—অসংখ্য পেশাই প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
তবে ঘোড়ার কাহিনি আমাদের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যখনই কোনো প্রযুক্তি পুরনোকে প্রতিস্থাপন করে, তখন মানুষের আবেগ ও বাস্তবতার মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়। আমরা ঘোড়ার শ্রম থেকে মুক্তির বিষয়টিকে যেমন মানবিক অগ্রগতি বলে মেনে নিয়েছিলাম, তেমনি এখনো আমাদের উচিত প্রযুক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপিত মানুষদের জন্য সমাধান খোঁজা। ঘোড়ার ক্ষেত্রে যান্ত্রিক শক্তি তার স্থান দখল করেছিল; কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে দরকার পুনঃপ্রশিক্ষণ, দক্ষতার পরিবর্তন এবং নতুন কর্মক্ষেত্রের সুযোগ সৃষ্টি করা।
১৯১৯ সালের সেই নিবন্ধ পড়ে মনে হয়, ইতিহাস বারবার একই কাহিনি নতুন রূপে উপস্থাপন করে। ঘোড়ার ছাঁটাই আসলে ছিল প্রযুক্তি ও মানবসমাজের সম্পর্কের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা সেই প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাচ্ছি। তখন যেভাবে আধুনিক যন্ত্র মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছিল, আজও তেমনভাবেই এআই আমাদের নতুন এক দিগন্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি প্রস্তুত সেই পরিবর্তনের জন্য, নাকি ঘোড়ার মতোই একদিন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেব?


Leave a comment