মানুষের শরীরের ভেতরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর এক গবেষণায়। ড. ভেরোনিকা মাগডাঞ্জের নেতৃত্বে একদল গবেষক তৈরি করেছেন ক্ষুদ্র এক চৌম্বক রোবট, যা সরাসরি মূত্রনালীতেই কিডনির পাথর গলিয়ে দিতে পারে। এ যেন সায়েন্স ফিকশনের কল্পনা থেকে উঠে আসা এক বাস্তব প্রযুক্তি—যেখানে কোনো অস্ত্রোপচার নেই, নেই দীর্ঘমেয়াদি কষ্টকর চিকিৎসা, বরং শরীরের ভেতরেই নীরবে কাজ করে যাচ্ছে ক্ষুদ্র এক যন্ত্র।
কিডনির পাথর মানবজাতির কাছে দীর্ঘদিনের এক দুঃসহ সমস্যা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও কিডনির পাথর একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। খাবারের ধরন, পানি পানের অভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, এমনকি বংশগত কারণেও মানুষ সহজেই এ রোগে আক্রান্ত হয়। পাথর যখন মূত্রনালীতে আটকে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে অসহনীয় যন্ত্রণা, যা অনেক সময় জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। প্রচলিত চিকিৎসায় ওষুধ দিয়ে মূত্রকে পাতলা রাখা, ব্যথা কমানো কিংবা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পাথর অপসারণ করা হয়। কিন্তু এসব সমাধান হয় সীমিত, নয়তো ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়সাপেক্ষ। তাই চিকিৎসক ও গবেষকেরা বহুদিন ধরেই এমন এক উপায়ের খোঁজ করছিলেন, যা হবে কম আক্রমণাত্মক, কার্যকর ও রোগীর জন্য আরামদায়ক।
এই প্রেক্ষাপটে ওয়াটারলুর গবেষকদের উদ্ভাবন যেন আশার আলো হয়ে আসে। তাদের তৈরি রোবটটি মাত্র এক সেন্টিমিটার লম্বা এক টুকরো ফিতের মতো সরঞ্জাম, যা দেখতে হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের চিকিৎসা। এটি তৈরি করা হয়েছে হাইড্রোজেল ও ইলাস্টোমার নামের নমনীয় উপাদান দিয়ে। এর ভেতরে রাখা হয়েছে ইউরিয়েজ নামের এক বিশেষ এনজাইম, সাথে সংযুক্ত ক্ষুদ্র এক চৌম্বক। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্য—জৈবিক এনজাইম ও চৌম্বকীয় নিয়ন্ত্রণ—একসাথে কাজ করে কিডনির পাথর ভাঙতে।
চিকিৎসকেরা ক্যাথেটারের মাধ্যমে রোগীর মূত্রথলিতে এই রোবটটি প্রবেশ করান। বাইরে থেকে একটি রোবোটিক বাহু, যার সাথে ঘূর্ণায়মান চৌম্বক লাগানো থাকে, সেটি দিয়ে রোবটটিকে পরিচালনা করা হয়। রোগীর শরীরের বাইরের দিকে আরেকটি চৌম্বক প্যাচ রোবটটিকে সঠিক স্থানে স্থির রাখতে সাহায্য করে। একবার যখন এটি পাথরের কাছে পৌঁছে যায়, তখনই শুরু হয় এর প্রকৃত কাজ। ইউরিয়েজ এনজাইম মূত্রের অম্লত্ব কমিয়ে আনে, অর্থাৎ মূত্রের পিএইচ মান বাড়িয়ে এটিকে ক্ষারীয় করে তোলে। এর ফলে ইউরিক অ্যাসিড ধরনের কিডনির পাথর আস্তে আস্তে গলতে শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যে বড় পাথর ভেঙে ছোট ছোট টুকরোয় পরিণত হয়, যা শরীরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতেই বের হয়ে আসে।
গবেষণাগারে পরীক্ষার সময় দেখা গেছে, এই রোবট মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে মূত্রের পিএইচ ৬ থেকে ৭-এ উন্নীত করতে পেরেছে। এর ফলে পাথরের ওজন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এত অল্প সময়ে এমন ফল পাওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য এক অসাধারণ অর্জন। সাধারণত বড় কিডনির পাথর চিকিৎসার জন্য শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি বা অস্ত্রোপচার করতে হয়, যেখানে খরচ, ঝুঁকি এবং পরবর্তী জটিলতা—সবই রোগীর জন্য এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ক্ষুদ্র রোবটের ক্ষেত্রে এসব কিছুই প্রয়োজন নেই।
অবশ্য এখানেই গবেষণা থেমে নেই। বিজ্ঞানীরা এখন বড় প্রাণীর ওপর পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লক্ষ্য হলো বাস্তব শারীরিক অবস্থায় রোবটটির কার্যকারিতা যাচাই করা। পাশাপাশি উন্নত করা হচ্ছে এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যাতে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে রোবটটিকে সঠিকভাবে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া যায়। সবকিছু ঠিকমতো হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এটি হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার শুরু হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোবটের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। অস্ত্রোপচারে রোবোটিক হাত বা ন্যানো-টেকনোলজি ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ ধ্বংসের প্রচেষ্টা আমরা আগেই দেখেছি। কিন্তু কিডনির মতো সংবেদনশীল অঙ্গের জটিল সমস্যায় এ ধরনের ক্ষুদ্র রোবটের ব্যবহার নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায়। এটি কেবল এক প্রযুক্তি নয়, বরং চিকিৎসার দর্শনকেই পাল্টে দিতে পারে—যেখানে চিকিৎসা হবে কম আক্রমণাত্মক, বেশি নির্ভুল এবং রোগীর জন্য অনেক বেশি আরামদায়ক।
বাংলাদেশের মতো দেশে এ ধরনের প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের দেশে এখনও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে, আর কিডনির রোগের হার তুলনামূলক বেশি। উন্নত দেশগুলোতে প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে পড়লে, একদিন হয়তো আমরাও এর সুফল পাব। হয়তো কোনো দিন ঢাকার কোনো হাসপাতালে একজন ডাক্তার রোগীকে আশ্বস্ত করে বলবেন—“অস্ত্রোপচারের দরকার নেই, আমরা এখন চৌম্বক রোবট ব্যবহার করব।” রোগীর মনে তখন ভর করবে স্বস্তি, আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।
কিডনির পাথরের চিকিৎসা দীর্ঘদিন ধরেই ভয়ের নাম। ব্যথার যন্ত্রণা, চিকিৎসার ঝুঁকি, খরচ—সব মিলিয়ে রোগীরা এক দুঃসহ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যান। কিন্তু যদি এই ক্ষুদ্র রোবট কার্যকরভাবে মানুষের শরীরে কাজ করতে পারে, তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার এক বিপ্লব ঘটবে। এ হবে এমন এক যুগের সূচনা, যেখানে চিকিৎসা শুধু কার্যকরই হবে না, হবে মানবিকও।
বিজ্ঞান প্রতিদিন আমাদের সীমাবদ্ধতা ভেঙে এগিয়ে নিচ্ছে। অদৃশ্য জগতে ক্ষুদ্র যন্ত্র তৈরি করে মানবদেহের ভেতরে বড় সমস্যার সমাধান করা—এমন কিছুর কথা একসময় কেবল গল্প-উপন্যাসেই পাওয়া যেত। আজ তা হয়ে উঠছে বাস্তব। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর এই গবেষণা সেই স্বপ্নকেই ছুঁতে চলেছে।
কিডনির পাথরের বিরুদ্ধে এই ক্ষুদ্র চৌম্বক রোবট তাই কেবল একটি চিকিৎসা প্রযুক্তিই নয়, বরং মানব সভ্যতার নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রতীক—যেখানে যন্ত্র ও এনজাইম একসাথে কাজ করে মানুষের কষ্ট লাঘব করছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান সবসময়ই মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য, যন্ত্রণা কমানোর জন্য, আর মানবিক ভবিষ্যত নির্মাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

Leave a comment