প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিক কী?
প্রোবায়োটিক হলো প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া, যা দই এবং কিছু চাষকৃত খাবারে থাকে। এগুলো অন্ত্রে গিয়ে ভালো এবং খারাপ ব্যাকটেরিয়ার সুষ্ঠু ভারসাম্য রক্ষা করে, ফলে হজম তন্ত্র সুস্থ থাকে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। আর প্রিবায়োটিক হলো এমন ধরনের খাবারের আঁশ বা উপাদান যা এ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার “খাবার” হিসেবে কাজ করে। সহজভাবে, প্রোবায়োটিক হল ভালো ব্যাকটেরিয়া নিজে, আর প্রিবায়োটিক হল তাদের বৃদ্ধিতে সহায়ক খাদ্যউপাদান।
দইয়ের প্রোবায়োটিকের স্বাস্থ্যগুণঃ
দইয়ের প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া (যেমন ল্যাকটোব্যাসিলাস, বিফিডোব্যাকটেরিয়া) নিয়মিত সেবন করলে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যায়। প্রধান কিছু উপকারিতা হলো:
- পাচনে সহায়তা: দইয়ের প্রোবায়োটিকগুলি হজমে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো অন্ত্রে থাকা প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ফলস্বরূপ গ্যাস-ফাঁপা, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যা লাঘব হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি সমীক্ষায় প্রোবায়োটিক গ্রহণে অন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়, গ্যাস্ট্রিক ট্রানজিট টাইম (খাদ্যের অন্ত্র পার হওয়ার সময়) ১২.৪ ঘণ্টা কমিয়ে এনে সপ্তাহে বর্ধিত পায়খানার সংখ্যা এবং নরম মল তৈরি করতে সহায়তা করেছে। তাই নিয়মিত দই খেলে পেট পরিষ্কার থাকে এবং হজমরীতির সমস্যা কমে।
- রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: দইয়ের প্রোবায়োটিক শরীরের রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোবায়োটিক সেবন করলে শরীর সাধারণ সর্দি-কাশি বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে ভালোভাবে লড়াই করতে পারে। Mayo Clinic-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নিয়মিত প্রোবায়োটিক গ্রহণে সর্দি-কাশি এবং ফ্লুর মতো সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায় এবং সংক্রমণ ধরলে উপসর্গের তীব্রতা ও সময়কাল কমে। এ ছাড়া, দইয়ে থাকা ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-বি এবং ভিটামিন-ডি ইত্যাদি পুষ্টিতে শরীরের ইমিউন সিস্টেম আরও শক্তিশালী হয়।
- মানসিক স্বাস্থ্যে সহায়তা: অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে (‘গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’ বলে পরিচিত)। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচুর ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকলে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের লক্ষণগুলো কমতে পারে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসম্মত অন্ত্রের কারণে মানসিক চাপ ও মেজাজ উন্নত থাকে। কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে নিয়মিত প্রোবায়োটিক সেবন করে হতাশা ও উদ্বেগ কমে। ফলে দইয়ের মতো প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার মানসিক সুস্থতা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
- ত্বকের স্বাস্থ্য ও চর্মরোগ নিয়ন্ত্রণ: অন্ত্রের সুস্থ ব্যাকটেরিয়া ত্বকের অবস্থার সাথেও সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোবায়োটিকগুলো অন্ত্রে প্রদাহ কমিয়ে এবং রোগপ্রতিরোধী সিস্টেমকে সহযোগিতা করে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একাধিক সমীক্ষায় লক্ষ করা গেছে প্রোবায়োটিক সেবনে একজিমা (ত্বকের খোসাঘসা, চুলকানি) হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং রোগের তীব্রতা হ্রাস পায়। এর কারণ হলো ভালো ব্যাকটেরিয়া প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ত্বকের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে নিয়মিত দই খেলে ত্বকেও উপকারী ফল হতে পারে, যেমন একজিমা বা চর্মের প্রদাহজনিত সমস্যা কিছুটা হ্রাস পাওয়া।
সারমর্মে, দইয়ের প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা এবং ত্বকের যত্নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দইয়ের জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া হজমের সমস্যা কমাতে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে। তাই দৈনন্দিন খাদ্যে পরিমিত দই বা অন্যান্য ফারমেন্টেড খাবার রাখলে স্বাস্থ্যে অনেক লাভ পাওয়া সম্ভব। তবে সবসময় মনে রাখতে হবে, পরিমিতিই সব ভালো; অতিরিক্ত কিছু খাবার নিয়ন্ত্রণবিহীন হয়ে গেলে উপকারের পরিবর্তে সমস্যা হতে পারে। বিশ্বস্ত সূত্র এবং গবেষণার পরামর্শে, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক দুটোই কাজে লাগিয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যবতী জীবন নিশ্চিত করে।
তথ্যসূত্র:
দই এবং প্রোবায়োটিক সম্পর্কিত স্বাস্থ্যগবেষণা ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশনা অনুযায়ী উদ্ভাসিত তথ্যসমূহ।
মোঃ ফাহাদ হুসাইন
শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজ, পাবনা।

Leave a comment