চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

স্বাস্থ্য সেক্টরের নির্বাচনী কাঠামো: কোথায় ভুল করছি আমরা

Share
Share

স্বাস্থ্য সেক্টর কোনো সাধারণ চাকরির ক্ষেত্র নয়। এখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি অসম্পূর্ণ জ্ঞান, কিংবা একটি আবেগহীন হাত সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। অথচ আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে এই সেক্টরে প্রবেশের প্রধান ফিল্টারটাই ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

আজ প্রশ্নের মান এতটাই নিম্নমুখী যে, গভীর প্রস্তুতি নেওয়া, বিষয়ভিত্তিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা, কিংবা দীর্ঘদিনের একাগ্র পরিশ্রম সবই অনেক সময় মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। বরং যিনি তুলনামূলকভাবে নড়বড়ে প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষার হলে শুধু ‘মাথার নার্ভ ধরে রাখতে’ পারেন, তিনিই টিকে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা শুধু একজন পরীক্ষার্থীর ব্যর্থতা নয় এটা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।

সমস্যাটা কোথায়?

প্রশ্ন যখন জ্ঞানের গভীরতা যাচাই না করে, বরং কৌশল, অনুমান আর মানসিক চাপ সামলানোর দক্ষতাকে বেশি পুরস্কৃত করে তখন স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনের দর্শন বদলে যায়। এখানে আর সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি নয়, বরং সবচেয়ে “পরিস্থিতি-সামাল দেওয়া” ব্যক্তি এগিয়ে যায়। কিন্তু একজন ভালো পরীক্ষার্থী আর একজন ভালো ডাক্তার এই দুইয়ের মাঝে যে মৌলিক পার্থক্য আছে, সেটাই আমরা ভুলে যাচ্ছি।

এর ফল কী হচ্ছে?

যারা সত্যিকার অর্থে এই পেশার প্রতি প্যাশনেট, যারা রাতের পর রাত পড়েছে এই ভেবে যে ভবিষ্যতে একজন মানুষের কষ্ট লাঘব করবে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। আর অন্যদিকে, যারা এই পেশাকে বেছে নিচ্ছে শুধুই ‘পশ প্রফেশন’ হিসেবে, সামাজিক স্ট্যাটাস, নিরাপদ ভবিষ্যৎ কিংবা পারিবারিক চাপে, তারা ঢুকে পড়ছে এমন একটি জায়গায়, যার আসল হিসাব-নিকাশ তারা শুরুতেই জানে না।

ডাক্তার হওয়া মানে শুধু সাদা অ্যাপ্রন পরা নয়।
এটা মানে আজীবন শেখা, সিদ্ধান্তের ভার বহন করা, ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নেওয়া, আর সবচেয়ে বড় কথা : মানুষের জীবনের দায়িত্ব নেওয়া।

এই বাস্তবতা যদি শুরুতেই পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা না হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এই সেক্টরে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়বে, যাদের ভেতরে পেশাগত দায়বদ্ধতা নয়, বরং কেবল পেশাগত সুবিধার হিসাব কাজ করে।

এখানেই বিপদটা গভীর।

স্বাস্থ্য সেক্টর কোনো একক স্তরে ভেঙে পড়ে না। এটা ভাঙে ধাপে ধাপে। প্রথমে প্রশ্নের মান পড়ে, তারপর নির্বাচনের মান, তারপর প্রশিক্ষণের গুণগত মান, আর সবশেষে উপরের মহল পর্যন্ত সেই ভাঙন পৌঁছে যায়। তখন আর সমস্যা আলাদা করে ধরা যায় না,পুরো সিস্টেমটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এটা শুধুই শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়, এটা প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা।

প্রশাসন যদি এখনো না বোঝে যে স্বাস্থ্য সেক্টরের জন্য ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন কাঠামো, ভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থা, এবং ভিন্ন ধরনের মানসিক ও নৈতিক ফিল্টার প্রয়োজন তাহলে সামনে যে সংকট আসছে, তা শুধুই ডাক্তার সংকট হবে না, হবে আস্থার সংকট।

মানুষ তখন আর প্রশ্ন করবে না, “ডাক্তার আছেন?”
প্রশ্ন করবে, “যোগ্য ডাক্তার আছেন তো?”

এখনই সময় সুন্দর, কঠোর এবং দূরদর্শী স্টেপ নেওয়ার। প্রশ্নের মানকে আবার জ্ঞানের গভীরতার দিকে ফেরাতে হবে। পেশাটার বাস্তবতা শুরুতেই স্পষ্ট করে দিতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই সেক্টরে কাদের প্রয়োজন, সেই সিদ্ধান্তটা আবেগ নয়, দায়িত্ববোধ দিয়ে নিতে হবে।

নইলে একদিন আমরা এমন একটি স্বাস্থ্য সেক্টরের মুখোমুখি হব, যেখানে ডাক্তার থাকবে অনেক, কিন্তু চিকিৎসা থাকবে খুব কম।


মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ | আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org