সাক্ষাৎকার

#০২৭ ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ সাক্ষাৎকার: জীবনী, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক যাত্রা

Share
Share

বিজ্ঞানী ডঃ আশরাফউদ্দিন আহমেদ
সাক্ষাৎকারের তারিখ: ২ অক্টোবর ২০১০
বিজ্ঞানী অর্গ এর ড. মশিউর রহমান সাক্ষাৎকারটি নেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তে জন্মগ্রহণ করে ১৯৬৬ তে মেট্রিক ১৯৬৮ সনে, অন্নদা হাই স্কুল থেকে ঢাকা কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগ—এই পথ পেরিয়ে ড. আশরাফুল উদ্দিন আহমেদের গবেষণা-যাত্রা পৌঁছেছে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের NIH (National Institutes of Health) পর্যন্ত। তাঁর জীবনের একটি বড় শিক্ষা হলো—বিজ্ঞান মানে কেবল ল্যাবের ভেতর বসে কঠিন শব্দ লেখা নয়; বিজ্ঞান শুরু হয় “কেন হচ্ছে?”—এই প্রশ্ন থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাপান: যুদ্ধের কারণে পিছিয়ে যাওয়া, তবু থেমে না যাওয়া

তিনি ১৯৬৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন, ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ১৯৬৮ সালে ঢাবির বায়োকেমিস্ট্রিতে ভর্তি হন। মুক্তিযুদ্ধের কারণে পড়াশোনার স্বাভাবিক সময়সূচি পিছিয়ে যায়—যেখানে ১৯৭২ সালে এমএসসি শেষ হওয়ার কথা, বাস্তবে হয় ১৯৭৪ সালে। এরপর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণার তাগিদে তিনি যান কিয়োটো ইউনিভার্সিটিতে—মাইক্রোবিয়াল বায়োকেমিস্ট্রিতে।

পিএইচডি: “খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যেত” এমন এনজাইম—এবং এক বছরের কঠিন যুদ্ধ

ড. আশরাফের পিএইচডি ছিল অ্যামিনো অ্যাসিড মেটাবলিজমের একটি এনজাইম নিয়ে। তিনি ব্যাখ্যা করেন—এনজাইম হলো দেহের ভেতরকার রাসায়নিক বিক্রিয়াকে দ্রুত ঘটানো জৈব অনুঘটক। কিন্তু তাঁর গবেষণার এনজাইমটি ছিল “আনস্টেবল”—খুব দ্রুত ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে যেত। প্রায় এক বছর ধরে প্রচণ্ড পরিশ্রমের পরও যখন ফল আসছিল না, তাঁর অধ্যাপক পর্যন্ত বলেছিলেন কাজটা ছেড়ে দিতে।

তখন তাঁর মনে হয়েছিল—বাংলাদেশ থেকে এসে ব্যর্থ হলে এটা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হবে না; দেশের নামও জড়িয়ে যাবে। সেই মানসিক দায়বোধ থেকেই তিনি কাজ ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত এনজাইমকে স্টেবল করতে পেরেছিলেন, এবং মলিকুলার পর্যায়ে এনজাইম কীভাবে কাজ করে—তা বের করে দুই-তিনটি নতুন রিঅ্যাকশন শনাক্ত করেন।

NIH-এ যাওয়া: একটি কনফারেন্স-পরিচয় থেকে সুযোগ

পিএইচডির সময়েই NIH-এর এক বিজ্ঞানীর সঙ্গে কনফারেন্সে পরিচয় হয়। তিনি চিঠি লিখে ড. আশরাফের অধ্যাপককে জানান—ড. আশরাফ চাইলে NIH-এ তার জন্য ব্যবস্থা করবেন। এভাবেই ১৯৮৩ সালে তিনি NIH-এ পোস্টডক হিসেবে যোগ দেন।

ট্রিপটোফ্যান সিনথেস: “টেক্সটবুক এনজাইম”—তবু বড় ব্রেকথ্রু

NIH-এ তাঁর বড় কাজ ছিল Tryptophan synthase নামের এনজাইম। এটি তখন “টেক্সটবুক এনজাইম”—অনেক কিছুই জানা ছিল, তাই নতুন কাজ বের করা কঠিন। কিন্তু তাঁর সুপারভাইজার বলেছিলেন: এই এনজাইমের থ্রি-ডাইমেনশনাল স্ট্রাকচার (ত্রিমাত্রিক গঠন) জানা নেই, বহু বছর চেষ্টা করেও ভালো ক্রিস্টাল বানানো যায়নি। যদি তা করা যায়, গবেষণার নতুন দরজা খুলবে।

ড. আশরাফ বলেন—তিনি ৩ অক্টোবর কাজ শুরু করে মাত্র দুই মাসের মধ্যে (৩ ডিসেম্বরের মধ্যে) চমৎকার ক্রিস্টাল বানিয়ে ফেলেন। এরপর X-ray crystallography ব্যবহার করে কোলাবোরেটরের সঙ্গে স্ট্রাকচার সলভ করা হয়। ১৯৮৭–৮৮ থেকে বহু বছর ধরে বায়োকেমিস্ট্রি টেক্সটবুকে তাঁর কাজের স্ট্রাকচার-ছবি ব্যবহার হয়েছে।

“এক এনজাইম থেকে আরেক এনজাইমে মাঝের অণু কীভাবে যায়?”—ধারণা নয়, প্রমাণ

আগে ধারণা ছিল—এক এনজাইমের তৈরি “ইন্টারমিডিয়েট” হয় বাইরে বের হয়ে যায়, নয়তো কোনো ক্যারিয়ারে যায়, কিংবা কেবল অনুমান করা হতো ভেতর দিয়ে যায়। ড. আশরাফদের কাজ দেখায়—এনজাইমের অ্যাক্টিভ সাইট থেকে আরেক অ্যাক্টিভ সাইটে যাওয়ার জন্য ভেতরে একটি নির্দিষ্ট পথ/রুট আছে। অর্থাৎ “অনুমান” থেকে বিজ্ঞান এগোল “দেখানো প্রমাণে”।

এনজাইম কী করে—একটি সহজ উদাহরণ

তিনি গ্লুকোজ/চিনি ভাঙার উদাহরণ দেন: পানি বা প্রাকৃতিক অবস্থায় চিনি ভাঙতে হাজার বছরও লাগতে পারে, কিন্তু এনজাইম থাকলে তা সেকেন্ডে ঘটে। এনজাইম দ্রুত কাজ করায় এবং শক্তির অপচয় কমিয়ে ছোট ধাপে বিক্রিয়া ঘটায়—হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো ক্ষতিকর পরিবর্তনও হয় না।

“ট্রিপটোফ্যান সিনথেস শুধু বানায়, ভাঙে না”—এই ‘না-জিজ্ঞেস করা’ প্রশ্নটাই তাঁর বড় কাজ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ: কাছাকাছি এনজাইম Tryptophanase ট্রিপটোফ্যান ভাঙতেও পারে, বানাতেও পারে। কিন্তু সবাই ধরেই নিয়েছিল Tryptophan synthase শুধু বানায়, ভাঙে না। ড. আশরাফ প্রশ্ন করেন—“কেন পারবে না?”

অনেকে বলেছিলেন, “আমরা এটা নিয়ে মাথা ঘামাই না।” তিনি দেখান—রিঅ্যাকশনের শর্ত (pH, temperature ইত্যাদি) বদলালে Tryptophan synthase ট্রিপটোফ্যান ভাঙতেও পারে। পরে অনেকেই স্বীকার করেন—এ প্রশ্ন আগে কেন তোলা হয়নি!

সিঙ্গেল-ক্রিস্টাল মাইক্রোস্পেকট্রোফটোমেট্রি ও “ক্রিস্টালের ভেতরও এনজাইম কাজ করে”

তিনি খুব ভালো মানের ক্রিস্টাল বানাতে পারতেন—এ জন্য ইতালির এক গবেষক তাঁর ক্রিস্টাল নিয়ে কাজ করতে চান। তখন ড. আশরাফ নিজে আরেকটি কঠিন কাজ হাতে নেন: তরলে যে এনজাইম কাজ করে, ক্রিস্টালের সলিড অবস্থাতেও কি কাজ করতে পারে? তিনি দেখান—পারেই, যদি সাবস্ট্রেট (বিক্রিয়াকারী অণু) ভেতরে ঢোকার পথ পায়।

তিনি বলেন, ঠিকভাবে “মাদার লিকার”-এ সংরক্ষণ করলে বছরের পর বছর ক্রিস্টাল কার্যক্ষম থাকতে পারে।

দেশে ফেরা না থাকা: বাস্তবতা মেনে নেওয়া

একসময় তাঁর ধারণা ছিল দেশে ফিরে যাবেন, ঢাবিতে কাজ করবেন—সে অনুযায়ী বই, যন্ত্রপাতি, কীভাবে কম রিসোর্সে কাজ হবে—এসব প্রস্তুতিও নেন। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে বাস্তবতা ছিল কঠিন; সহকর্মীরা বলেছিলেন, দেশে গবেষণার সুবিধা কম। তাই সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থাকবেন।

ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটি: নতুন এনজাইম, নতুন স্ট্রাকচার, নতুন প্রোগ্রামের শুরু

তিনি নর্থ ক্যারোলিনার Wake Forest University-তে Research Assistant Professor হন। সেখানে অক্সিজেন মেটাবলিজম-সম্পর্কিত দুই এনজাইম নিয়ে কাজ, একটি এনজাইমকে স্টেবল করা, আরেকটির ক্রিস্টাল-স্ট্রাকচার জার্মান দলের সাথে—এসব করেন।

বিশেষ আবিষ্কার: প্রোটিনের ভেতরে cysteine sulfenic acid (খুব রিঅ্যাক্টিভ, সলিউশনে অল্প সময় টিকে) প্রোটিনের ভেতরে স্থিতিশীলভাবে থাকতে পারে—এটা তিনি দেখান। আর তিনি যে স্ট্রাকচারাল বায়োলজি কাজ শুরু করেছিলেন, সেটিই পরে ওয়েক ফরেস্ট মেডিকেল স্কুলে বড় Structural Biology Program-এ পরিণত হয়।

আবার NIH-এ ফেরা: “ব্রেকথ্রু নেই” বলে ডেকে আনা

পরে NIH থেকে তাঁকে বলা হয়—তিনি চলে যাওয়ার পর বড় ব্রেকথ্রু হচ্ছে না, তাই ফিরে এসে কাজকে আবার শক্তভাবে চালু করতে হবে। তিনি NIH-এ আরও উচ্চ পদে ফিরে এসে থ্রি-ডাইমেনশনাল স্ট্রাকচার নির্ণয়ের কাজকে আরও বিস্তৃত করেন—অ্যাটমিক লেভেলে অ্যামিনো অ্যাসিড বিন্যাস দেখা, মিউট্যান্ট তৈরি করে পরীক্ষা—এসব।

কী প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন—তিনি নিজেই তালিকা দেন

তিনি বলেন, স্ট্রাকচার নির্ণয়ে মূল ছিল X-ray crystallography। সাথে ব্যবহার হয়েছে:

  • Circular dichroism
  • UV-visible absorption spectrometry
  • Electron microscopy
  • Fluorimetry / fluorescence
  • Molecular/computer graphics
  • এবং site-specific mutagenesis (প্লাজমিড/ভেক্টর ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্থানে মিউটেশন)—যেটা তখন একেবারে নতুন প্রযুক্তি ছিল; NIH-এ যার শুরু হয়েছিল, সেখান থেকেই তিনি শিখে এনেছিলেন।

মৌলিক গবেষণা থেকে প্রয়োগ: সংক্রামক রোগ ও বোটুলিনাম টক্সিন

পরবর্তী জীবনে তিনি মৌলিক জ্ঞান (textbook science) থেকে সরে ইনফেকশাস ডিজিজ, ভ্যাকসিন/ড্রাগ ডেভেলপমেন্টের দিকে যান। এখানে তাঁর বড় কাজ: Botulinum neurotoxin—যা অত্যন্ত মারাত্মক বিষ। তিনি দেখেন, এই টক্সিনের একটি অংশ এনজাইমের মতো কাজ করে। যদি এনজাইম অ্যাক্টিভিটি নষ্ট করা যায়, টক্সিন আর ক্ষতিকর থাকবে না।

তিনি বলেন, অন্যরা বাজারের লক্ষ-কোটি যৌগ “একটা একটা করে” টেস্ট করে—তিনি করেন knowledge-based design: এনজাইমের ত্রিমাত্রিক গঠন দেখে, অ্যাক্টিভ সাইটে চার্জ কেমন (পজিটিভ), তার বিপরীতে নেগেটিভ চার্জযুক্ত পেপটাইড ডিজাইন করে টেস্ট করেন। মাত্র কয়েক ডজন টেস্টেই অধিকাংশ ভালো ফল দেয়, এবং তাঁর প্রকাশিত ইনহিবিটরগুলো “সবচেয়ে ভালো ইনহিবিটর” হিসেবে পরিচিত হয়।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: “আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণা”

ড. আশরাফ গবেষণাকে সংজ্ঞা দেন খুব সহজভাবে—প্রতিদিনের জীবন দেখে প্রশ্ন করা: “কেন হচ্ছে? একটু বদলালে কী হবে?” তাঁর মতে, বাংলাদেশকে রকেট সায়েন্সে ছুটতে হবে—এমন নয়; বরং যে গবেষণা দেশের কাজে লাগে, সেটাই জরুরি। তিনি খুব সরল—কখনও “ক্রুড” উদাহরণও দেন: মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস থেকেও “সর্বোচ্চ ব্যবহার” (maximum utilization) বোঝার গবেষণা ভাবনা আসতে পারে। মূল কথা—দেশের বাস্তব সমস্যার দিকে তাকিয়ে গবেষণা সাজাতে হবে।

তিনি বলেন, দূষণ, খাদ্যঘাটতি, কৃষি—এসব দৈনন্দিন সমস্যা থেকেই গবেষণার বড় ক্ষেত্র তৈরি হয়; আর অনেক কাজের জন্য খুব বড় ল্যাবও লাগে না—লাগে উদ্যোগ ও চিন্তা।


শেষ কথা

ড. আশরাফুল উদ্দিন আহমেদের গল্পে বারবার ফিরে আসে একটি ভাবনা—বিজ্ঞান হলো দায়িত্ব, এবং প্রশ্ন করার সাহস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে বিশ্বসেরা গবেষণাগারে টেক্সটবুক-মানের আবিষ্কার, আবার সেখান থেকে মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রয়োগমূলক গবেষণায় আসা—এই পুরো যাত্রা বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা: দেশকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানী হতে হলে আগে নিজের চারপাশকে প্রশ্ন করতে শিখতে হবে—আর বাস্তব প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গবেষণাকে দাঁড় করাতে হবে।

ইউটিউবে সাক্ষাৎকারটি দেখুন

১ম অংশ

২য় অংশ

৩য় অংশ

ড. আশরাফ এর আরো কিছু কাজ:

খবর

প্রকাশিত কিছু লেখা

 

Share
Written by
ড. মশিউর রহমান

ড. মশিউর রহমান বিজ্ঞানী.অর্গ এর cofounder যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সনে। পেশাগত জীবনে কাজ করেছেন প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হিসাবে আমেরিকা, জাপান, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ডিজিটাল হেল্থকেয়ারে যেখানে তার টিম তথ্যকে ব্যবহার করছেন বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার জন্য। বিস্তারিত এর জন্য দেখুন: DrMashiur.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org