সাক্ষাৎকার

#০১৪ বিজ্ঞান, স্বপ্ন ও বাংলাদেশের কৃষির নতুন দিগন্ত – ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

বাংলাদেশের কৃষি মানেই কেবল ধানখেত, নদীর পাড় আর কাদা-মাখা মাঠ—এমন একটি রোমান্টিক ছবি আমাদের অনেকের মাথায় ভেসে ওঠে। কিন্তু এই কৃষির ভেতরেই লুকিয়ে আছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতির ভিত্তি এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। সেই কৃষির একেবারে মৌলিক উপাদান ‘বীজ’ নিয়ে গবেষণা করে বিশ্ববিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী—ডক্টর আবেদ চৌধুরী। তাঁর জীবনপথ যেমন আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোয় উদ্ভাসিত, তেমনি তাঁর চিন্তা-ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের মাঠ, কৃষক এবং বীজের সংকট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিজ্ঞানের মঞ্চে

ডক্টর আবেদ চৌধুরীর শিক্ষাজীবনের শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। বিজ্ঞানের মৌলিক পাঠ সেখানেই তাঁর ভিত গড়ে দেয়। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে গিয়ে তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্র বদলে যায়—রসায়ন থেকে তিনি ঝুঁকে পড়েন জীববিজ্ঞানের দিকে। ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনে জীববিজ্ঞানে পড়াশোনা, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH) ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT)-এর মতো শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পান। পরে অস্ট্রেলিয়ান সরকারের অধীনে জাতীয় গবেষণা সংস্থা CSIRO-তে (কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন) যোগ দিয়ে তিনি স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণা জীবন শুরু করেন।

১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় এসে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানের এক বিশেষ শাখায় কাজ শুরু করেন—উদ্ভিদের আণবিক জীববিজ্ঞান বা প্ল্যান্ট মলিকিউলার বায়োলজি। সহজভাবে বললে, এটি হলো গাছপালার ভেতরের জিন ও কোষের স্তরে কীভাবে জীবনপ্রক্রিয়া চলে, তা বোঝার বিজ্ঞান। মানুষ যেমন শরীরের ভেতরের কোষ দিয়ে তৈরি, তেমনি উদ্ভিদের প্রতিটি অংশের পেছনেও কাজ করে জিনের জটিল নির্দেশনা।

বীজ তৈরির রহস্য আর নতুন বিজ্ঞান

ডক্টর আবেদ চৌধুরীর গবেষণার মূল বিষয় বীজ—কীভাবে বীজ তৈরি হয় এবং কোন কোন জিন এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণভাবে আমরা জানি, উদ্ভিদের ফুলে পুরুষ অংশের পরাগরেণু (পোলেন) স্ত্রী অংশে গিয়ে মিলিত হলে তবেই বীজ তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃতিতে এমন কিছু উদ্ভিদও আছে, যেখানে পুরুষ অংশের অংশগ্রহণ ছাড়াই বীজ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অ্যাপোমিক্সিস’। বিষয়টি অনেকটা এমন—যেন কোনো মা নিজের প্রতিচ্ছবি তৈরি করে সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, বাবার ভূমিকা ছাড়াই।

ডক্টর আবেদ ও তাঁর সহকর্মীরা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ কিছু জিন আবিষ্কার করেছেন, যেগুলো পরিচিত ‘FIS-class genes’ নামে। এই জিনগুলো বোঝাতে সাহায্য করেছে, বীজ তৈরির ভেতরের জটিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। গত এক দশকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এই গবেষণা একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কারণ, যদি ধান বা গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্যে অ্যাপোমিক্সিসের বৈশিষ্ট্য আনা যায়, তাহলে একবার ভালো মানের বীজ তৈরি হলে তা থেকে বারবার একই মানের ফসল পাওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষকের খরচ কমবে, উৎপাদন বাড়বে এবং খাদ্যনিরাপত্তা আরও মজবুত হবে।

বাংলাদেশের বীজ সংকট: পরিসংখ্যানের কঠিন বাস্তবতা

ডক্টর আবেদ চৌধুরীর গবেষণা শুধু ল্যাবরেটরির দেয়ালে আটকে নেই। তিনি যখন গ্রামে যান, কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন একটি বাস্তব সংকট তাঁকে বারবার নাড়া দেয়—বাংলাদেশে ভালো মানের বীজের ঘাটতি। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট বীজের চাহিদার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। আলুর বীজের ক্ষেত্রে এই হার আরও ভয়াবহ—মাত্র ৩ শতাংশ। ডালের বীজের সরবরাহ মাত্র ১ শতাংশের মতো, আর তেলবীজের ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অত্যন্ত কম।

এর মানে কী? এর মানে হলো, অধিকাংশ কৃষক নিজের জমি থেকে আগের বছরের বীজ রেখে নতুন মৌসুমে তা ব্যবহার করেন। এতে ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে। ভালো বীজ না পেলে কৃষকের শ্রম আর মাটির উর্বরতাও পুরোপুরি কাজে লাগে না। এই বাস্তবতা থেকেই ডক্টর আবেদ চৌধুরীর মনে হয়েছে, বীজ নিয়ে বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর দায় আছে দেশের পাশে দাঁড়ানোর।

‘কৃষাণ’: বিজ্ঞান ও ব্যবসার মিলন

এই ভাবনা থেকেই ‘কৃষাণ’ নামে একটি উদ্যোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। উদ্দেশ্য—কৃষকের হাতে ন্যায্য মূল্যে উন্নতমানের বীজ পৌঁছে দেওয়া। তাঁর মতে, বীজকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরি না হলে কৃষিতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ আসবে না। যেমন মানুষ টুথব্রাশ বা সার নিজে তৈরি করে না, তেমনি উন্নতমানের বীজ উৎপাদনও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান করতে পারে। তবে এখানে শর্ত একটাই—কৃষক যেন একচেটিয়া ব্যবসার শিকার না হন, তাঁদের যেন বিকল্প থাকে, ন্যায্য দাম থাকে।

বীজ ব্যবসা নিয়ে অনেকের মনে ভয় আছে—একবার কোনো কোম্পানির বীজ কিনলে প্রতি বছর সেই কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। ডক্টর আবেদ মনে করেন, ব্যবসা থাকলেই যে শোষণ হবে—এমন ভাবার কারণ নেই। বরং প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা ও নজরদারি, যাতে কৃষক সর্বোচ্চ মানের বীজ পান এবং কোনো পক্ষ অতিরিক্ত মুনাফা করে কৃষকের ক্ষতি না করে।

শহর ও গ্রামের দূরত্ব: কৃষির পেছনের সামাজিক বাস্তবতা

কৃষিতে পিছিয়ে থাকার পেছনে ডক্টর আবেদ চৌধুরী একটি গভীর সামাজিক কারণ দেখেন—শহর ও গ্রামের মধ্যকার দূরত্ব। বাংলাদেশের শিক্ষিত ও সচ্ছল শ্রেণির মানুষের সঙ্গে গ্রামের বাস্তব জীবনের সংযোগ কমে গেছে। কৃষিকে অনেক সময় ‘গেঁয়ো’ বা কম মর্যাদার কাজ হিসেবে দেখা হয়। ফলে মেধাবী তরুণেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসেন, কৃষিতে আধুনিক চিন্তা ও প্রযুক্তির প্রবাহ কমে যায়।

উন্নত দেশগুলোতে শহর ও গ্রামের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সম্পর্ক থাকে। বাংলাদেশে সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, গ্রামকে অবহেলা করলে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়, আর কৃষি অবহেলিত থাকলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বার্তা

ডক্টর আবেদ চৌধুরীর পরামর্শ খুব সরল কিন্তু গভীর—প্রকৃতির কাছে ফিরে যাও। বাংলাদেশের প্রকৃতি মূলত গ্রামেই ছড়িয়ে আছে। তরুণদের তিনি আহ্বান জানান গ্রামে গিয়ে মানুষের সঙ্গে মিশতে, গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে। এতে শুধু সহমর্মিতা নয়, দেশের বাস্তব সমস্যা বোঝার সুযোগ তৈরি হবে। এই বোঝাপড়া থেকেই ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তারা দেশের জন্য কার্যকর সমাধান বের করতে পারবেন।

শেষকথা

ডক্টর আবেদ চৌধুরীর জীবনপথ প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক গবেষণার শীর্ষে পৌঁছেও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা যায়। তাঁর গবেষণাগারের আলো আর বাংলাদেশের গ্রামের মাটির গন্ধ—দুটোই তাঁর চিন্তার অংশ। বীজের ভেতর যেমন একটি নতুন গাছের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তেমনি তাঁর স্বপ্নের ভেতর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের কৃষির নতুন সম্ভাবনা। এই পথচলা কেবল একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি আহ্বান—নিজের শিকড় ভুলে না গিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর আহ্বান।

সাক্ষাৎকারটি ২৫ জুলাই, ২০০৭ তারিখে বিজ্ঞানি.অর্গ-এর জন্য ডক্টর মশিউর রহমান কর্তৃক গৃহীত হয়।

 

ড. আবেদ চৌধুরী সংক্রান্ত কিছু লিংক:

Share
Written by
ড. মশিউর রহমান

ড. মশিউর রহমান বিজ্ঞানী.অর্গ এর cofounder যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সনে। পেশাগত জীবনে কাজ করেছেন প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হিসাবে আমেরিকা, জাপান, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ডিজিটাল হেল্থকেয়ারে যেখানে তার টিম তথ্যকে ব্যবহার করছেন বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার জন্য। বিস্তারিত এর জন্য দেখুন: DrMashiur.com

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org