তথ্যপ্রযুক্তি

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, নাকি আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করি?

Share
Share

রাত ১২টা। ঘর অন্ধকার। শুধু মোবাইলের নীল আলো রুমের দেওয়ালে পড়ছে। সামিয়া ঠিক করেছিল আজ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকবে না। কারণ আগামীকাল তার ক্লাস প্রেজেন্টেশন আছে। তাই আজ রাতে একটি ভালো ঘুম দরকার।

কিন্তু হঠাৎ—টিং!
সামিয়া ভাবে, “একবার দেখি, তারপর বন্ধ করে দেব।”
কিন্তু কখন যে এক ঘণ্টা কেটে যায়, সে বুঝতেই পারে না। হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগে—সে কি নিজে ফোন ব্যবহার করছে, নাকি ফোনই তাকে ব্যবহার করছে?

বর্তমান বাস্তবতা

বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্ম শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তথ্য, বিনোদন এবং মতামত প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, যা ব্যবহারকারীর পছন্দ, আগ্রহ এবং পূর্ববর্তী আচরণের ভিত্তিতে কনটেন্ট প্রদর্শন করে।

এই অ্যালগরিদমগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখা। গবেষণায় দেখা গেছে, একই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখলে তা ব্যবহারকারীর চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।

এছাড়া “ডোপামিন লুপ” নামক একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত। যখন ব্যবহারকারী লাইক, কমেন্ট বা নোটিফিকেশন পায়, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। এটি আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং ব্যবহারকারীকে পুনরায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে।

ফলে ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হতে পারে

আমরা কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি

অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়া একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম—এর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাতেই থাকে।

ব্যবহারকারী নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে—

  • কত সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবে
  • কোন কনটেন্ট অনুসরণ করবে
  • কোন তথ্য গ্রহণ করবে

সোশ্যাল মিডিয়া সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা, গবেষণা, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন কোর্স, গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ও একাডেমিক নেটওয়ার্ক এখন সহজেই সবার নাগালে।

ভারসাম্যই মূল চাবিকাঠি

বাস্তবতা হলো, সোশ্যাল মিডিয়া নিজে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে না; তবে এর ডিজাইন ও অ্যালগরিদম আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

একই সঙ্গে সচেতন ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারি—কতটা এবং কীভাবে ব্যবহার করব।

উপসংহার

সোশ্যাল মিডিয়া আধুনিক জীবনের একটি শক্তিশালী অংশ, যা আমাদের চিন্তা, আচরণ ও সময় ব্যবহারে প্রভাব ফেলে। তবে এটি একমুখী সম্পর্ক নয়। বরং ব্যবহারকারী ও প্রযুক্তির মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রভাব বিদ্যমান।

অ্যালগরিদম আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরাই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।

অতএব, প্রশ্নটি—“সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে কিনা”—তার উত্তর নির্ভর করে আমাদের ব্যবহারের ধরন ও সচেতনতার উপর। প্রযুক্তি নয়, বরং ব্যবহারকারীর সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ।

হাসনা বানু।
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, কুষ্টিয়া
রাষ্ট্রনীতি ও লোকপ্রশাসন, বিভাগ
শিক্ষা, রাষ্ট্রনীতি ও মানব উন্নয়ন বিষয়ে আগ্রহী লেখক

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org