সম্পাদকীয়

গবেষণায় তারাই সফল হন যারা নিজেরাই শেখে

Share
Share

আধুনিক বিজ্ঞানের দ্রুতগতির ভুবনে যে দক্ষতাটি একজন গবেষক, পেশাজীবী বা শিক্ষার্থীকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে, সেটি হলো স্বশিক্ষা—Self-learning। উচ্চশিক্ষার ক্লাসরুম, ল্যাব, সেমিনার বা প্রশিক্ষণ আমাদের কাঠামোবন্দী শেখার সুযোগ দেয় ঠিকই, কিন্তু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, নতুন দক্ষতা অর্জন, অথবা বৈশ্বিক গবেষণা-প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রকৃত শক্তি গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। বিশ্বের শীর্ষ গবেষক, উদ্যোক্তা এবং বৈজ্ঞানিক নেতাদের জীবনী দেখলে দেখা যায়—তাঁদের সাফল্যের শেকড়ে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন Self-learning-এর অভ্যাস।

Self-learning মূলত জন্ম নেয় কৌতূহল থেকে—বিজ্ঞানের প্রথম বীজ। একটি শিশুর “আকাশ নীল কেন?” প্রশ্নটি সেই বীজের সূচনা। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষার চাপ, নম্বরের প্রতিযোগিতা কিংবা “ভুল করলে শাস্তি”—এই সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে প্রশ্ন করার স্বাভাবিক অভ্যাস হারিয়ে ফেলি। অথচ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পুরো ইতিহাসই প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়েছে: নিউটনের আগে কেউ কি আপেল পড়ে কেন তা জিজ্ঞেস করতে থেমেছিল? প্রশ্নের মাধ্যমেই জন্ম নেয় গবেষণা–মনোভাব। Self-learning সেই প্রশ্নকে জাগিয়ে তোলে, আবারও সক্রিয় করে।

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞান দ্রুত বদলে যায়। একটি প্রযুক্তি বা গবেষণা-পদ্ধতি একসময় দশ বছর টিকে থাকতো; এখন তিন বছরের মধ্যেই তা অচল হয়ে যেতে পারে। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট বলছে—বর্তমান চাকরির ৪৪% কাজের জন্য আগামী দুই বছরের মধ্যেই নতুন স্কিল প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ শিখে নেওয়া দক্ষতা স্থায়ী নয়; ধারাবাহিকভাবে নিজেকে আপডেট করা ছাড়া পথ নেই। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রপিক বা টেসলা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে—“We hire people who know how to learn fast.” গবেষণা-জগতেও এই ব্যবধান স্পষ্ট। Nature-এর এক জরিপে দেখা গেছে, স্বশিক্ষায় সক্রিয় গবেষকের গবেষণা-উৎপাদনশীলতা অন্যদের তুলনায় গড়ে ৪৭% বেশি

Self-learning মানুষের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে তোলে। আপনি যদি নিজেই ইউটিউব দেখে একটি ডেটা-অ্যানালাইসিস টুল শিখে ফেলেন, অথবা কোনো কোর্স ছাড়াই একটি নতুন সফটওয়্যার ইনস্টল করে চালাতে পারেন, আপনার মস্তিষ্ক উপলব্ধি করে—আমি পারি। এই ‘পারার অভিজ্ঞতা’ই পরের শেখার ইন্ধন। নিউরোসায়েন্স দেখায়, শেখার পর মস্তিষ্কে ডোপামিন নির্গত হয়—যা নতুন শেখার আগ্রহ ও ফোকাস আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে Self-learning হয়ে ওঠে একধরনের ইতিবাচক চক্র—যত শিখবেন, তত শেখার ক্ষমতা বাড়বে।

অনেকে মনে করেন Self-learning মানে বিশাল বই শেষ করা বা কঠিন গবেষণাপত্র বোঝার চেষ্টা। বাস্তবে এটি শুরু হয় খুব সাধারণ ধাপ থেকে। আপনি যদি নতুন একটি ল্যাব টুল, সফটওয়্যার, ডেটাসেট বা প্রোগ্রামিং কোড নিজে চেষ্টা করে শিখে নেন—এটাই Self-learning। কোনো বিষয় দোকানদার, শিক্ষক, সিনিয়র বা মেন্টর না বলে দিলেও আপনি নিজে খুঁজে বের করছেন—এটাই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে—MIT, Max Planck, RIKEN, Cambridge—গবেষণা-শিক্ষার্থীর অন্যতম প্রধান মূল্যায়ন মানদণ্ড হলো Self-driven learning।

Self-learning-এর মূল শক্তি হলো প্রশ্ন করা এবং তথ্য অনুসন্ধান। যখন কোনো বিষয় চোখে পড়ে, মস্তিষ্ক যদি প্রশ্ন করে “এটা কেন হলো?”, “এটা কিভাবে কাজ করে?”, “এটা কি অন্যভাবে হতে পারে?”, তখনই চিন্তা-প্রক্রিয়া বিশ্লেষণী হয়ে ওঠে। যারা প্রশ্ন করে না, তারা কেবল উত্তর মুখস্থ করে। যারা প্রশ্ন করে, তারা উত্তর তৈরি করে। বাংলাদেশের গবেষণা-যাত্রার জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি, কারণ অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ল্যাব-সুবিধা কম, কিন্তু Self-learning থাকলে তথ্য, টুলস, গবেষণা-পদ্ধতি নিজেরাই আয়ত্ত করা সম্ভব।

তথ্য খুঁজে বের করার ক্ষমতা এখন একটি মূল জীবনদক্ষতা। গুগল, ইউটিউব বা রিসার্চগেট ব্যবহার করা—এসবের দক্ষতা অনেকেই হালকাভাবে নেয়। কিন্তু গবেষণায় সঠিক কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করে তথ্য খোঁজা একটি বৈজ্ঞানিক স্কিল। হার্ভার্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে—ভালো সার্চাররা গড়ে ২.৫ গুণ দ্রুত সমাধান খুঁজে পায়। তাই Self-learning-এর অন্যতম ভিত্তি হলো তথ্য অনুসন্ধান এবং সেটিকে নিজের ভাষায় নোট করা। কারণ আমরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শেখা তথ্যের অর্ধেক ভুলে যাই—নোট করা না হলে মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারে না।

তবে শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রয়োগ। কোনো কোড বা তত্ত্ব শিখলেন, এখন সেটি দিয়ে ছোট কিছু তৈরি করুন। নতুন রেসিপি শিখলেন—রান্না করে ফেলুন। কোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানলেন—তাহলে ছোট একটি ডেটাসেটে মডেল চালিয়ে দেখুন। শেখা জিনিস অন্যকে বোঝানো—এটিও একটি প্রয়োগ, যা শেখাকে দ্বিগুণ কার্যকর করে। এজন্যই বলা হয়, “To learn something deeply, teach it once.”

Self-learning কখনই সোজা পথে চলে না। ভুল হবে, ব্যর্থতা আসবে—এটাই শেখার প্রকৃতি। কিন্তু Self-learning-এর সৌন্দর্য হলো—এখানে ভুল করার কোনো শাস্তি নেই। বরং ভুলটাই শেখার গতি বাড়ায়। MIT-এর লার্নিং সায়েন্স স্টাডি বলছে—যারা ভুলকে শেখার অংশ মনে করে, তারা অন্যদের তুলনায় ৭০% বেশি অগ্রগতি করে। তাই দ্বিধা নয়—শুরু করাটাই আসল।

আজ Self-learning আগের যেকোনো যুগের তুলনায় সহজ। এমআইটি ওপেনকোর্সওয়্যার, কুরসেরা, খান একাডেমি, ইউটিউব, গুগল স্কলার—সবই এক ক্লিক দূরে। আর বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য বিজ্ঞানী অর্গ, মুক্তপাঠ, ১০ মিনিট স্কুল—এসব জ্ঞানপ্ল্যাটফর্ম সত্যিই বড় পরিবর্তন এনে দিচ্ছে। এখন একটি স্মার্টফোন থাকলেই বিশ্বমানের শিক্ষা হাতের নাগালে।

দৈনন্দিন জীবনেও Self-learning স্বাভাবিকভাবে ঘটে। যখন কেউ ইউটিউব দেখে বাইসাইকেল মেরামত শিখে, কিংবা নতুন কেক বানানোর রেসিপি চেষ্টা করে, কিংবা কোনো ছাত্র ChatGPT বা পাইথন ব্যবহার করতে শিখছে—সবই Self-learning। বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা প্রফেসর খুঁজে পাওয়া, গবেষণা-আগ্রহ চিহ্নিত করা, ইমেইল লেখা—এসবই Self-learning-এর বাস্তব চর্চা।

আসলে Self-learning মানুষকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করে। এটি শেখায়—জ্ঞান কারও সম্পত্তি নয়, জ্ঞানকে খুঁজে নিতে হয়, বুঝে নিতে হয়, নিজের করে নিতে হয়। ভবিষ্যতের পৃথিবী খুঁজছে এমন মানুষ, যারা নিজে সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারে, শেখার গতি বাড়াতে পারে, এবং কখনো শেখা বন্ধ রাখে না।

কারণ শেষ পর্যন্ত Self-learning শুধু একটি দক্ষতা নয়—এটি ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ভিত্তি। যিনি নিজের শেখার দায়িত্ব নিজেই নেন, তিনি কেবল পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চলেন না—পরিবর্তন তৈরি করেন।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org