আজ বিকেলবেলা আমি প্রতিবেশীদের সাথে গল্প করছিলাম। হালকা রোদ সাথে মুড়ি মাখানো আর চা সব কিছু মিলিয়ে আমাদের লেডিস পার্টিটা বেশ জমে উঠেছিল। এর মত হঠাৎ একজন একটা মিথ্যা কথা বলে উঠলো। কথাটি ছোট ছিল কিন্তু এর তীব্রতা এত বেশি ছিল যে পুরো আড্ডার মেজাজ বদলে দিল। মুহূর্তে আমি যেন মিথ্যার ভেতরে পড়ে গেলাম। মনটা অস্বস্তিতে, চোখে অদ্ভুত ঘৃণা, আর কৌতুহল মিশে গেল। সবাই একটু চুপ, কেউ কেউ হেসেও ফেলল। আর আমি ভাবলাম এতটা ঝাঁঝালো মিথ্যা সামলানো সত্যি সহজ নয়, কখনো কখনো সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পথ হারিয়ে যায়
১. কেন মনোবিজ্ঞান মিথ্যা নিয়ে আগ্রহী?
- মিথ্যা মানুষের দৈনন্দিন আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- এটি মস্তিষ্কের কগনিটিভ এবং মানসিক প্রক্রিয়ার ফলাফল।
- মিথ্যা সমাজে বিশ্বাস সম্পর্ক এবং নৈতিকতার উপর প্রভাব ফেলে।
- মনোবিজ্ঞান এই আচরণ বোঝার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা অনুভূতি এবং সামাজিক আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারে।
২. মস্তিষ্ক ও কগনিটিভ প্রসেসের সংক্ষিপ্ত আলোচনা –
- কগনিটিভ প্রসেস(Cognitive Process) বলতে বোঝাই মস্তিষ্কের সেইসব মানুষিক প্রক্রিয়া যা আমরা চিন্তা শেখা মনে রাখা সিদ্ধান্ত নেয়া সমস্যা সমাধান এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহার করি।
৩. মিথ্যা বলার সময় মস্তিষ্ক কগনিটিভ প্রসেসের চারটি ধরন –
- প্রিফ্রন্টল কর্টেক্স(Prefrontal Cortex)=সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিয়ন্ত্রণ, এবং লজিক্যাল চিন্তা পরিচালনা করে, মিথ্যা তৈরিতে সক্রিয় থাকে।
- এ্যন্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স( Anterior Cingulate Cortex)= কগনিটিভ দ্বন্দ্ব পর্যবেক্ষণ করে, সত্য এবং মিথ্যার মধ্য ভারসাম্য রাখে।
- কগনিটিভ লোড( Cognitive Load) =মিথ্যা তৈরি করার সময় মস্তিষ্ক সত্যকে দমন করে এবং নতুন তথ্য তৈরি করতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করে।
- আদর্শ উদাহরণ( Illustrative Example) =যারা নিয়মিত মিথ্যা বলে তাদের মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয় পরবর্তী মিথ্যা আরো বলা সহজ হয়ে যায়।
৪. মিথ্যা বলার কারণ –
- আত্মরক্ষা =মানুষ প্রায় মিথ্যা বলে যাতে সে নিজেকে শাস্তি, বিব্রত বোধ বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রায় দুই বছরের শিশুরাও তাদের ভুল লুকাতে মিথ্যা বলে। একটি প্রমাণ করে যে মিথ্যা একটি প্রাথমিক ও অভিযোজনমূলক আচরণ। (Talwar & Lee, 2002)
- ব্যক্তিগত সুবিধা = কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা ব্যক্তিগত বা সামাজিক সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ মানুষ তথ্য বিকৃত বা গোপন করতে পারে, যাতে সুবিধা বেশি পাওয়া যায়। এটি কৌশলগত মিথ্যা(Vrij,2008)।
- সৌজন্যমূলক মিথ্যা= সব মিথ্যা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয় কিছু মিথ্যা কারো অনুভূতি রক্ষা বা সামাজিক সমন্বয় বজায় রাখার জন্য বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কারো নতুন চুলের স্টাইল খারাপ হলেও প্রশংসা করা হয় যা সামাজিকতা বজায় রাখে।(Depaulo et al.1996)।
- সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা =মানুষ প্রায় মিথ্যা বলে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন বা নিজের ভাবমূর্তিকে উন্নত করতে সামাজিক মনোবিজ্ঞান গবেষণা দেখিয়েছে যে আত্মপ্রদর্শন সম্পর্কিত উদ্বেগ মানুষের মিথ্যা বলার প্রবণতাকে প্রভাবিত করে।(Goffman,1959)।
৫. স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানিক প্রক্রিয়া –
- স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গিয়েছে মিথ্যা বলার সময় মস্তিষ্কের একাধিক অংশ সক্রিয় থাকে প্রিফ্রন্টাল কটেক্স সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।এবং এ্যন্টেরিয়র সিংগুলেট কর্টেক্স কগনিটিভ দ্বন্দ্ব পর্যবেক্ষণ করে। মিথ্যা তৈরি করার সময় মস্তিষ্ক সত্যকে দমন করে এবং নতুন তথ্য সৃজন করে। যা প্রদর্শন করে এই আচরণের জটিলতা।( Abe et al.2007) দীর্ঘমেয়াদে যারা অভ্যাসগতভাবে মিথ্যা বলে তাদের মস্তিষ্ক এই প্রক্রিয়ার অভিযোজন করে এবং মিথ্যা বলার দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
৬. সামাজিক ও মনোবিজ্ঞানিক প্রভাব –
ছোট মিথ্যা কখনো সামাজিকভাবে কার্যকর হলেও দীর্ঘ মেয়াদী বা বড় মিথ্যা সম্পর্কের বিশ্বাস, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সমাজের স্থিতিশীলতাকে হ্রাস করে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে অভ্যাসগত মিথ্যাবাদী ব্যক্তিরা কম সামাজিক সহায়তা, বেশি সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, এবং খারাপ সুনাম ভোগ করে (Serota et al.2010)।
উপসংহার –
মিথ্যা শুধু কথার খেলা নয়, এটি মস্তিষ্কের জটিল কাজের ফল কখনো সত্যকে চাপা দিতে হয় কখনো নতুন নতুন তথ্য তৈরি করতে হয়। এই ছোট মিথ্যার ভেতর আমরা পরি কগনিটিভ ঝড়ে। আমরা বুঝতে পারি মানুষের মন কতটা রহস্যময় এবং আচরণ কতটা জটিল।
মোছাঃ হাসনা বানু।
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, কুষ্টিয়া
রাষ্ট্রনীতি ও লোকপ্রশাসন, বিভাগ
শিক্ষা, রাষ্ট্রনীতি ও মানব উন্নয়ন বিষয়ে আগ্রহী লেখক

Leave a comment