বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় বাস্তবতা হলো শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বিশাল বৈষম্য। শহরের বড় হাসপাতালে যেখানে আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানে গ্রামের মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাই অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা সামনে রেখেই ড. আবু খালেদ তাঁর গবেষণার একটি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন—“গ্রামের মানুষ যেন আধুনিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।” তাঁর মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নতির সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত পৌঁছায়।
ড. আবু খালেদের উদ্ভাবিত ও উন্নত করা BIA (Bioelectrical Impedance Analysis) পদ্ধতি মূলত হাসপাতালভিত্তিক গবেষণার জন্য তৈরি হলেও তিনি এটিকে গ্রামীণ বাস্তবতায় উপযোগী করার কথা ভাবছেন। বর্তমানে এই ধরনের যন্ত্রের দাম হাজার হাজার ডলার হওয়ায় বাংলাদেশের মতো দেশে তা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ফলে ডিহাইড্রেশন, অপুষ্টি বা শরীরের ভেতরের পানি ও চর্বির ভারসাম্য নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো শহরের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ড. খালেদের স্বপ্ন হলো এই প্রযুক্তিকে সস্তা, পোর্টেবল এবং সৌরশক্তিচালিত করে তোলা, যাতে বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে ব্যবহার করা যায়।

গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বাস্তবতা বিবেচনা করলে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। অনেক গ্রামে নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকে না, আধুনিক যন্ত্রপাতি রাখার মতো অবকাঠামোও সীমিত। এমন অবস্থায় যদি একটি ছোট ব্যাটারি বা সোলার-পাওয়ার্ড যন্ত্র দিয়ে শিশুর ডিহাইড্রেশন, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিগত অবস্থা বা প্রিম্যাচিউর নবজাতকের ঝুঁকি আগেভাগে নির্ণয় করা যায়, তাহলে তা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ড. খালেদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি শুধু রোগ শনাক্তে নয়, ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে রয়েছে ড. খালেদের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। আইসিডিডিআরবি-তে কাজ করার সময় তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন—একই রোগে আক্রান্ত দুই শিশুর চিকিৎসা ফলাফল কেবল সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর কতটা নির্ভর করে। যখন প্রযুক্তির অভাবে চিকিৎসককে আন্দাজের ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন ভুলের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর সেই ভুলের খেসারত দিতে হয় রোগী ও তার পরিবারকে। তাই তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই একজন গবেষকের নৈতিক দায়িত্ব।
ড. আবু খালেদের এই চিন্তা আমাদের দেশের স্বাস্থ্যনীতি ও গবেষণার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—আমরা কি শুধু উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে চাই, নাকি সেই প্রযুক্তিকে সবার জন্য প্রাপ্য করতে চাই? উন্নত দেশের জন্য বানানো যন্ত্রপাতি সরাসরি আমাদের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। তাই বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য প্রয়োজন ‘লো-কস্ট ইনোভেশন’—কম খরচে কার্যকর সমাধান। ড. খালেদের লক্ষ্য সেই দিকেই—বিজ্ঞানকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী করে তোলা।
এই উদ্যোগ সফল হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ডিহাইড্রেশন, অপুষ্টি বা ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল কমবে। দীর্ঘমেয়াদে এতে শিশু ও মায়েদের মৃত্যুহার কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। ড. খালেদের ভাষায়, আধুনিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকারের অংশ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই স্বপ্ন কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়; এটি স্বাস্থ্যসমতার একটি দাবি। শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হলে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুফল গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতেই হবে। ড. আবু খালেদের গবেষণা সেই পথের দিকনির্দেশনা দেয়—যেখানে বিজ্ঞান কেবল উন্নত বিশ্বের জন্য নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment