বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায়, তার প্রতিফলন শুধু শিল্প বা করপোরেট জগতে নয়—গবেষণা ও একাডেমিক পরিবেশেও সমানভাবে অনুভূত হয়। গবেষণাগারের টাকা কমে যায়, গ্রান্টের প্রতিযোগিতা বাড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়োগ কমায়, আর প্রযুক্তি–বিপ্লব গবেষণার ধরণই বদলে ফেলে। তাই ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা আজ আর শুধু “চাকরি হারানোর” গল্প নয়; এটি গবেষকের ভবিষ্যৎ–পরিকল্পনা, দক্ষতা–বৈচিত্র্য এবং অভিযোজন–সক্ষমতার গল্প।
এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়মানের গল্প—যা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস হতে পারে।
আয়মান ছিলেন একজন উদ্যমী তরুণ গবেষক। মলিকিউলার বায়োলজি নিয়ে মাস্টার্স শেষ করে তিনি একটি বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। পেপার প্রকাশ, সেমিনার, ল্যাব–এক্সপেরিমেন্ট—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার ঠিকঠাক এগোচ্ছিল। কিন্তু ২০২২–২৩ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ তাঁর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ফান্ডিং সংকোচন ঘটায়। এক দিনে জানানো হয়—প্রকল্প বন্ধ, আর তাঁর পজিশন বাতিল। যেন সমস্ত পরিকল্পনা ভেঙে পড়ল।
আন্তর্জাতিকভাবে এটি অস্বাভাবিক নয়। ২০২৩ সালের Nature Career Survey বলছে—বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক গবেষকদের ৩৯% গত তিন বছরে কোনো না কোনো সময় ফান্ডিং সংকটে পড়েছেন, আর ২১% তাঁদের চুক্তিভিত্তিক চাকরি হারিয়েছেন। ইউনেস্কোর আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে—গবেষকদের কর্মসংস্থান বর্তমানে সবচেয়ে অনিশ্চিত ক্যাটাগরিগুলোর একটি।
প্রথম ধাক্কা আয়মানকে হতবাক করলেও তিনি দ্রুত বুঝলেন—এই যুগে পুরোনো দক্ষতা ধরে রেখে টিকে থাকা যাবে না। তাঁর ল্যাব দক্ষতা (wet lab skills) ছিল ভালো, কিন্তু computational biology, data analysis বা AI–driven research সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান সীমিত ছিল—যা আজ আধুনিক জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।
এই উপলব্ধি থেকেই শুরু হলো তাঁর দক্ষতা–পুনর্গঠনের যাত্রা।
তিনি প্রথমে শিখলেন পাইথন ও R, কারণ তিনি জানতেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞান ডেটা–নির্ভর। জিনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ, single-cell sequencing, protein structure prediction—এসবের জন্য coding skills আর statistical models অত্যাবশ্যক। আয়মান যখন নিজের প্রথম বায়োইনফরমেটিক্স অ্যালগরিদম চালাতে পারলেন, তখন তাঁর ভেতরে তৈরি হলো নতুন আত্মবিশ্বাস—যে তিনি শুধু bench scientist নন, বরং computational researcher–এ রূপান্তরিত হচ্ছেন।
এরপর তিনি আরও গভীরে গেলেন। AlphaFold, DeepMind-এর protein–prediction মডেল সম্পর্কে জানলেন। Google Scholar দিয়ে নিজে নিজে পড়লেন pressure-driven AI–based drug discovery পেপারগুলো। Kaggle–এ অংশ নিলেন bioinformatics প্রতিযোগিতায়। আগে যেখানে তিনি শুধুই pipette ধরতেন, এখন তিনি ডেটা–ভিত্তিক সিমুলেশন তৈরি করেন।
ঠিক তখনই তিনি বুঝলেন—২১ শতকের গবেষণা–জগৎ একটি multidisciplinary puzzle। একক দক্ষতা যথেষ্ট নয়। যেমন আর্থিক বিনিয়োগে বৈচিত্র্য ঝুঁকি কমায়, তেমনি গবেষকের দক্ষতায় বৈচিত্র্য তাঁকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করে। আয়মান শুরু করলেন গ্রান্ট–রাইটিং, বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ (science communication), এবং গবেষণা–ভিত্তিক প্রেজেন্টেশন দক্ষতা শেখা। তিনি জানতেন, কেবল গবেষণা নয়; গবেষণাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাই আধুনিক বিশ্বে একটি মূল স্কিল।
তিনি Biorender দিয়ে গ্রাফিক ফিগার তৈরি শিখলেন। নিজের পেপারগুলোর জন্য উচ্চ–মানের ইনফোগ্রাফিক বানাতে লাগলেন। তাঁর পোস্টার–প্রেজেন্টেশনগুলো সেমিনারে আরও গ্রহণযোগ্য হলো। নিজের LinkedIn প্রোফাইল বৈজ্ঞানিকভাবে সাজালেন, রিসার্চগেট–এ সক্রিয় হলেন, নেটওয়ার্ক বাড়ালেন। গবেষণা–পথে এগোনো শুধুই ল্যাব–ডেটা নয়—এটা সংযোগ, যোগাযোগ ও সহযোগিতারও বিষয়।
এর মাঝে তিনি শিখলেন একটি বড় সত্য—গবেষণার ভবিষ্যৎ AI–নির্ভর। IBM-এর এক স্টাডি অনুযায়ী, বিজ্ঞান–পদ্ধতির ৫০%–র ওপর আগামী পাঁচ বছরে AI–অটোমেশন প্রভাব ফেলবে। Benchwork কমবে না, কিন্তু computational augmentation হবে গবেষণার মূলচালিকা। আয়মান তাই machine learning for biology–তে Coursera ও edX কোর্স সম্পন্ন করলেন। ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নতুনভাবে সাজালেন।
এক বছর পরে আয়মান পেলেন চাকরি—আগের চেয়েও ভালো প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এবার তাঁর পরিচয় শুধু মলিকিউলার বায়োলজিস্ট নয়—তিনি computationally skilled, AI–aware, multi-disciplinary researcher। প্রকল্পটি ছিল cutting-edge: cancer genomics–এ AI–ভিত্তিক predictive model তৈরি। তাঁর নতুন দক্ষতাগুলো তাকে শুধু উপযোগী করেনি—তাকে অপরিহার্য করেছে।
আয়মানের গল্প আমাদের একটি মৌলিক সত্য শেখায়: পরিবর্তন অনিবার্য, এবং গবেষণাজগতে এটি আরও দ্রুত ঘটে। মন্দা আসবে, ফান্ডিং কমবে, প্রকল্প থামবে, প্রযুক্তি বদলাবে—কিন্তু যারা শিখতে জানে, যারা নিজের দক্ষতার কাঠামো ভেঙে পুনর্নির্মাণ করতে পারে, তারা কখনো পিছিয়ে পড়ে না।
আজকের গবেষকদের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—skill diversification is survival. একক দক্ষতা আর নিরাপত্তা দেয় না; বরং জীববিজ্ঞান + ডেটা, পদার্থবিজ্ঞান + এআই, রসায়ন + মডেলিং, সমাজবিজ্ঞান + computation—এই ধরনের সমন্বিত যোগ্যতাই ভবিষ্যতের গবেষণা–পাসপোর্ট।
বৈশ্বিক পরিবর্তনের যুগে গবেষকের সফলতা নির্ধারণ করবে তিনটি শক্তি: শেখার ক্ষমতা, অভিযোজনের ক্ষমতা, এবং দক্ষতার বৈচিত্র্য। আয়মানের গল্প তাই কেবল একজন গবেষকের নয়—এটি আমাদের সবার গল্প। এটি মনে করিয়ে দেয় যে ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা পরিবর্তনকে ভয় পায় না, বরং নিজেরাই পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

Leave a comment