বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই আজকের গবেষণার অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু জ্ঞান আহরণ করছি, নাকি সেই জ্ঞান সমাজে প্রকৃত কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন অসংখ্য গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু সেই গবেষণার ফল কতটা সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে, কতটা নতুন প্রযুক্তি, চিকিৎসা, বা টেকসই সমাধানে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়।
জাপানের সাম্প্রতিক এক আলোচনা সভায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, গবেষকের দায়িত্ব কেবল প্রবন্ধ প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক মূল্য তৈরি করা—এগুলোও গবেষকের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আসলে গবেষণা যখন শুধু বই বা জার্নালের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তার শক্তি পুরোপুরি বিকশিত হয় না। বরং গবেষণার আসল সার্থকতা তখনই, যখন তা সমাজে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
জাপানের উদাহরণ আমাদের অনেক কিছু শেখায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীন সত্তায় রূপান্তরিত করার পর সেখানে গবেষণা-ফলাফলকে সামাজিক প্রভাব তৈরির দিকে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। কেবল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নতুন স্টার্টআপ, নতুন প্রযুক্তি, এমনকি নতুন শিল্প খাত গড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করা হয়। এই মডেল ধীরে ধীরে বাংলাদেশসহ অন্য দেশেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, এক সময়ের শক্তিশালী জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আজকের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। অথচ আমেরিকার মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্যোগ থেকে গুগল, ফেসবুক, এমনকি আধুনিক বায়োটেক কোম্পানিগুলোও জন্ম নিয়েছে। গবেষণা ও ব্যবসার এই মিলনই সেখানকার অর্থনীতি ও সমাজে বড় পরিবর্তন এনেছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশ কি এমন কোনো পথ তৈরি করতে পারবে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষকরা কেবল প্রবন্ধ লেখায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উদ্ভাবনের উদ্যোক্তাও হয়ে উঠবে?
এখানে একটা মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। বিজ্ঞান সবসময় সত্য অনুসন্ধানের দিকে এগোয়, কিন্তু ব্যবসা চায় বাস্তব প্রয়োগ। একদিকে গবেষকরা জার্নালে প্রকাশের জন্য পরিশীলিত ডেটা তৈরি করেন, অন্যদিকে বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তারা চান দ্রুত ফল দেখাতে সক্ষম প্রমাণ। এই দুই জগতের মধ্যে ফাঁক সেতুবন্ধন করার কাজটাই হলো আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেটিই হতে পারে তরুণ গবেষকদের জন্য নতুন এক দিগন্ত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অসংখ্য গবেষণা হচ্ছে—কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি বা পরিবেশ—সবখানেই নতুন নতুন জ্ঞান তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তার কতটুকু শিল্পে, সমাজে বা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছাচ্ছে? এখানেই আমাদের ঘাটতি। গবেষণার ফল যদি কৃষকের জমিতে, হাসপাতালের শয্যায়, বা শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছাতে না পারে, তবে সেটি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
তরুণ গবেষকদের মনে রাখতে হবে, সমাজের সমস্যাই হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় গবেষণার ক্ষেত্র। জলবায়ু পরিবর্তন, নগর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বা খাদ্য নিরাপত্তা—এগুলো কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এগুলো আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। আর গবেষণার আসল সামাজিক প্রভাব তখনই তৈরি হবে, যখন ল্যাবরেটরির ধারণাগুলো এই বাস্তব সমস্যার সমাধানে রূপ নেবে।
অতএব, আজকের গবেষকের মানসিকতা হতে হবে বহুমাত্রিক। তাকে একদিকে উচ্চমানের প্রবন্ধ প্রকাশ করতে হবে, অন্যদিকে একই সঙ্গে ভাবতে হবে কীভাবে তার গবেষণা সমাজে ব্যবহারিক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য প্রয়োজন হবে নেটওয়ার্ক তৈরি, উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তোলা, এবং শিল্প ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা।
বাংলাদেশের আগামী দিনের অগ্রগতি নির্ভর করবে এই সমন্বিত মানসিকতার ওপর। যদি তরুণ গবেষকরা এখন থেকেই নিজেদের গবেষণাকে সমাজের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, তবে অচিরেই আমরা দেখতে পাবো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা নতুন উদ্যোগ, নতুন সমাধান এবং নতুন সামাজিক পরিবর্তন।
শেষ পর্যন্ত গবেষণার সাফল্য কেবল ল্যাবরেটরির ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তা সমাজে আলো ছড়ায়, মানুষের জীবনমান উন্নত করে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এটাই হতে পারে এক নতুন ডাক—বিজ্ঞানকে সমাজের শক্তিতে রূপান্তরিত করার ডাক।

Leave a comment