এক সময় বন ব্যবস্থাপনা মানে ছিল দল বেঁধে জঙ্গলে গিয়ে গাছ গোনা, উচ্চতা মাপা ও নোট নেওয়া। এই পদ্ধতি আজও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিশাল বনভূমির ক্ষেত্রে এটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। আধুনিক প্রযুক্তি সেই বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। ড. কাজী হোসেনের মতে, রিমোট সেন্সিং ও মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তি আজ বন ব্যবস্থাপনায় নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
রিমোট সেন্সিং বলতে বোঝায় দূর থেকে তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি। উপগ্রহচিত্র, ড্রোন কিংবা লাইডার (LiDAR) প্রযুক্তির মাধ্যমে বনভূমির উপরিভাগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। লাইডার প্রযুক্তিতে আকাশ থেকে আলোর ক্ষুদ্র তরঙ্গ পাঠিয়ে তা ফিরে আসার সময় মাপা হয়। এই সময়ের পার্থক্য থেকে গাছের উচ্চতা, ঘনত্ব বা বনভূমির গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সহজ ভাষায় বললে, এটি যেন আকাশ থেকে বনের একটি থ্রিডি ছবি তৈরি করা।
তবে কেবল ছবি বা কাঁচা তথ্য থাকলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এখানে আসে মেশিন লার্নিংয়ের ভূমিকা। মেশিন লার্নিং হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে কম্পিউটারকে উদাহরণ দিয়ে শেখানো হয়—কোন ধরনের তথ্য মানে কী। যেমন, বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগৃহীত বনভূমির তথ্য দিয়ে কম্পিউটারকে শেখানো হলে সে নতুন কোনো এলাকার তথ্য দেখে অনুমান করতে পারে সেখানে গাছের প্রজাতি কী হতে পারে, ঘনত্ব কত, বা কোথায় জলপ্রবাহের চিহ্ন আছে। ড. কাজী হোসেন জানান, ‘র্যান্ডম ফরেস্ট’ বা ‘সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন’-এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে এই ধরনের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির ব্যবহার বন ব্যবস্থাপনায় অনেক সুবিধা এনে দিয়েছে। দ্রুত বিশাল এলাকার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়। কোথায় বন ঘন, কোথায় ফাঁকা, কোথায় পরিবেশগত ঝুঁকি বেশি—এসব তথ্য নীতিনির্ধারকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তবে ড. কাজী হোসেন সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য সব সময় শতভাগ নির্ভুল নয়। দূর থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি। না হলে সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো পরিবেশ সংরক্ষণে। বনভূমির ভেতরের ছোট জলপ্রবাহ বা মাছের আবাসস্থল শনাক্ত করতে রিমোট সেন্সিং ও মেশিন লার্নিং ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কোনো এলাকায় কাঠ আহরণ বা নির্মাণকাজের আগে সংবেদনশীল অংশগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। এতে পরিবেশগত ক্ষতি কমানো যায়।
ড. কাজী হোসেনের মতে, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের সিদ্ধান্তকে আরও শক্ত ভিত্তি দেয়। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ একসঙ্গে কাজ করলে তবেই টেকসই বন ব্যবস্থাপনা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো দেশে এই প্রযুক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা বিপুল। পরিকল্পিতভাবে রিমোট সেন্সিং ও ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করলে বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
আধুনিক বন ব্যবস্থাপনার এই নতুন হাতিয়ার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি রক্ষায় প্রযুক্তি শত্রু নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে তা হতে পারে প্রকৃতির এক শক্তিশালী সহযোগী।

Leave a comment