ড. মশিউর রহমান
বাংলাদেশের গবেষণা-বাস্তবতাকে যদি একটু নিরপেক্ষ চোখে দেখি, তাহলে দ্রুতই টের পাওয়া যায়—আমাদের তরুণ গবেষকদের কাছে পিএইচডি এখনো বেশিরভাগ সময়েই “ডিগ্রি” হিসেবে ধরা পড়ে, জীবনের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সমানভাবে গঠনমূলক একটি প্রশিক্ষণ-পর্ব হিসেবে নয়। অথচ আন্তর্জাতিক গবেষণা ইকোসিস্টেমে পিএইচডি হলো এক ধরনের পূর্ণকালীন বৌদ্ধিক শেখার মাঠ, যেখানে প্রতিটি অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আপনাকে আগের চেয়ে শক্ত ও পরিণত করে তোলে। সেই যাত্রাকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন এমন দশটি দক্ষতা, যা বিশ্বের যেকোনো সফল গবেষকের গল্পের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আপনার পিএইচডির প্রথম বছরেই দরজায় কড়া নেড়ে আসবে নানা সুযোগ। কখনো আপনার সুপারভাইজার আপনাকে আন্তর্জাতিক কোনো কনফারেন্সে পেপার পাঠাতে বলবেন, কখনো কোনো ল্যাবে ভিজিটিং স্টুডেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ মিলবে, আবার কখনো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের গবেষণা-দলে ইন্টার্নশিপের দরজা খুলবে। এসব সুযোগ আপনার আত্মবিশ্বাসকে ভাঙতে নয়, বরং গড়তে আসে। তাই “না” বলার চেয়ে “হ্যাঁ” বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার কয়েক মাসের সাহসী সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের গবেষণা-পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কিন্তু এই পথ মোটেও সরল নয়। যে কোনও গবেষক আপনাকে বলবেন—পেপার রিজেকশন হলো এক বিশেষ ধরনের দীক্ষা। যে প্রথম রিজেকশন-লেটার হাতে ধরে অস্থির হয়ে পড়ে, সে এখনো গবেষণার মানসিক প্রস্তুতি নেয়নি। আপনার গবেষণা একবার নয়, বহুবারই সমালোচিত হবে। কখনো রিভিউয়ারের মন্তব্য অযৌক্তিক মনে হবে, কখনো সুপারভাইজারের পরামর্শ বোঝা কঠিন হবে। কিন্তু ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে পারলেই আপনি শিখবেন—প্রতিটি সমালোচনা আসলে আপনার কাজকে আরও নিখুঁত করার সুযোগ।
গবেষণায় সমালোচনামূলক চিন্তার গুরুত্ব নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি, কিন্তু সেটি অর্জনের বাস্তব পথ খুব কম বলি—সেটা হলো অন্যের গবেষণা পেপার রিভিউ করা। আপনি যখন হাতে একটি নতুন পেপার নেন, তখন আসলে শেখেন কীভাবে একটি ধারণাকে খুঁটিয়ে দেখা যায়, কীভাবে ভুল যুক্তি ধরা যায়, কোন প্রশ্ন করলে জ্ঞান আরও গভীর হয়। তাই জার্নাল কিংবা কনফারেন্সে রিভিউয়ার হিসেবে আবেদন করুন। নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে শাণিত করার ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই।
কিন্তু গবেষক হিসেবে দক্ষতার এক বড় অংশই গড়ে ওঠে যোগাযোগের মাধ্যমে। অনেকেই ভাবে পিএইচডির আসল কাজ হচ্ছে পরীক্ষাগারে থাকা, ডেটা বিশ্লেষণ করা বা কোড লেখা। কিন্তু শক্তিশালী যোগাযোগ-দক্ষতা ছাড়া ভালো গবেষণা কখনোই দৃশ্যমান হয় না। আপনার গবেষণা যদি মানুষ বুঝতে না পারে, তবে সেটি সম্পূর্ণ হলেও অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তাই কনফারেন্সে, ওয়ার্কশপে, কিংবা অনলাইন আলোচনায় নিজের কাজ উপস্থাপন করুন। গবেষণাকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার দক্ষতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়, এবং সেটিই আপনাকে আলাদা করে তুলবে।
গবেষণার সমাজিক মূল্য সম্পর্কে ভাবা—বাংলাদেশি গবেষকদের মধ্যে এখনো খুব কম দেখা যায়। অথচ পৃথিবীর বহু সফল স্টার্টআপ জন্ম নিয়েছে পিএইচডি থিসিসের ভেতর থেকে। আপনি যে সমস্যাটি নিয়ে কাজ করছেন, সেটি কে ব্যবহার করবে? কোন মানুষ বা প্রতিষ্ঠান এতে উপকৃত হবে? যে প্রশ্নগুলো আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই, সেই প্রশ্নগুলোই গবেষণাকে বাস্তব জগতে অর্থবহ করে তোলে। আপনার থিসিস একদিন হয়তো একটি নতুন কোম্পানির বীজ হতে পারে।
কনফারেন্সে উপস্থিত হওয়া কেবল পেপার উপস্থাপনার মাধ্যমে দায় সারা নয়। একটি কনফারেন্স হলো আপনার গবেষণা-জগতের সামাজিক জায়গা—যেখানে নতুন ধারণা জন্ম নেয়, নতুন সহযোগিতা তৈরি হয়, অচেনা কোনো গবেষকের একটি মন্তব্য মাথায় নতুন আলো জ্বালাতে পারে। তাই প্রতিবার যাওয়ার আগে নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন—কী শিখতে চান, কার সঙ্গে কথা বলতে চান, কোন বিষয়টি নিজের কাজে প্রয়োগ করবেন।
আরেকটি অদ্ভুতভাবে অবহেলিত দক্ষতা হলো তত্ত্বাবধান। আপনি যদি একটি পিএইচডি শুরু করেন, খুব দ্রুতই দেখবেন—আপনার ল্যাবে জুনিয়ররা আছে, যাদের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে কাজ করলে আপনার ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাদান এবং গবেষণা পরিকল্পনা তৈরির দক্ষতা বাড়বে। ভবিষ্যতের একাডেমিক বা শিল্প-জীবনে এটাই আপনাকে আলাদা করবে।
রিসার্চ প্রেজেন্টেশন এমন একটি কাজ, যেটিকে কেউ পছন্দ না করলেও এড়ানোর সুযোগ নেই। তাই এটিকে ভয় পাবেন না, বরং আয়ত্ত করতে চেষ্টা করুন। কীভাবে গল্পের ভঙ্গিতে গবেষণা উপস্থাপন করা যায়, কীভাবে পাঁচ মিনিটে সমস্যার মূল ধারণা তুলে ধরা যায়—এসব ছোট ছোট দক্ষতা বড় পরিবর্তন আনে।
গবেষণার সূক্ষ্মতা ধরতে পারাই একজন পিএইচডি গবেষকের আসল শক্তি। ডেটার একটি ছোট অসংগতিও আপনার ফলাফলকে বদলে দিতে পারে। তাই বিস্তারিতের প্রতি মনোযোগ—এটি আপনাকে শুধু তাত্ত্বিকভাবে নয়, নৈতিকভাবেও উন্নত গবেষক করে তুলবে।
এবং সবশেষে একটি কথাই—পিএইচডি মানে গবেষণা শেখা। অনেক দক্ষতা যুক্ত হবে, অনেক অভিজ্ঞতা আসবে, অনেক দরজা খুলবে। কিন্তু সেই গভীর মনোযোগ—কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে নতুন জ্ঞান তৈরি হয়—এটাই আপনার যাত্রার মূল।
বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের প্রতি আমার পরামর্শ—এই দশটি দক্ষতা আপনার থিসিসের সিলেবাসের বাইরে থাকলেও ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারের কেন্দ্রে অবস্থান করবে। পিএইচডি কেবল আপনার নামে “ডক্টর” যোগ করবে না, আপনাকে বদলে দেবে একজন পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীতে। যে বিজ্ঞানী শুধু গবেষণাগারে নয়, সমাজেও আলো ছড়াতে পারে।

Leave a comment