পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিজ্ঞান জগতে নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে গেছে। এতদিন পর্যন্ত পুরুষদের জন্য কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বলতে ছিল মাত্র দুটি—কনডম ব্যবহার করা বা ভ্যাসেকটমি করানো। প্রথমটি সাময়িক, দ্বিতীয়টি স্থায়ী (যদিও কিছু ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা সম্ভব)। কিন্তু উভয় পদ্ধতিই সীমাবদ্ধতা ও অসুবিধা বহন করে। এমন এক প্রেক্ষাপটে, হরমোনবিহীন একটি দৈনিক বড়ি, যা সাময়িকভাবে শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ করতে সক্ষম, প্রথম মানব-নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে—এ যেন বহু প্রতীক্ষিত নতুন দিগন্তের সূচনা।
নতুন এই বড়ির কার্যপদ্ধতি আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে বিশেষভাবে। আমরা জানি, ভিটামিন-এ-এর গুরুতর ঘাটতি মানুষের প্রজনন ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, অণ্ডকোষের কোষ ভিটামিন-এ গ্রহণ করে সেটিকে রেটিনোইক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে। এই রেটিনোইক অ্যাসিড একটি নির্দিষ্ট রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয় এবং জিনের প্রকাশে পরিবর্তন ঘটিয়ে শুক্রাণু উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে। পুরো ঘটনাটি এক ধরনের ‘ডমিনো ইফেক্ট’-এর মতো, যেখানে প্রথম ধাপটি শুরু হলে পরের ধাপগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে যায়। কিন্তু এই নতুন বড়ি সেই প্রথম ধাপেই ছেদ টানে—রেটিনোইক অ্যাসিডকে রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হতে বাধা দেয়, ফলে শুক্রাণু উৎপাদনের পুরো চক্রটাই থমকে যায়। আর বড়ি খাওয়া বন্ধ করলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা ফিরে আসে।
এখন পর্যন্ত পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ গবেষণায় নানা পদ্ধতি আলোচনায় এসেছে—হরমোনযুক্ত জেল যা প্রতিদিন ত্বকে মাখতে হয়, রিভার্সিবল ভ্যাসেকটমি যেখানে এক ধরনের হাইড্রোজেল নলের ভেতর স্থাপন করে শুক্রাণুর গমনপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়, কিংবা হরমোন-নির্ভর বড়ি। কিন্তু সবগুলোর মধ্যেই কোনো না কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল—হরমোনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, জটিল প্রক্রিয়া, কিংবা স্থায়ী পরিবর্তনের ঝুঁকি। সেই তুলনায়, এই নতুন হরমোনবিহীন বড়ি একটি বড় ধরনের বৈপ্লবিক সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।
যদিও প্রাথমিক নিরাপত্তা পরীক্ষায় বড়িটি সফল হয়েছে, এখনো পথ অনেক বাকি। প্রথম পর্যায়ের 1a ট্রায়ালে মাত্র ১৬ জন সুস্থ পুরুষ অংশ নেন, এবং পরীক্ষাটি ছিল স্বল্পমেয়াদি। মূল উদ্দেশ্য ছিল বড়িটি রক্তে কতক্ষণ সক্রিয় থাকে ও কোনো তাৎক্ষণিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে কি না তা বোঝা। ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার বা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপর পরীক্ষার আগে এর কার্যকারিতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে না।
পরবর্তী ধাপে চলছে 1b এবং 2a পর্যায়ের পরীক্ষা—যেখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়বে, ব্যবহারকাল দীর্ঘ হবে এবং শুধু নিরাপত্তাই নয়, কার্যকারিতাও যাচাই করা হবে। বিজ্ঞানীরা দেখবেন, নিয়মিত এই বড়ি সেবনে শুক্রাণুর সংখ্যা কতটা হ্রাস পায়, কত দ্রুত সেই প্রভাব দেখা দেয় এবং বিভিন্ন মাত্রায় বড়ি খাওয়ার ফলে পার্থক্য কী হয়। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে এবং গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না দেখা দিলে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই বাজারে আসতে পারে পুরুষের জন্য এই নতুন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি।
এখানে একটি বড় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যুগ যুগ ধরে প্রায় একচেটিয়াভাবে নারীদের কাঁধে চাপানো হয়েছে—পিল, ইন্ট্রা-ইউটারিন ডিভাইস, ইনজেকশন কিংবা ইমপ্লান্ট—সবই নারীদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে তারা প্রায়ই হরমোনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক চাপের সম্মুখীন হন। পুরুষদের জন্য কার্যকর ও নিরাপদ বিকল্প আসলে সেই বোঝা সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার এক বড় পদক্ষেপ হবে। এর ফলে দম্পতিরা একসাথে পরিকল্পনা করতে পারবেন, একপক্ষের উপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে আছে বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক বাধা—প্রতিটি ধাপেই ওষুধটি শুধু কার্যকর নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ তা প্রমাণ করতে হবে। অন্যদিকে আছে সামাজিক মনোভাবের প্রশ্ন—পুরুষেরা কি নিজেরা জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবেন? ইতিহাস বলে, নতুন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রবর্তনের পর সামাজিক স্বীকৃতি পেতে প্রায়ই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ১৯৬০-এর দশকে বাজারে এলেও তা মূলধারায় গৃহীত হতে সময় লেগেছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তি একদিন এসে পৌঁছালে তা পরিবার পরিকল্পনা উদ্যোগে নতুন দিক খুলে দিতে পারে। দেশে এখনও জন্মনিয়ন্ত্রণের মূল দায় নারীর উপর, এবং পুরুষদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। যদি সহজলভ্য, নিরাপদ ও উল্টানো-সম্ভব একটি পুরুষের বড়ি আসে, তবে তা সচেতনতা বাড়িয়ে দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়তে সাহায্য করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন হবে যথাযথ প্রচার, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ।
শেষ পর্যন্ত, বিজ্ঞান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার সাথে সমান জরুরি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সংস্কৃতি এবং নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এই বড়ি বাজারে এলেও তার সফলতা নির্ভর করবে কেবল ল্যাবের ফলাফলের উপর নয়, বরং সমাজ কতটা তা গ্রহণ করে তার উপরও। তবু এতদিনের একচেটিয়া নারীকেন্দ্রিক জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা এই হরমোনবিহীন পুরুষের বড়ি নিয়ে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রজনন স্বাস্থ্য ও সমতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

Leave a comment